বিশৃঙ্খলা কী ও কত প্রকার তাহা দেখিবার জন্য দূরে কোথাও যাইবার প্রয়োজন নাই, আমাদের প্রিয় এই রাজধানী শহরের যে কোনো দিক হইতে একবার চক্কর দিয়া আসিলেই তাহা বেশ বুঝিতে পারা যাইবে। বিশৃঙ্খলার বিচিত্র রূপ দেখিয়া নাগরিকমন, বিশেষ করিয়া শৃঙ্খলাবোধ যাহাদের টনটনে তাহাদের চিত্তবিক্ষেপ ঘটিবে নিমিষে নিশ্চয়ই। এই শহরে পথ চলিতে যন্ত্রণার শেষ নাই। বিশৃঙ্খলা হইতে এইখানে উত্পন্ন হইয়া চলিয়াছে হাজার রকমের বিড়ম্বনা। ব্যক্তিগত গাড়ি কিংবা পাবলিক ট্রান্সপোর্ট অথবা ত্রিচক্রযান—বাহন যাহাই হউক না কেন, পথে নামিলে কষ্ট-ক্লেশ হইতে নিস্তার নাই। যানজটে পড়িয়া মন যদি বিষাইয়া না উঠিল, তবে আর ইহা আমাদের প্রিয় ঢাকা মহানগর কেন ! যানজট দুনিয়ার সবদেশেই আছে কম কিংবা বেশি। তবে উন্নত বিশ্বে মানুষ ট্রাফিক জ্যাম লইয়া আমাদের মত তিক্ত-বিরক্ত হন না। কেননা কখন কেন যানজট হয়, তাহা অজানা নয় তাহাদের। ট্রাফিক শৃঙ্খলা লইয়া তাহাদের কোনো নালিশ নাই। কিন্তু আমাদের এইখানে কখন যে কি কারণে রাস্তায় জ্যাম বাঁধিয়া যায় তাহার কোনো ঠিক-ঠিকানা নাই। কে বলিতে পারে কোন দিক দিয়া কোন একটা গাড়ি আসিয়া পথ রুধিয়া দিয়াছে। অসহায় ট্রাফিক পুলিশের তখন বাঁশি বাজানো আর হম্বিতম্বি করা ছাড়া গত্যন্তর থাকে না। ফুটপাত দিয়া পথচারী নির্বিঘ্নে পদব্রজে যাইবেন, তাহাও এই নগরে সহজ কথা নয়। একে তো ভাঙাচোরা ফুটপাত তাহার উপর এখানে সেখানে হাঁ করিয়া রহিয়াছে খোলা ম্যানহোল। সেই গাড্ডায় পড়িলে অগস্ত্যযাত্রা নিশ্চিত না হইলেও হস্ত-পদের দফা যে রফা হইয়া যাইবে তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই। শুধু কি তাই, ফুটপাতে ধাঁ করিয়া মোটর বাইক উঠিয়া যাওয়া নিত্য-নৈমিত্তিক ঘটনা। আদালতের নিষেধ আছে, তবু কে শোনে কাহার কথা! কোনো কোনো এলাকায় ফুটপাত বেদখল হ্ইয়া গিয়াছে। কোথাও হকার, কোথাওবা পায়ে হাঁটা পথের উপর চলিতেছে ওয়েল্ডিং। অন্যদিকে ফুট ওভার ব্রিজ থাকিতেও হামেশাই পথচারী পারাপার হইয়া থাকেন অগণিত ধাবমান যানবাহনের সন্মুখ দিয়া। দেখিয়া শুনিয়া মনে হয় না যে, কোথাও কোনো নিয়ন্ত্রণ আছে, কর্তৃত্ব আছে কাহারো। উধাও হইয়া গিয়াছে যেনবা নিয়ম-শৃঙ্খলা সবই।
পথে যে বিশৃঙ্খলা এবং নিয়ন্ত্রণহীনতা দেখিতে পাওয়া যায়, বলিলে অত্যুক্তি হইবে না যে, তাহা সমাজের সামগ্রিক অবস্থারই প্রতিচিত্র। ঘরে-বাহিরে, আর্থ-সামাজিক সকল ক্ষেত্রেই যেনবা আজ বিশৃঙ্খলাই প্রাধান্য বিস্তার করিয়া চলিয়াছে। সবখানে নিয়মনীতি প্রতিষ্ঠায় কর্তৃত্বের হাত যেন শিথিল হইয়া যাইতেছে। বাড়ির অভিভাবক বহু ক্ষেত্রে বেখেয়াল সন্তানের নিয়মানুবর্তিতার বিষয়ে। শ্রমিক-কর্মচারীদের অনেকে ভাবেন কাজ না করিলেও চলে। কর্তৃপক্ষও অনেক ক্ষেত্রে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে দৃঢ়তা অবলম্বন করিতে পারেন না। ফলে বিশৃঙ্খলা ও অনিয়ম বাসা বাঁধে রন্ধ্রে রন্ধ্রে। তৃতীয় বিশ্বের জাতিসমূহের এ এক বিরাট সমস্যা। তাহাদের অগ্রসরতার পথে এ এক কঠিন দেওয়াল। যেখানে নিয়ম-শৃঙ্খলা নাই সেখানে অগ্রসরতার পথ সংকীর্ণ হইয়া যাইতে বাধ্য। ইহাতে উত্পাদনশীলতা ব্যাহত না হইয়াই পারে না। এই জায়গাটায় যেমন প্রয়োজন যাহার যাহার অবস্থানে নিয়ম-শৃঙ্খলা মানিয়া চলা, শৃঙ্খলাবোধ থাকিতে হইবে প্রত্যেকের মধ্যেই। একজন মনীষী বলিয়াছেন যে, শৃঙ্খলা নীতি-নিয়মের মধ্যে থাকিবার শিক্ষা দেয়। কথাটি ঘুরাইয়াও বলা যায়, নৈতিকতার আরেক নাম শৃঙ্খলা। ঘরে কিংবা বাহিরে, কর্মক্ষেত্রে, কলে-কারখানায়, অফিসে-দপ্তরে, এমনকি ব্যস্ত রাজপথে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করিবার জন্য নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব যাহাদের উপর ন্যস্ত তাহাদেরও স্ব স্ব ক্ষেত্রে যথারীতি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করিতে হইবে। নীতি-নিয়ম প্রতিষ্ঠায় তাহাদের কঠোর ও নিরাসক্ত হইতে হইবে। ইহাও কিন্তু নৈতিকতারই অংশ। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিকসহ সর্ব ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা হয়তো খুব সহজ নহে, বিশেষত তৃতীয় বিশ্বের অনগ্রসর দেশসমূহে। এই প্রসঙ্গে হেলেন কেলারের একটি অবিস্মরণীয় বাণী উদ্ধৃত করা যাইতে পারে। তিনি বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে সুশৃঙ্খল হওয়া কিছুটা কঠিন হইলেও ইহার ফল অবশ্যই সুখময়। কাজেই সুখ ও সমৃদ্ধির জন্য সুশৃঙ্খল হইতে হইবে সকলকেই।
