বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অবিশ্বাস্য অগ্রগতি আজ মানব সমাজের শত শত বত্সরের লালিত ধ্যান-ধারণা, চিন্তা- চেতনা এবং কর্মধারার উপর অবিশ্বাস্য প্রভাব বিস্তার করিতেছে। যদিও ইহা কোন নূতন ঘটনা নহে, তবুও চলতি শতাব্দীতে প্রযুক্তির নিত্যনূতন উদ্ভাবনের সহিত তাল মিলাইয়া চলাই দুষ্কর হইয়া পড়িতেছে। বিজ্ঞানের আবিষ্কার মনুষ্য সমাজকে অনেক স্বাচ্ছন্দ্য আনিয়া দিয়াছে এবং সেই সঙ্গে প্রতি শতাব্দীতেই বিজ্ঞানের নব নব অভিযাত্রায় মানুষের ধ্যান-ধারণা, বিশ্বাস, চিন্তা-চেতনায় আসিয়াছে আমূল পরিবর্তন। আদিম মানুষ যেইদিন পাথরে পাথরে ঘষিয়া আগুন আবিষ্কার করিয়াছিল কিংবা যেইদিন মানুষ গোলাকার চক্র আবিষ্কার করিয়াছে সেইদিন তাহাদের দীর্ঘদিনের লালিত ধারণা সম্পূর্ণভাবে পাল্টাইয়া গিয়াছে। ঘোড়ার পরিবর্তে গোলাকার চক্রটির ব্যবহার তাহাকে দিয়াছে অনেক অনেক বেশি বেগ। ঘোড়া ছাড়িয়া মানুষ এইভাবে গাড়ির উপর নির্ভরশীল হইয়া পড়িয়াছে। আবার স্টীম ইঞ্জিন আবিষ্কারের পর মানুষের সভ্যতায় আরেকটি বড় ধরনের অগ্রগতি সূচিত হয়। অতঃপর জেট ইঞ্জিন, ম্যাগনেটিক ফিল্ড ইত্যাদির আবিষ্কার অভাবনীয় পরিবর্তন ঘটাইয়া দিয়াছে মানুষের জীবনকে। ইউরোপে বুর্জোয়া সমাজের আবির্ভাবকে সম্ভব করিয়া তুলিয়াছে বিজ্ঞান। এইরূপে বিজ্ঞান আর প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করিতে করিতে আজ কম্পিউটার প্রযুক্তির অবিশ্বাস্য উত্কর্ষের মধ্যে দিয়া মানুষ যেন রকেটের গতিতে ছুটিয়াছে। ফলে মানব সভ্যতা এক নূতন বাঁক পরিগ্রহ করিতেছে এখন।
মানুষের জ্ঞান অন্বেষণ এবং সেই জ্ঞান অর্জনের উপকরণ হিসাবে সর্বাধিক স্বীকৃত হইতেছে বই-পুস্তক। অস্বীকারের জো নাই যে, ছাপাখানার যন্ত্র আবিষ্কার হইবার পর হইতেই জ্ঞানরাজ্যে মানুষের পদচারণা অনেক সহজতর হইয়া ওঠে।
হিউয়েন সাং, ইবনে বতুতা বা আলবেরুনীরা পর্যটক হিসাবে জ্ঞানের সিংহদুয়ার দিয়া জ্ঞানরাজ্যে প্রবেশ করিয়াছিলেন আর তাহাদের সেই সঞ্চিত অভিজ্ঞতাই পুস্তকের পাতায় স্থান পাইয়া এক জ্ঞানময় লোক সৃষ্টি করিয়াছে। অর্থাত্, সকল জ্ঞানের ভাণ্ডার হিসাবে বই-পুস্তকই সদাসর্বদা কদর পাইয়া আসিয়াছে। বইপত্র পাঠের মাধ্যমে জ্ঞান আহরণের মধ্যেই আধুনিক সভ্যতা টিকিয়া রহিয়াছে। কিন্তু প্রযুক্তির অভিনব ও বিস্ময়কর সব উদ্ভাবন আজ বই-পুস্তকের প্রয়োজনীয়তাকে হুমকির মুখে ঠেলিয়া দিয়া সভ্যতার ক্ষেত্রে আর একটি নূতন বাঁক পরিবর্তন ঘটাইতে চলিয়াছে বুঝিবা। সম্প্রতি একদল গবেষক বলিয়াছেন যে, ছাপা বই-পুস্তকের প্রয়োজন বিশ্বে অচিরেই ফুরাইয়া যাইবে। কেননা বই-পুস্তকে যাহা থাকে উহা এখন সিডির মধ্যে বা কম্পিউটারের হার্ডড্রাইভ কিংবা সফ্টওয়্যারের মধ্যেই পাওয়া যায়। শুধু গুগল সার্চ বা কম্পিউটারের নির্ধারিত বাটনগুলি টিপিলেই মনিটরে সবকিছু দৃশ্যমান হইয়া ওঠে। সুতরাং বই ক্রয় বা বই সংগ্রহের দিন বুঝি শেষ হইতে চলিয়াছে।
তবে মুদ্রার যেমন অপর পিঠও রহিয়াছে তেমনি উল্লিখিত বিষয়েরও দুই দিক রহিয়াছে। যিনি কম্পিউটার প্রযুক্তি বা প্রোগ্রামের অসামান্য সফল ব্যক্তিত্ব সেই বিল গেইটস অবশ্য বইপত্র পাঠের গুরুত্ব সম্পর্কে একাধিকবার কথা বলিয়াছেন এবং তিনি ছাপা বই-পুস্তকের প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করিয়াছেন। জগতের অনেক বড় বড় মনীষীও ছাপা বইপুস্তক বিশ্ব হইতে অপসৃত হইবে এমনটা মানেন না। তাহাদের মতে, ছাপা বইয়ের গুরুত্ব কখনই লাঘব হইবে না। কেননা উহার রহিয়াছে এক ভিন্ন ধরনের বৈশিষ্ট্য, যেই বৈশিষ্ট্যটি সিডি কিংবা অন্য কোন ক্ষেত্রে দেখা বা পাওয়া যায় না। প্রযুক্তি বিশ্ব হইতে বইপত্রকে সম্পূর্ণরূপে উত্সাদন করিবে উহা জ্ঞানান্বেষু মানুষের পক্ষে মানিয়া লওয়া সম্ভবপর কিরূপে? তবে সত্যি সত্যি ছাপার অক্ষরের বইগুলি এই জগত্-সংসার হইতে সম্পূর্ণভাবে অস্তিত্বহীন হইয়া পড়িবে নাকি উহাও টিকিয়া থাকিবে, উহা দেখিবার জন্য মানব জাতিকে আরও বেশ কিছুকাল অপেক্ষা করিতে হইবে নিশ্চয়ই।
