বিশ্বায়ন ও মুক্তির নতুন দূত তারুণ্য

আপডেট : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২০:২১
পৃথিবী জুড়ে নতুন এক বাংলাদেশ ভেসে উঠেছে। সেচেন রূপকথার গল্পের মত নদীর বুক থেকে উঠে আসা জলপরীর মত। অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা, এশিয়া, প্রশান্ত, আতলান্তিক বা রাইন যে কোন নদীর তীরে, মাঠের বুকে, রাজপথে এসে দাঁড়িয়েছে আরেক বাংলাদেশ। এই জনজাগরণের ঢেউ এসেছে ঢাকা থেকেই। কিন্তু এই ঢাকা ধুলোবালি, আবর্জনা, মানুষের নিঃশ্বাস আর অপরাজনীতিতে ঢাকা নয়। তারুণ্যের দীপ্তিতে উজ্জ্বল প্রাণের সতেজ দিয়ে ঢাকা ঢাকার উদাত্ত আহ্বানে জেগে ওঠা। স্বদেশের এই পরিচয় যেন ‘তোমার দুয়ার আজি খুলে গেছে’র মত হয়ে জেগে আছে হূদয়ে হূদয়ে। এ পর্যন্ত ঠিকই আছে। আমরা আবেগপ্রবণ হয়ে অনেক বড় কাজ করি, বড় স্বপ্ন দেখি, বড় প্রত্যাশা জাগাই। কিন্তু অর্জন ধরে রাখতে পারি না। পারলে এই প্রজন্মকে পথে নামতে হতো না। বিশ্বায়নের কালে খুলে যাওয়া দুনিয়া দেখে এবং জেনে বড় হওয়া প্রজন্মটিকে নিন্দা করতে পঞ্চমুখ বা মুখিয়ে থাকা অভিভাবকরা কি ভেবে দেখেছেন? এরাই আজ আমাদের শিক্ষক। অভিজ্ঞতা আর সাবধানতা মানুষকে হিসেবী করলেও সবসময় জয়ী বা উজ্জ্বল করে তোলে না। পৃথিবীর সব দেশে, সব জাতিতে সর্বকালের ইতিহাসের রচয়িতারা ছিলেন তরুণ-তরুণী, যেসব বয়স্কজনেরা তা করেছেন তারাও মানসিকভাবে ছিলেন তরুণ তুর্কী। আমাদের শাহবাগ তারই পথ ধরে দেশ ও জাতির সামনে এক নতুন যুগের, নতুন সম্ভাবনার মুখ খুলে দাঁড়িয়েছে। বয়স্কজনেরা বলছেন, নেতৃত্ব ও নির্দেশনা চাই, মানলাম, কিন্তু জ্বলে ওঠার পূর্বমুহূর্ত অবদি তা নিয়ে ভাবেননি তারা। শুধু কি তাই? দেশের রাজনীতির বিজ্ঞ-অভিজ্ঞ জনেরাও শিক্ষা নিতে পারেননি। পারলে দ্রুত গিয়ে চেহারা দেখানোর ঝুঁকি নিয়ে অপমানিত হয়ে ফিরে আসতেন না। আমাদের ঠাট্টা-বিদ্রূপ আর চোখ ঠাউরানোর নিত্যশিকার যে প্রজন্ম তাকে হঠাত্ স্ফুলিঙ্গ হয়ে উঠতে দেখে ঝাঁপিয়ে পড়াকে আত্মাহুতি ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে পারছি না। অথচ নবীন বা তরুণ প্রজন্মের হাতে রসদ ছিল না, অর্থ ছিল না, এমনকি পেছনে খুঁটির জোরও ছিল না। তারা এসে দাঁড়িয়েছিল বা আজো দাঁড়িয়ে আছে পবিত্র এক চেতনার শক্তিতে। যার নাম দেশপ্রেম। দুর্ভাগ্য আমাদের, দেশের প্রবীণ অভিজ্ঞ ঝানু নামে পরিচিত বিজ্ঞ জন বা রাজনীতিক এই জাতীয় প্রেম বা চেতনায় কথা বলে মুখে ফেনা তুললেও তাতে বিশ্বাস করে না। বিশ্বাস করার শুদ্ধতা বা খাঁটি মন ও বিবেককে অনেক আগেই গলাটিপে হত্যা করে ফেলেছে তারা। অর্থ, সম্পদ, প্রাণ আর যৌবন ভোগের তাগিদে হত্যা লুণ্ঠন খাওয়াতে বিশ্বাসীরা আস্ত সেতু গিলেও বুঝতে পারে না মানুষ তাদের কি দৃষ্টিতে দেখে। তারুণ্য তাই তার আপন হাতে তুলে নিতে বাধ্য হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শের একক মালিকানার দাবিদাররা ক্ষমতায় এসে পুলিশ নামিয়ে নিজেরা চুড়ি পরে ঘরে বসে রইলেন। আরেক দল রাস্তা না আপোস, মুক্তি না পাকি, এই দ্বন্দ্বে নিজেরাই আজ ক্ষতবিক্ষত। যার মানে এই দেশ ও ইতিহাস কখনোই শুদ্ধ হতে পারবে না, আর অশুদ্ধতা মানেই রক্তারক্তি, যুদ্ধ, জ্বালাও-পোড়াও রাজনীতির এই পাতানো খেলায় বীতশ্রদ্ধ সাধারণ মানুষের অন্তরের ইচ্ছে আর মুক্তির আকুলতাই তারুণ্যকে শাহবাগে টেনে এনেছে। একটি দুটি তিনটি করে আসা মানুষ তিন লক্ষে বা তারও বেশি হয়ে দেশের তো বটেই প্রবাসী বাংলাদেশিদেরও পথে নামিয়ে এনেছে। এই নেমে আসা আনন্দের, এই প্রতিবাদ সাহসের, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক পরিচয় বিনষ্ট করে বা সম্মান রক্ষা করে এমন অতীত ধুয়ে মুছে সাফ করার বিকল্প নেই। বিকল্প নেই চোর, বাটপাড়, রাজাকার বা অন্ধ রাজনীতির অবদানেরও। শাহবাগ যে চেতনার কথা বলছে তাতে এর সবগুলোই জড়িয়ে আছে, যে কারণে এটি দলীয় কিছু নয়, নির্দলের শক্তি, অপার চেতনার মুক্তিযুদ্ধ বলেই এই ধারণা আজ প্রবাসীদেরও নির্ঘুম রেখেছে। আমাদের ধারণা ছিল এ তারুণ্য রাতে ঘুমোয় না। দিনে তাদের নিদ্রাভঙ্গ হয় না। কর্ণকুহরে কুন্দ ফুলের মত যন্ত্র গুঁজে রাখে, পোশাকের ধার ধারে না, মুক্তিযুদ্ধ বা অতীতের গল্প শুনলে উঠে চলে যায়, এদের দ্বারা কিছু হবে না। ভুল, আমাদের বয়সী চোখে ছানি পড়ছে, আমাদের শ্রবণশক্তি হ্রাস পেয়েছে, আমাদের চিন্তাও আজ বৃত্তাবন্দী। তাই আমরা বুঝে উঠতে পারি না। যে আগুন তারুণ্যকে জ্বালিয়ে খাঁটি করেছে সে খাঁটি সোনার স্পর্শে উদ্বেল প্রবাসী তারুণ্যকেও সাথে রাখতে হবে, এরাই বিশ্বায়নের দূত। এরা পরাভব মানে না। মানে না বলেই ক্ষমতা বিরোধী, পক্ষ-বিপক্ষ সকল রাজনৈতিক শক্তিকে কাঁচকলা দেখিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় শুদ্ধ আবহ তৈরি করেছে। কি আশ্চর্য, একমাত্র নোবেল জয়ী গেলেন না। গেলেন না বাঙালির জন্য কেঁদে কাতর হওয়া অনেক বুদ্ধিজীবী পন্ডিতজনেরাও। তাতে কি যায়-আসে, স্লোগান থেকে দেশপ্রেম, চেতনা থেকে বুদ্ধি, সবটুকুই রাজনীতি বা দলীয় আবহ মুক্ত করে তারুণ্য আজ পথিকৃত্, আন্তর্জাতিকায়নের এই যুগে আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার প্রেরণা হিসেবে এই আন্দোলনকে মেনে নিতে পারলেই আমরা এগুতে থাকব। অন্য কোন ষড়যন্ত্র বা প্রলোভন নয়, এটাই ইতিহাস ও শাহবাগের শিক্ষা। (সিডনি থেকে) [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন