বরিশাল সরকারি ব্রজমোহন কলেজে যাহা ঘটিয়া গেল তাহাতে লজ্জায় মাথা হেঁট হইয়া যায়। মনে প্রশ্ন জাগে, দেশে ছাত্র রাজনীতির নামে এইসব কী হইতেছে? যেই দেশের ছাত্রসমাজ বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন হইতে শুরু করিয়া মহান মুক্তিযুদ্ধ অবধি জাতীয় ইতিহাসের অসংখ্য গৌরবময় অধ্যায়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রসহ আমাদের প্রতিটি মহত্ অর্জনের পিছনে রহিয়াছে যাহাদের অসামান্য অবদান, সেই দেশের কোনো ছাত্র শিক্ষকের গায়ে হাত তুলিতে পারে তাহা কি ভাবা যায়? অথচ গত মঙ্গলবার ঠিক তাহাই ঘটিয়াছে বরিশালে। আরও পরিতাপের বিষয় হইল, এমন একটি সময়ে এই ন্যক্কারজনক ঘটনাটি ঘটানো হইয়াছে যখন নূতন প্রজন্ম ইতিহাস সৃষ্টি করিয়া চলিয়াছে শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরে। শত সমস্যা-সংকটে জর্জরিত জনগণ যখন বুকভরা আশা লইয়া তাহাদের দিকে তাকাইয়া আছে তখন এই ধরনের ঘটনার পরিণাম ও প্রতিক্রিয়া কী হইতে পারে— তাহাও বলার অপেক্ষা রাখে না।
ইত্তেফাকে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ব্রজমোহন কলেজের নূতন নিয়োগপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ শংকর চন্দ্র দত্ত দায়িত্ব গ্রহণ করিতে গিয়া ছাত্রলীগ নেতাদের হামলার শিকার হইয়াছেন। তাঁহাকে নির্দয়ভাবে মারধর করা হইয়াছে। আর এই অপকর্মটি যাহারা সংঘটিত করিয়াছেন তাহাদের নাম ও পদবি শুধু নয়, ছবিও ছাপা হইয়াছে সংবাদপত্রে। কিন্তু তাহাতে কি প্রতিকার মিলিবে? শাস্তি পাইবে দায়ী ব্যক্তিরা? বন্ধ হইবে এই ধরনের লজ্জাজনক ঘটনার পুনরাবৃত্তি? আমাদের অভিজ্ঞতা তাহা বলে না। বরং প্রবীণ শিক্ষককে প্রকাশ্যে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করিয়া যাহারা বীরত্ব প্রদর্শন করিয়াছেন তাহারা পুরস্কৃত হইলেও অবাক হইবার কিছু থাকিবে না। ভুক্তভোগী অধ্যক্ষ বলিয়াছেন যে, কলেজে যোগদানের বিষয়ে আগের রাত্রেই তিনি নিরাপত্তা চাহিয়া সংশ্লিষ্ট থানায় লিখিত আবেদন করিয়াছিলেন। অবহিত করিয়াছিলেন জেলা প্রশাসককেও। কিন্তু ‘রহস্যজনক কারণে’ প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় তিনি হামলার শিকার হইয়াছেন। মজার ব্যাপার হইল, হামলার সাথে সংশ্লিষ্টরাও দায় চাপাইয়াছেন প্রশাসনের উপর। সাবেক অধ্যক্ষের বদলি ঠেকানোই যে এই হামলার আসল উদ্দেশ্য তাহাও কোনো গোপন বিষয় নহে।
সমস্যার গোড়া যে এইখানেই তাহা বুঝিতে অসুবিধা হয় না। সরকারি কলেজে বদলির নিয়মনীতি আছে। নিয়ম অনুযায়ী মেয়াদ পূর্ণ হইলে একজন বিদায় হইবেন, অন্যজন আসিবেন। ইহাতে কলেজের ছাত্ররাইবা জড়াইবেন কেন, আর দায়িত্ব গ্রহণ করিতে আসিয়া অধ্যক্ষ পদমর্যাদার একজন শিক্ষককে কেন প্রশাসনের নিকট নিরাপত্তা চাহিতে হইবে? এই প্রশ্নের উত্তর ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন। অপ্রিয় হইলেও সত্য যে, আমাদের দেশে নিয়োগ-বদলি-পদোন্নতি কিছুই স্বাভাবিকভাবে হয় না। এইখানে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা যে লাগে তাহা কোনো নূতন কথা নহে। তবে আজকাল শুধু টাকায়ও কাজ হয় না। ক্ষমতার আশীর্বাদ লাগে, লাগে পেশিশক্তির সমর্থন। আর ইহার জন্য এককভাবে কাহাকেও দায়ী করিবারও উপায় নাই। একহাতে যে তালি বাজে না তাহা কে না জানে! শুধু কি ছাত্ররাই সীমালঙ্ঘন করিতেছে? আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকগণ কি তাহাদের ঐতিহ্যগত মর্যাদার আসনটি সম্পূর্ণ কালিমামুক্ত রাখিতে পারিয়াছেন?—যদি পারিতেন তাহা হইলে হয়তো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে এই ধরনের অনভিপ্রেত ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটিত না। বস্তুত এই নীতিহীনতা, অনিয়ম ও অরাজকতাই এখন সমাজ ও রাষ্ট্রের নৈমিত্তিক চিত্র হইয়া দাঁড়াইয়াছে। রাষ্ট্র যাহারা চালান তাহাদের দায়িত্ব হইল, শক্ত হাতে ইহার লাগাম টানিয়া ধরা। অন্যথায় এই সংক্রামক ব্যাধি হইতে কাহারো নিস্তার মিলিবে বলিয়া মনে হয় না।
