ওই নতুনের কেতন ওড়ে...

আপডেট : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২১:৪৫
’৭১ আবার মাথা তুলেছে শাহবাগে। সেখানে ঘটেছে গণজাগরণ। আর এ জাগরণের নেতৃত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশের তরুণ সমাজ, যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি। সারাদেশের দৃষ্টি এখন শাহবাগে। শুধু দেশ নয়, সারাবিশ্ব তাকিয়ে আছে এখন বাংলাদেশের দিকে। বিশ্বের অন্যতম গণমাধ্যম সিএনএন অনলাইন শাহবাগের জাগরণ নিয়ে শিরোনাম করেছে-‘দ্য স্পিরিট অব ৭১’ রাইজেস অ্যাট শাহবাগ স্কোয়ার ইন ঢাকা।’ শুধু সিএনএন নয়; গত কয়েকদিন ধরে বিবিসিসহ সারাবিশ্বের মিডিয়ার শিরোনামে বাংলাদেশ। এই জাগরণের নেতৃত্বে কোনো নেতা নেই, আছে যুবসমাজ। রাত নেই, দিন নেই, দিনের পর দিন চলতে থাকা এই গণজোয়ারের বিরাট অংশই দেশের নতুন প্রজন্মের তরুণ সমাজ, যারা একাত্তর দেখেনি। যাদেরকে অত্যন্ত চতুরতার সাথে একাত্তরের বিকৃত ইতিহাস শোনানো ও শেখানো হয়েছিল। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি ভেবেছিল বিকৃত ইতিহাস অব্যাহতভাবে শেখানোর ফলস্বরূপ দেশের নতুন প্রজন্ম বিকৃত ইতিহাসকেই আসল ভেবে নেবে। কিন্তু তরুণসমাজ বিভ্রান্ত হয়নি। তাদের কণ্ঠে চার দশক পর আবার বজ নিনাদ উঠেছে- ‘জয়বাংলা’। এ যেন একাত্তরের পুনরভ্যুত্থান। এ যেন ত্রিশ লাখ শহীদের সম্মিলিত কণ্ঠস্বর-‘ রাজাকারদের ফাঁসি চাই, রাজাকারদের ঠাঁই এই বাংলায় নাই।’ ১৯৭১ আর ২০১৩ যেন একাকার হয়ে গেছে শাহবাগে । কোনো রাজনৈতিক দলের ডাকে নয়, কোনো রাজনৈতিক নেতৃত্বের ছায়ায় নয়, মনের গহীন থেকে যে ডাক এসেছে, সেই ডাকে সাড়া দিয়েছে তরুণ প্রজন্ম। ’৭১-এর একজন যুদ্ধাপরাধীর বিচারের একটি রায় তাদের মনঃপুত না হওয়াতে যে জনজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে তা অকল্পনীয়। এ জোয়ারকে কীভাবে অস্বীকার করবে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তি? আজ সময় এসেছে তরুণ প্রজন্মের দাবিকে মেনে নেয়ার। এ দাবি যদি মেনে নেয়া না হয় তাহলে তরুণ প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তিও প্রশ্নের মুখোমুখি হবে। শাহবাগের এই গণজাগরণ ইতিহাসের একটি টার্নিং পয়েন্ট। এই টার্নকে যে বা যারা ভিন্নখাতে প্রবাহের চেষ্টা করবে আজ হোক কাল হোক তারা ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হবেই। এই ঐতিহাসিক গণজাগরণের স্বতঃস্ফূর্ততা, তারুণ্যের নবউত্থানকে অস্বীকৃতি জানানো হবে চরম বোকামি। ইতিহাসে আছে, পৃথিবীর বেশিরভাগ গণআন্দোলন কোনো না কোনো দলীয় নেতৃত্বের মাধ্যমেই শুরু হয়েছে, কিন্তু তা পূর্ণতা পেয়েছে জাতীয় চরিত্র অর্জনের উপর। ’৬৯- এর গণঅভ্যুত্থান, ’৭১-এর স্বাধীনতা সংগ্রাম ’৯০-এর গণআন্দোলন এই জাতীয় চরিত্র অর্জন করেছিল। ২০১৩ সালেও শাহবাগের গণজাগরণ যেন সে উদাহরণ বহন করে। ’৬৯, ’৭১ ও ’৯০-এর মতো ২০১৩-এর গণজাগরণের বৈশিষ্ট্য তরুণদের ঐক্য। বাংলাদেশের সব তরুণ যেন এক রাস্তায় শামিল হয়েছে। তাদের দাবি রাজাকারমুক্ত বাংলাদেশ। তাদের শ্লোগান ‘একাত্তরের হাতিয়ার গর্জে উঠুক আরেকবার।’ তরুণদের এই ঐক্যকে সাফল্যলাভ করতে দেয়া যার যার অবস্থান থেকে নৈতিক দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই দায়িত্বে যে অবহেলা করবে ইতিহাস তাকে ক্ষমা করবে না। নতুন নেতৃতে যে নতুন একাত্তর গর্জে উঠতে চাইছে দেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে তা বিস্ময়কর। ২০১৩ সাল যেন তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। আমাদের তরুণরা যে পথভ্রষ্ট হয়নি; রাজাকারদের বিষয়ে যে তারা উদাসীন নয়, তারা যে ঘাতকদের চিনতে ভুল করেনি, ক্ষমা করেনি- এর মূল্যায়ন দরকার, প্রবলভাবেই দরকার- আমাদের সার্বভৌমত্বকে শক্ত ভিতের উপর দাঁড় করানোর জন্য। রাজাকাররা ভেবেছিল, চার দশক একটি দীর্ঘ সময়। এই সময়ের মধ্যে বাংলার মানুষ ’৭১-এর নৃশংসতা ভুলে যাবে। সেজন্য রাজাকাররা দম্ভ করেই বলতে পেরেছিল এ দেশে কোনো যুদ্ধাপরাধী নেই। আর নব্য রাজাকাররা বলতে পেরেছিল, জামায়াত নেতাদের গুরুদণ্ড (ফাঁসি) হলে দেশে গৃহযুদ্ধ বেঁধে যাবে। এটা তো সেই ’৭১-এর আস্ফাালন। এই আস্ফাালন আরো প্রকট হয়, যখন আমরা দেখি একজন প্রতিষ্ঠিত রাজাকার আদালতের এজলাসে দাঁড়িয়ে ‘ভি’ চিহ্ন দেখায়। তরুণরা যে শপথবাক্য পাঠ করলো লাখো মানুষের সমাবেশে, যে সমাবেশ স্মরণকালের ইতিহাসে দেখা যায়নি— সেটিই হলো বাংলার জাগরণের মূলমন্ত্র। উপযুক্ত সময়ে যে বাংলার মানুষ বিপ্লব ঘটাতে সক্ষম, শাহবাগ তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তরুণরা দীপ্তকণ্ঠে লাখো মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সমাবেশে ঘোষণা দিয়েছে, বাংলার মাটিতে যারা রাজনীতি করবে তাদের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক-বাহক হতে হবে। অন্যথায় তাদের স্থান এ দেশে হবে না। আমরা স্বাগত জানাই, অভিনন্দন জানাই, আশীর্বাদ করি আমাদেরকে পথ দেখাবার জন্য। নতুনদের জয় হোক। শাহবাগের ঐতিহাসিক গণসমাবেশের শপথ ছিল স্বাধীনতার যুদ্ধের মূল লক্ষ্যে ফিরে যাওয়ার এবং একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। এই আন্দোলনের চরিত্র একেবারেই ভিন্ন। এতে যোগ দিয়েছে দেশের তরুণসমাজ। তরুণদের ডাকে এখন সকল পেশার মানুষ ছুটে এসেছে শাহবাগে। এসেছে নারীরা, মায়ের কোলে চড়ে শিশুরা। এই যে সব বয়সীদের আগমন, এটা তো যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে জাতীয় ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ। ক্রোধ এখন শক্তি। এই শক্তিকে এগিয়ে নিতেই হবে। না হলে আমরা হয়ে পড়ব ভাগ্যহীন জাতি। যে জাতির এমন সংগ্রামী ইতিহাস আছে সে এমন এক আনন্দময় মুহূর্তে ঘরে বসে থাকতে পারে না। তাই জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে জমায়েত হতে হবে শাহবাগে। ‘একাত্তরের হাতিয়ার গর্জে উঠুক আরেকবার’ শ্লোগানের গগণবিদারী উচ্চারণকে ছড়িয়ে দিতে হবে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ায়। নতুনের যে কেতন শাহবাগে উড়ছে তার জয় হবেই হবে। বাংলার মানুষ বুক ভরে জয়ধ্বনি করবে, ‘রাজাকারমুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ।’ এবার আমাদের এগিয়ে যাওয়ার পালা। বাংলার সব শ্রেণির মানুষের বিশ্বাস স্বাধীনতার এই ‘দ্বিতীয় যুদ্ধে’ দেশের তরুণ সমাজ তথা বাঙালি জাতির জয় হবেই। লেখক: উপাচার্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন