জনরোষ আর ক্ষোভের আগুনে ঝলসানো দামামা তুমুল বেজে চলেছে দেশজুড়ে, তারই বৈদ্যুতিক টঙ্কারে রাষ্ট্রের সেকুলার-ননসেকুলার ব্যবস্থাপক শাসককুল ভীতি আর শঙ্কাহেতু জ্বরের প্রকোপে বেদিশা এখন। শঙ্কিত অনুদানদাতা-পরামর্শদাতা-নির্দেশদাতা বিদেশি বিধাতারাও। প্রকৃত জনসংহতির বিরুদ্ধে ‘আইনের শাসন’ নামক পুলিশি প্রতিরক্ষা-রাষ্ট্র কায়েমের বাসনাকাতর, অথচ জ্বালাও-পোড়াও-মারো-কাটো প্রাদুর্ভূত রাজনৈতিক সংস্কৃতির উস্কানিদাতা এই বিধাতারা ভয় পাচ্ছেন, ‘নিরপেক্ষ’ রেফারি সেজে ক্ষমতার বল এ কোর্ট থেকে ওকোর্টে চালাচালির এতোকালের ইতিহাস না-জানি উল্টোপথে গড়াতে শুরু করে; জনগণের সম্পদ ও সস্তাশ্রম লুট, পুঁজি ও পণ্য প্রসারের তথাকথিত ‘উদারনৈতিক’ পথে না-জানি এ আন্দোলন বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
তথাকথিত সেকুলার গদিনসীন আর তাদের ক্ষমতাহীন পিসতুতো ভাই-বেরাদর নন-সেকুলার ব্যবস্থাপক রাজনীতিকরা কেউই এ জাগরণের মাজেজা বুঝতে পারছেন না, নতুন সমাজকাঠামো ও জনমানসের ধাত তারা ধরতে পারছেন না। সেকুলারগণ যুদ্ধাপরাধী বিচারের নামে বিরোধী পক্ষ সাইজ করবার খেলায় নেমে এখন দিশাহারা, প্রজন্ম চত্বরের গণরায় তাদের আইন-আদালতী পাতানো রায়ের জারিজুরি উদোম করে দিয়েছে—সুতরাং, শাহবাগের ইতিহাস তাদের নয়। অন্যদিকে, কম্পমান যুদ্ধাপরাধী ও তাদের সাথীরা এখন বাংলার মাটিকে ভাবতে শুরু করেছেন বিদেশবিভুঁই, কারণ ৪০ বছর ধরে তারা সদম্ভে লাঞ্ছিত করেছে এর পতাকা ও সম্ভ্রম—সুতরাং, এ ইতিহাস তাদেরও নয়। তারা নির্মীয়মাণ ইতিহাসে প্রান্তিক, খল, প্রতারক, বিশ্বাসঘাতক। এ প্রজন্মের রাজনৈতিক ভাষা তাদের বোধের অতীত।
বলা দরকার, ‘গণ’মাধ্যম হিসেবে পরিচিত রেডিও, টেলিভিশন ও সংবাদপত্র শাহবাগ ঘটনার বিপুল কাভারেজ দিলেও এলিট-আধিপত্যের পক্ষে ক্ষতিকর বা রাষ্ট্রকাঠামোর আমূল বদল ঘটানোর মতো কোনো দিকনির্দেশনা তারা ও তাদের বুদ্ধিজীবীরা এই আন্দোলন থেকে তুলে ধরবে না। কারণ, ‘গণ’ শব্দটি নিজেদের গায়ে লেপ্টে রাখলেও তারা জনগণের মাধ্যম নয়, কর্পোরেট ব্যবসাবাণিজ্যের হকার। আর, এসব কর্পোরেট মিডিয়াগুলো তথাকথিত ‘বস্তুনিষ্ঠ’ নিরপেক্ষতার দোহাই পেড়ে যেকোনো ঘটনাকে, রবার্ট ফিস্কের জবানে, ফুটবলের ধারাভাষ্যের মতো প্রচার করে। আমরা বলতে পারি, ক্ষমতার ফুটবল নিয়ে দৌড়ঝাঁপের তদারকি করতে সংবাদকর্মীরা বর্তমান পরিস্থিতিতে বহুলাংশেই রেফারির লাইনম্যান হিসেবে শাহবাগ চত্বরের এ মাথা থেকে ও মাথা দৌড়াদৌড়ি করছে। সামাজিক স্থিতিশীলতা ও ব্যবসাবাণিজ্যের পরিবেশ বিঘ্নিত করা তাদের স্বভাববহির্ভূত। বিকল্প সংস্কৃতিকে তো তারা যমের মতো ডরায়। সেহেতু, কর্পোরেট মিডিয়াগুলো আন্দোলনকে একটা উত্সবে পর্যবসিত করছে। নির্ধারিত বাজার-সাংবাদিকতা ফ্রেমের সীমানায় দাঁড়িয়ে শাহবাগ থেকে তারা উত্সবমুখরতার বার্তাই কেবল পরিবেশন করে চলেছে দেশবাসীর কাছে। বিকল্প কিছু পরিপ্রেক্ষিত যে একেবারে উঠে আসছে না, সেটা বলছি না; বলছি সংবাদকর্মীদের সাধারণ প্রবণতার কথা।
তাহলে, কোন রসুইখানার সৌরভে ভর করে এ গণজোয়ার দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ল? মার্শাল ম্যাকলুহান গত শতকের সেই ষাটের দশকে টেলিভিশনের কারিশমা দেখে যে ‘গ্লোবাল ভিলেজের’ কথা বলেছিলেন, আজ তা এক অনিবার্য বাস্তব, আমরা সেই বিশ্বগ্রামের বাসিন্দা। ঘটে চলেছে বিশ্বায়ন, একে কেবলমাত্র সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়ন বা অর্থনীতির বিশ্বায়ন বললে ভুল হবে। এ-বিশ্বগ্রাম একমাত্রিক নয়, বহুমাত্রিক ও বহুবর্ণিল; সমতাভিত্তিক নয়, বৈষম্যে ভরা। এ-গ্রামের মানুষদেরকে কেবলই ভোক্তা-ভোটার-অনুগত বানানোর পাঁয়তারা চলে; এ-গ্রামে সবার স্বর সমান জোরে শুনতে পাওয়া যায় না, কারো স্বর একেবারেই শোনা যায় না; সবার সমান ভূমিকাও থাকে না, সকলে সুবিধাও পায় না; প্রবলের স্বর প্রান্তিককে চাপা দেয়। তবু, এ-গ্রামে আধিপত্যের বিপরীতে প্রতিরোধের জাগতিক লড়াই অবিরাম চলতে থাকে। জঙ্গি দমনের নামে দেশে দেশে মার্কিনি হামলা চলে, কর্পোরেট লুটপাট চলে, আবার ফেসবুক-টুইটারে ভর করে আরব বসন্তের হাওয়া বইতে থাকে; এবং আন্দোলনের তোড়ে তিউনিসিয়া ও মিসরের স্বৈরশাসকদের পতন ঘটে যায়। নিশ্চিত করেই বলা যায় যে, এই বিশ্বগ্রামের রীতিনীতি, আদব-লেহাজ, আর রাজনৈতিক অর্থনীতি সবার জীবনকেই স্পর্শ করে যাচ্ছে। বলা যায়, আমরা একটা নতুন ধরনের সমাজকাঠামোর অবয়ব ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠতে দেখছি, যা একইসাথে স্থানিক ও বৈশ্বিক, যা জাতি-বর্ণ-রাষ্ট্রীয় সীমানা-পাঁচিল অনায়াসেই ডিঙিয়ে ভিন্নতর সম্প্রদায় গড়ে তোলে। আমরা যদিও একে জ্ঞান-সমাজ বা তথ্য-সমাজ বলেই কাজ চালিয়ে নিচ্ছি এখনও, ম্যানুয়েল কাসট্রাল (২০০৫) বিকাশমান এই সমাজকে জ্ঞান-সমাজ বা তথ্য-সমাজ বলতে নারাজ। কারণ এই নয় যে, জ্ঞান বা তথ্য বর্তমান সমাজের মূল চালিকাশক্তি নয়, বরং এ-কারণে যে সর্বকালে সব সমাজেই বস্তুত জ্ঞান ও তথ্য মূল চালিকাশক্তি ছিল। বিকাশমান এ সমাজকাঠামোর ভিত্তি দিয়েছে ডিজিটাল নেটওয়ার্কিং প্রযুক্তি। তাই, তিনি একে বলছেন ‘নেটওয়ার্কড সোসাইটি’ বা আন্তর্জালিক সমাজ। আর পুরনো সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিন্যাস ভেঙেচুরে এ সমাজে যে সংস্কৃতির উন্মেষ ঘটে আমি তাকে বলি: ‘মিডিয়া-সংস্কৃতি’। নতুন প্রজন্ম এই মিডিয়া-সংস্কৃতিরই জাতক। আর, এই মিডিয়া-সংস্কৃতিই শাহবাগের নিশান উড়িয়েছে।
কিন্তু, শাহবাগের নিশান আমাদেরকে কোন গন্তব্যে নিয়ে যাবে? মুক্তিযুদ্ধের চার দশক পার হলো: আমরা কাগজে-কলমে স্বাধীন একটা দেশ পেয়েছি বটে, কিন্তু সেই স্বাধীনতা কে ভোগ করে? কোন রাজনৈতিক কলকাঠিতে প্রবল বাঙালি জাতীয়তাবাদিত্ব আর মুসলমানিত্বের পৌরুষের দাপটে হিন্দু-বৌদ্ধ-খৃস্টান ধর্মের এবং সাঁওতাল-গারো-চাকমা-মারমা-হাজঙ ইত্যাদি জাতিসত্তার মানুষ নিজভূমে প্রান্তিক ও পরবাসী হয়ে ওঠে, পলায়ন করে? কে আগুনে পুড়িয়ে বেশুমার শ্রমিককে কয়লা বানায়? কে কালো বিড়ালের ঠাণ্ডা নখের ধারালো থাবায় সন্ত্রাসীর মুখোশ পরিয়ে মানুষ মারে? কারা বিনাবিচারে বছরের পর বছর কয়েদ খাটে? গণতন্ত্র-গণতন্ত্র খেলা খেলে কারা এই দেশের মাটি, মানুষ আর স্বাধীনতাকে সাম্রাজ্যবাদীদের কাছে নিয়মিত ইজারা দেয়? চল্লিশ বছর ধরে অমীমাংসিত এরূপ হাজার প্রশ্নের কাঁটা বিছানো হয়েছে পথে পথে। সেই কণ্টকিত অলিগলির আলোআঁধারী ডিঙিয়ে মানুষ আজ জড়ো হচ্ছে শাহবাগ চত্বরে। যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিই কেবল সেখানে উচ্চকিত হাজার কণ্ঠে জাহির হলেও, আমি বলবো, তা উছিলামাত্র। বস্তুত, শাহবাগ নতুন যুগের নিশান হয়ে গণমানুষকে স্বাধীনতার পথে হাঁটতে শেখাচ্ছে। তারা বুঝে নিয়েছে, যেকোনো রঙের সরকার ক্ষমতার ছকে ছকে এক্কা-দোক্কা খেলে। তারা শিখে নিচ্ছে, গণআন্দোলনের মাধ্যমেই ন্যায়বিচার ছিনিয়ে নিতে হয়, রাস্তার দখল নিতে হয়, যুদ্ধাপরাধের বিচার করতে হয়। শাহবাগের নিশান তাই হুঁশিয়ারি জানাচ্ছে: রাজরাজড়াদের নির্বিঘ্ন চলাচলের জন্য সাধারণ মানুষের টাকায় গড়া ‘রাজ’-পথ এখন থেকে হতে হবে ‘জন’-পথ।
বাহান্ন, উনসত্তর, একাত্তরের মতোই যুগসন্ধিক্ষণ উপস্থিত হয়েছে: জন ও জীবনবিরোধী রাষ্ট্র ব্যবস্থাপকদের আনুগত্য ও দাসত্ব, প্রবল ও প্রতাপশালীর ‘পবিত্র’ অভিজাততন্ত্র, ধর্মান্ধ মোল্লা ও সেকুলার সাহেবের উচ্চবর্গীয় একমাত্রিক ইতিহাস-কাহিনীর ঘেরাটোপ ভেঙে বহু জন-জাতি, ধর্ম ও সেকুলারপন্থি বহু মানুষের বহুস্বরের ইতিহাস-কথা লিখবার ডাক এসেছে, লিখবে নতুন প্রজন্ম।
শাহবাগের শ্লোগানগুলো যদিও যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি দাবি উচ্চকণ্ঠে জাহির করছে, ইসলামপন্থি রাজনৈতিক দল এবং প্রতিষ্ঠান বয়কট বা নিষিদ্ধ করার দাবি তুলছে অনেকটাই ফ্যাসিবাদি কায়দায়। তবু, বাতেনি সংবাদ হইল: শাহবাগের নিশানা ধরে মুক্তিযুদ্ধের ‘চেতনা’ দখলকারী তথাকথিত ‘পক্ষের শক্তি’ রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবীদের সংকীর্ণতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দেশজুড়ে জেগে উঠেছে জনযুদ্ধের জনচেতনা। ইতিহাস সাক্ষী: মুক্তিযুদ্ধ প্রকৃতার্থেই জনযুদ্ধ ছিল। তাই, যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির দাবিতে জেগে ওঠা এই দ্বিতীয় জাগরণের চেতনা হলো জনযুদ্ধের জনচেতনা—এর প্রকাশ এখনও যদিও সাংস্কৃতিক। চার দশকের প্রতারণা ও প্রবঞ্চনার স্মৃতিতাড়িত এই চেতনা ও লড়াই কেবল ’৭১এর পরাজিত শত্রুদেরকেই পোড়াবে না, ‘পক্ষের শক্তি’ নামক দেবালয় বাসিন্দাদের আপোসকামিতাকেও অথৈ জলে ডোবাবে।
ইতিহাসের এমন লগ্ন সবসময় আসে না—এসেছে যুদ্ধাপরাধী বিচারের পুরনো কিন্তু অমীমাংসিত প্রশ্নের রূপ ধরে। নিশ্চয়, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভিত্তি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ছাড়া অথৈ জলে টলমল করে ভাসতে থাকবে। তাই সর্বাগ্রে এর সুরাহা হতে হবে। আর, এই আইকনিক প্রশ্নের হীমশৈলে লুকানো আছে রাষ্ট্রব্যবস্থার অনেকগুলো অমীমাংসিত কিন্তু অনিবার্য প্রশ্ন। শাহবাগের নিশান সেইসব প্রশ্ন উত্থাপন ও উত্তর খোঁজার পথ চিনিয়ে দিচ্ছে। আমাদেরকে এখন সেদিকেই পা বাড়াতে হবে। তাহলেই, সত্যিকারার্থে, বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সমাজের বহুস্বরময় ইতিহাস-কথা পুনর্লিখিত হতে পারবে।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
