নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা পিতৃতন্ত্রের মতোই প্রাচীন একটি বিষয়। কিন্তু নিকট অতীতে এর তীব্রতা ও পরিসর ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করেছে এবং সহিংসতার ভয়াবহতা বেড়েই চলেছে। দিল্লীর গণধর্ষণ এবং চন্ডীগড় গণধর্ষণের শিকার ১৭ বছরের মেয়েটির আত্মহত্যা এই ভয়াবহতার চিত্রকে তুলে ধরে।
ধর্ষণ এবং নারীর বিরুদ্ধের সহিংসতার ঘটনা বর্তমান বছরগুলোতে বেড়েই চলেছে। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরো (NCRB-India), ১৯৯০ সালে মোট ১০,০৬৮টি ধর্ষণের ঘটনা নথিবদ্ধ করে, যা ২০০০ সালে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ১৬,৪৯৬তে। ধর্ষণের সংখ্যা ২০১১ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ২৪,২০৬ যা ১৯৭১ সাল অর্থাত্ যে বছর থেকে NCRB-India ধর্ষণ ঘটনা নথিভুক্ত করতে শুরু করে, তার চেয়ে ৮৭৩% বেশি। দিল্লী যথার্থভাবেই ভারতে ধর্ষণের রাজধানী হিসাবে কুখ্যাতি অর্জন করেছে, কারণ দেশের প্রায় ২৫% ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে ভারতের কেন্দ্রীয় রাজধানী দিল্লীতে। আমাদের কন্যা এবং বোন, যারা সহিংসতার শিকার,তাদের সুবিচার না পাওয়া পর্যন্ত সহিংসতা বন্ধের এই আন্দোলনকে জারী রাখতে হবে। আমরা যখন আন্দোলনকে তীব্রতর করার সংগ্রামে নিয়োজিত সেই একই সাথে আমাদেরকে অবশ্যই কারণ খুঁজতে হবে কেন ১৯৯০ সালে, যখন ভারতে নয়া অর্থনৈতিক পলিসি গৃহীত হয়, তখন থেকে ধর্ষণের মাত্রা ২৪০% বৃদ্ধি পেল? আমাদেরকে অবশ্যই নারীর বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান সহিংসতার মূল কারণ অনুসন্ধান করতে হবে। অগণতান্ত্রিকভাবে চাপিয়ে দেয়া ন্যায় ও সুবিচারের পরিপন্থী অর্থনৈতিক পলিসির সাথে নারীর বিরুদ্ধে ঘটে চলা ক্রমবর্ধমান সহিংসতার কি কোন যোগসূত্র আছে? আমি মনে করি অবশ্যই আছে।
প্রথমত: দূরদৃষ্টিহীন ‘প্রবৃদ্ধি’ মডেলের যাত্রা শুরু হয়েছে অর্থনীতিতে নারীর অবদানকে অস্বীকৃতির মাধ্যমে। সরকার যতই ‘সবাইকে নিয়ে প্রবৃদ্ধি’ এবং ‘আর্থিকভাবে সবাইকে অন্তর্ভুক্তকরণের’ বুলি আউড়িয়ে চলেছে, ততই তারা অর্থনীতি ও সমাজে নারীর অবদানকে খাটো করে দেখছে। পিতৃতান্ত্রিক অর্থনৈতিক মডেল অনুসারে বাজারের জন্য উত্পাদিত নয় এমন কাজকর্মকে উত্পাদনশীল বলে গণ্য করা হয় না।
মূল্যবানকে মূল্যহীন, সফল শ্রমকে নিষ্ফলাশ্রম, জ্ঞানকে জ্ঞানহীনতায় পর্যবসিত করেছে আমাদের সময়ের সবচেয়ে শক্তিশালী ও জীবনের গতিধারা নির্ণায়ক গড় জাতীয় উত্পাদনের (Gross Domestic Product) পরিসংখ্যান, যাকে ইতোমধ্যেই অনেক বিশ্লেষক আখ্যায়িত করেছেন গড় জাতীয় সমস্যা (Gross Domestic Problem) হিসাবে। জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যবস্থায় এই ধারণা বদ্ধমূল যে, যারা নিজেদের ব্যবহারের জন্য উত্পাদন করে, তারা প্রকৃতপক্ষে উত্পাদক নয়, ফলে তাদের অবদান উত্পাদন বেষ্টনীর বাইরে অস্বীকৃত থেকে যায়। উত্পাদন বেষ্টনী (production boundary) একটি রাজনৈতিক ধারণা। এই ধারণা অনুযায়ী পুনঃসৃজনকারী ও পুনঃব্যবহারযোগ্য উত্পাদন চক্রকে উত্পাদন ব্যবস্থার বাইরে রাখা হয়। সেহেতু, যে সকল নারী পরিবার, সন্তান, কম্যুনিটি ও সমাজের জন্য শ্রম বিনিয়োগ করেন সে সকল নারীর যাবতীয় অবদান ও পরিশ্রমকে ‘অনুত্পাদনশীল এবং অর্থনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয়’ বলে গণ্য করা হয়। অর্থনীতিকে যখন শুধু বাজারের গণ্ডিতে পরিমাপ করা হয়, তখন অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বিতাকে অর্থনৈতিক ত্রুটি হিসাবে বিবেচনা করা হয়। নারীর শ্রম ও দক্ষিণের (Global South) স্বাবলম্বী অর্থনীতিতে নারীর অবদানের অবমূল্যায়ন পুঁজিবাদী পিতৃতন্ত্রের তথাকথিত উত্পাদন বেষ্টনীর ধারণা সঞ্জাত। বাজার অর্থনীতিকে অতি মূল্যায়িত করে পুঁজিবাদী পিতৃতান্ত্রিক উত্পাদন বেষ্টনী পরিবেশ সুরক্ষা ও মানব অস্তিত্বের জন্য আবশ্যকীয় অর্থনীতির দুটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রকে অবজ্ঞা করে চলেছে। অর্থনীতির এই দুটি ক্ষেত্র হলো, (১) প্রকৃতির অর্থনীতি (nature’s economy) ও (২) স্থায়িত্বশীল অর্থনীতি (sustenance economy)। এই দুটিতে পৃথিবীর জৈববৈচিত্র্য এবং মানুষের জীবন কিভাবে সুরক্ষিত হচ্ছে তা বিবেচনায় এনে অর্থনৈতিক মূল্য পরিমাপ করা হয়। ক্যাশ বা বাজারের বিনিময় মূল্য নয়, এর মূল্য নিরূপিত হয় একটি জীবনদায়ী প্রণালী হিসাবে।
পুঁজিবাদী পিতৃতান্ত্রিক অর্থনৈতিক মডেল নারীর কাজ এবং সম্পদ অর্জনের বিষয়টি অস্বীকার করে, নারীকে তার জীবিকা এবং যে প্রাকৃতিক সম্পদের উপর জীবিকা নির্ভরশীল যেমন জমি, বন, পানির উত্স, শস্যবীজ এবং জীববৈচিত্র্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার মাত্রাকে তীব্রতর করে চলেছে। সমাজে ক্ষমতাবান কর্তৃক ক্ষমতাহীনের সম্পদ কুক্ষিগত করেই কেবল সসীম পৃথিবীতে অসীম প্রবৃদ্ধির অর্থনৈতিক সংস্কার অব্যাহত রাখা সম্ভব। প্রবৃদ্ধির জন্য আবশ্যকীয় সম্পদ কুক্ষিগতকরণের প্রক্রিয়া ধর্ষণের এমন এক সংস্কৃতি সৃষ্টি করেছে যা থেকে ধরিত্রী, স্থানীয় স্বাবলম্বী অর্থনীতি এবং নারী কোন কিছুই রক্ষা পাচ্ছে না। কেবলমাত্র ক্রমবর্ধমান হারে হিংসার বৃত্তকে বৃদ্ধি করার মাঝেই এই প্রবৃদ্ধির ব্যাপকতা লক্ষণীয়। আমি বার বার জোর দিয়ে বলার চেষ্টা করেছি যে, ধরিত্রীকে ধর্ষণের সাথে নারী ধর্ষণের যোগসূত্র রয়েছে, প্রতীকী অর্থে আমাদের বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গি নির্মাণে এবং বৈষয়িক অর্থে নারীর প্রাত্যহিক জীবনকে নির্দিষ্ট ছাঁচে গড়ে তোলার ব্যাপারে। নারীর গভীর অর্থনৈতিক দুরবস্থা তাকে যৌন সন্ত্রাসসহ সকল ধরনের সহিংসতার শিকারে পরিণত করেছে। National Commission on Women and Research Foundation for Science, Technology and Ecology আয়োজিত গণশুনানিগুলো থেকে এই বক্তব্যের সত্যতা মেলে।
তৃতীয়ত: নয়া লিবারেল অর্থনৈতিক সংস্কার গণতন্ত্রের জন্য হুমকি সৃষ্টি করেছে এবং সরকারকে বেসরকারিকরণের পথে ঠেলে দিচ্ছে। সরকার সংস্কার সম্পর্কে এমনভাবে কথা বলে যেন এর সাথে ক্ষমতা বা রাজনীতির কোন সম্পর্ক নেই। তারা অর্থনীতিকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখার কথা বলে যখন তারা এমন একটি অর্থনৈতিক মডেলকে চাপিয়ে দিয়েছে যা একটি বিশেষ লিঙ্গ (gender) এবং শ্রেণি দ্বারা আকৃতি লাভ করেছে। নয়া লিবারেল সংস্কার কার্যক্রম গণতন্ত্রের পরিপন্থী। খুচরা ব্যবসায় ওয়ালমার্ট (Walmart)-কে নিয়ে আসার জন্য ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার সংস্কার কার্যক্রমকে আরও প্রসারিত করতে সামপ্রতিক সময়ে খুবই ব্যস্ত। কর্পোরেট পুঁজি পরিচালিত সংস্কার প্রক্রিয়া রাজনীতি ও অর্থনীতির মধ্যে আঁঁতাত তৈরি করে বৈষম্য আরও বৃদ্ধি করছে এবং জনগণের প্রতিনিধিত্ব করার কথা যে রাজনৈতিক শ্রেণির, সেটি জনগণ থেকে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। দিল্লীর গণধর্ষণের বিরুদ্ধে সংগঠিত প্রতিবাদ সমাবেশে আমরা রাজনীতিবিদ ও জনগণের ক্রমসমপ্রসারণশীল সংযোগহীনতা প্রত্যক্ষ করেছি।
আরো অশুভ ব্যাপার এই যে, জনবিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক শ্রেণি তার নিজের নাগরিকদের সম্পর্কে ভীত। দিল্লীর অহিংস নাগরিক প্রতিবাদ দমন করার লক্ষ্যে আমরা যে ব্যাপক পুলিশী তত্পরতা প্রতক্ষ্য করেছি তা এই বক্তব্যের সত্যতাকেই তুলে ধরে। বাঁশতারের সোনী সারিকে অত্যাচার কিম্বা ঝাড়খণ্ডে দয়ামনি বার্লার গ্রেফতার অথবা কান্দুকালামের পারমাণবিক স্থাপনার বিরুদ্ধে সংগ্রামরত হাজার হাজার মানুষের বিরুদ্ধে মিথ্যে মামলা একই সত্যকে তুলে ধরে। এই প্রাইভেটাইজ কর্পোরেট রাষ্ট্র অতি অবশ্য দ্রুতই পুলিশী রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে। এই কারণেই নারী ও সাধারণ নাগরিকদের সুরক্ষার দায়িত্ব বাদ দিয়ে রাজনীতিকরা ভিআইপি নিরাপত্তা চাদরে নিজেদেরকে ঢেকে রাখার প্রয়াসে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পুলিশকে ব্যতিব্যস্ত রাখছে।
চতুর্থত: পুঁজিবাদী পিতৃতান্ত্রিক অর্থনৈতিক মডেলের ভিত্তিমূলে রয়েছে নারীসহ সব কিছুকেই পণ্যে রূপান্তর করার প্রক্রিয়া। এই কারণেই সিয়াটলে বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক ভণ্ডুল করার সময় আমরা শ্লোগান দিয়েছিলাম এই বলে যে, “আমাদের পৃথিবী বিক্রির জন্য নয় (Not for sale)।” বাণিজ্যের উদারীকরণ,বীজ এবং খাদ্যসামগ্রী, জমি ও পানির বেসরকারি ও বাণিজ্যিকীকরণের কারণে অর্থনৈতিক উদারতাবাদ যে নেতিবাচক অভিঘাত সৃষ্টি করেছে তার ফলে ভেঙ্গে পড়ছে সামাজিক মূল্যবোধ, গভীরতর হচ্ছে পিতৃতন্ত্র এবং সর্বোপরি নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার মাত্রা তীব্রতর হচ্ছে।
দিল্লীর গণধর্ষণের শিকার মেয়েটি একটি সামাজিক বিপ্লবের সূচনা করে গেছে। আমাদেরকে এটি অব্যাহত রাখতে হবে এবং সমপ্রসারিত করতে হবে। আমাদেরকে নারীর জন্য দ্রুত এবং ন্যায় বিচারের দাবিতে সোচ্চার থাকতে হবে। নারীর বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটনের জন্য দায়ীদের শাস্তির জন্য দ্রুত বিচার আদালত গঠনের দাবিতে অটল থাকতে হবে। যৌন সহিংসতার শিকার নারীর বিচার প্রাপ্তি যাতে বিঘ্নিত না হয় সে জন্যে আইন পরিবর্তনের ব্যাপারটি আমাদের নিশ্চিত করতে হবে। ক্রিমিনাল রেকর্ড রয়েছে এমন রাজনীতিবিদদের কালো তালিকাভুক্তকরণের দাবিতেও আমাদের লেগে থাকতে হবে। এগুলো করার পাশাপাশি, প্রবৃদ্ধির নামে আমাদের উপর চাপিয়ে দেয়া অর্থনৈতিক প্যারাডাইম, যা নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতাকে উসকে দিচ্ছে, তাকেও পরিবর্তন করতে হবে। নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার পরিসমাপ্তি ঘটাতে হলে পুঁজিবাদী পিতৃতন্ত্র কর্তৃক আদলপ্রাপ্ত সহিংস অর্থনীতির বিপরীতে একটি অহিংস শক্তিশালী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে যা হবে নারী ও ধরিত্রীর প্রতি সমানভাবে শ্রদ্ধাশীল।
ভাষান্তর : শাহ নেওয়াজ
লেখক : ভারতীয় নাগরিক সমাজের নেত্রী
