এই আহাজারি যেন থামিবার নহে

আপডেট : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২১:৩৯
নৌপথের নিরাপত্তার সমস্যাটি দীর্ঘদিনের। সমস্যার নাড়ি-নক্ষত্রও সংশ্লিষ্ট সকলেরই জানা। কিন্তু সমাধানের পথটি হতাশার অন্ধকারে ঢাকা। বড়ো ধরনের দুর্ঘটনা ঘটিলেই কেবল সকলে নড়িয়া-চড়িয়া বসেন। শুরু হইয়া যায় দৌড়ঝাঁপ। নূতন করিয়া তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। উদ্ঘাটিত হয় দুর্নীতি, অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার ভয়ঙ্কর সব তথ্য। প্রণীত হয় বড়ো বড়ো সুপারিশমালা। আশ্বাসের ফুলঝুরি বহিয়া যায়। প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় দায়ী ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। যেইভাবে চলিতেছিল সবকিছু সেইভাবেই চলিতে থাকে। শুধু তাহাই নহে, প্রতিকারহীনতার কারণে দায়ী ব্যক্তিরা আরও বেপরোয়া হইয়া ওঠে। সেই সাথে বাড়িতে থাকে নৌপথে যাতায়াতকারী হতভাগ্য অনন্যোপায় যাত্রীসাধারণের অপঘাত মৃত্যুর মিছিল। বাড়িতে থাকে স্বজনদের আহাজারি। এই আহাজারি যেন থামিবার নহে। গত শুক্রবার সকালে মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ায় মেঘনা নদীতে শতাধিক যাত্রী লইয়া এম এল সারস নামক যাত্রীবাহী লঞ্চডুবির চিত্রটিও ভিন্ন নহে। বাল্কহেড বা বালুবাহী একটি নৌযানের ধাক্কায় লঞ্চটি ডুবিয়া যায়। সলিল সমাধি হয় বেশকিছু হতভাগ্য যাত্রীর। গত বত্সরের মার্চে বাল্কহেডের ধাক্কায় তিনশতাধিক যাত্রী লইয়া ডুবিয়া গিয়াছিল এমভি শরীয়তপুর-৩ নামের অপর একটি লঞ্চ। গজারিয়ার চরকিশোরগঞ্জের অদূরে সংঘটিত এই দুর্ঘটনা কাড়িয়া লইয়াছিল প্রায় দেড়শত মানুষের প্রাণ। বালুবাহী এই নৌযানগুলি যে নদীবক্ষে ছুটন্ত মৃত্যুফাঁদ হইয়া উঠিয়াছে সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালকও তাহা স্বীকার করিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন যে, বাল্কহেডের ধাক্কায় নিয়মিত দুর্ঘটনা ঘটিলেও কিছু করা যাইতেছে না। কারণ এইগুলি নিয়ন্ত্রণের জন্য অধিদপ্তরে পর্যাপ্তসংখ্যক পরিদর্শক ও জরিপকারক নাই। বারবার তাগাদা দিয়াও কোনো ফল হইতেছে না। বিষয়টি ব্যুরোক্রেটিক চালে পড়িয়া গিয়াছে বলিয়া তিনি মন্তব্য করেন। পর্যাপ্তসংখ্যক জনবল থাকিলেও যে সকল সমস্যার সমাধান হইয়া যাইত তাহাও মনে করিবার কোনো কারণ নাই। নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ বলিয়া যেই প্রতিষ্ঠানগুলি আছে তাহাদের ‘বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরো’র বৃত্তান্ত এই দেশে কে না জানে! সরকারের গঠিত প্রায় প্রতিটি তদন্ত প্রতিবেদনেও তাহার বিশদ বিবরণ রহিয়াছে। ফলে যাহা হইবার তাহাই হইতেছে। সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নৌপথে চলাচলকারী ১০ হাজার বালুবাহী নৌযানের মধ্যে অর্ধেকেরই নিবন্ধন পর্যন্ত নাই। আর এইসব নৌযান যাহারা চালান তাহাদের বৃহদংশেরই প্রশিক্ষণ নাই। নাই ড্রাইভিং লাইসেন্স। তাহাদের অবস্থাও অনেকটা সড়কপথের অদক্ষ ও অবৈধ বাস-ট্রাক চালকদের মতো। পরিণাম একের পর এক দুর্ঘটনা এবং অনভিপ্রেত মৃত্যুর মিছিল। বিশেষ করিয়া রাত্রে পরিস্থিতি ভয়ঙ্কর হইয়া ওঠে। কারণ রাত্রির অন্ধকারে বালুবাহী এই নৌযানগুলিকে শনাক্ত করিবার কোনো উপায় থাকে না। সতর্কতামূলক বিদ্যমান কোনো নিয়মকানুনেরই তোয়াক্কা করেন না এইসব নৌযানের চালকেরা। অবস্থাদৃষ্টে ইহা স্পষ্ট যে, তাহা দেখিবারও কেহ নাই। ফলে বড়ো ধরনের দুর্ঘটনা ঘটাইয়া তাহারা পার পাইয়া যায়। সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অবশ্য বলিয়াছেন যে, এইবার একটা ব্যবস্থা করিতেই হইবে। কঠোর সিদ্ধান্ত লইতে হইবে বাল্কহেডের বিষয়ে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, কর্তাব্যক্তিদের মুখে এই ধরনের কথা আমরা আগেও অনেকবার শুনিয়াছি। তবু আমরা একেবারে আশা হারাইতে চাহি না। আর শুনিতে চাহি না স্বজনহারা মানুষের বুকফাটা আহাজারি।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন