পঠনপাঠন খুব কম বলে বান্ধবসুহূদরা আমাকে নিয়ে কৌতুক করে। দুষ্পাচ্য সব কৌতুক। যেমন? যেমন, ওরা যখন বলে তুমি এ বইটি পড়েছো, সে বইটি পড়েছো কিংবা ওটির খবর রেখেছো, আমি সবসময় ভদ্রলোকের এককথার মত খুব ছোট একটি শব্দ ভয়েসঙ্কোচে ও ক্ষুদ্রতার মাটিমেশা বোধে উচ্চারণ করি-না।
তখন তারা কেউ অবাক হয়, কেউ আমার আলসেমির প্রাকারে অবিশ্বাস্য প্রকারের আঘাত পেয়ে ‘পরাভব’ মানে; কেউ বিস্ময়ের পাথারে ডুবে গিয়ে বলে তাহলে তুমি লেখো কী করে? যা লেখো, কিংবা লেখার দুঃসাহস কর, তা কি আসলে কোন লেখা হয়?
কেউ কেউ মুখটা খুব ফাঁক না করে, অন্যদিকে দেয়াল কিংবা ছাতের দিকে তাকিয়ে মৃদু শব্দে মুখের বিবর থেকে বিটকেলে ফোঁড়ন ছেড়ে দেয়- কী আশ্চর্য, বাংলাদেশে লেখার জন্য আবার পড়া লাগে নাকি?
কেউ কেউ বলে-লেখালেখির সঙ্গে পড়াপড়ির যে কোন সম্পর্ক নেই সেটি প্রমাণ করতে করতেই আমাদের ক্লাসরুম ফ্রেন্ড খ্যাতবিখ্যাত হতে চায়।
একজন বলেছেন মোক্ষম কথা। ওপর পঠনপাঠন নিয়ে বচনকথন থামা। ও যদি পঠনে-অধ্যয়নে সময় অপচয় করে, যাই সে লিখুক তাইবা লেখনের সময় সে কোথা থেকে জোটাবে! বন্ধু হিসেবে আমাদেরতো উচিত ওর প্রতি সহানুভূতিশীল থাকা। কী বলিস? তখন সবাই খোঁচার স্বাদ উপভোগ করতে করতে চূড়ান্ত বিটলেমিতে মৃদুমৃদু হেসে হেসে বলে-সার্টেইনলি! সার্টেইনলি। হোয়াই নট! হোয়াই নট!
দেশে যাদের শ’দুশ’ আড়াইশ’ করে বই আছে, তাদের লেখা যে পড়েননি বলে বলছেন, তা শুনেতো আমারও বিস্ময় লাগছে।
আপনার কেন বিস্ময় লাগছে?
আপনিতো তাতে অনেককিছু লুজ করেছেন। অনেককিছু হারিয়েছেন আপনি!
মনে হয় না, খুব হারিয়েছি।
আপনি ওদেরও জিজ্ঞেস করে দেখতে পারেন। যারা প্রচুর লেখেন, আমিত লিখি এক হাতে, যারা লেখেন দশ হাতে, তারা পড়ার সময় কতটা পান আমি নিশ্চিত নই। যদি প্রতিদিন যত প্রচুর লেখেন, তত প্রচুর পড়তেও পারেন, আমি তাদের দ্বৈত সত্তা ও ঐন্দ্রজালিক ক্ষমতা সশ্রদ্ধ চিত্তে মেনে নেবো। তারা লেখক শুধু নন, যাদুকরও।
এই বড় বড় লেখকদের সঙ্গে আপনি কি একেবারেই পরিচিত নন?
পরিচিত। অবশ্যই পরিচিত। একজনের একটা বই, তার প্রথম উপন্যাস, বহু আগে আমি পুরোপুরি পড়েও ছিলাম। তারপর তার লেখা ও অন্যদের লেখা আমি অনেকদিন পরে পরে পড়েছি খাবলাখাবলা। ওদের টেকনিক ও কৌশল-কুশলতা যখন বুঝে ফেলতে পেরেছি, তখন আমি মনে করেছি থেমে পড়তে পারি। যারা লিখতে লিখতে একটা সময় পার করে তারা কিন্তু একজনের টেকনিক অন্যজন বুঝতে পারে। পড়ে আসলে পাঠক; লেখক, বিশেষত ব্যস্ত লেখক অন্যের লেখা দেখে। দেখে দেখে কখনও তাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার পণ করে, কখনও অসূয়ার কাছে নিজেকে সঁপে, কখনও সম্পাদক কিংবা লেখার সঞ্চালকের বৈরিতা কিংবা কল্প অসহযোগে ক্রুদ্ধ হয়।
লেখক: শ্রমজীবী কথাসাহিত্যিক
