গত ক’দিন ধরে এদেশের তরুণ সমাজ যে গণজাগরণ নিয়ে এসেছে তা যে বাংলাদেশের প্রাণের আন্দোলন তাতে বোধ হয় কারো সন্দেহ নেই। যে হতভাগ্যরা এতে সন্দেহ করছে, এতে যোগ দিতে পারেনি তারাও কদিন পরে বুঝতে পারবে যে, এই জাগরণকে অস্বীকার করার অর্থ নিজের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা। এদেশ বাঙালির, আমাদের চেতনা মুক্তিযুদ্ধের এবং একটি অসাম্প্রদায়িক ও আধুনিক রাষ্ট্র গঠন করাই ছিল আমাদের স্বপ্ন যা এতদিনে পূরণ হয়নি, আজ তা বাস্তবায়ন করার সুযোগ এসেছে জাতির সামনে। জাতি তরুণদের ডাকে সাড়া দিয়েছে, গোটা বাংলাদেশ জেগে উঠেছে। এখনই সময় আমাদের সব ভুলের অপনোদন করা, সব গ্লানি দূর করে ফেলা, এদেশের মূল সত্তার বিরোধীদের এদেশ থেকে চিরবিদায় করে দেয়া।
শাহবাগের মোড়ে গত পাঁচ তারিখ থেকে কিছু তরুণের হাত ধরে কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবি নিয়ে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল তা আজ বাংলাদেশের সবার দাবি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। বাংলাদেশের সব এলাকায় জেগে উঠেছে মানুষ। কোন রাজনৈতিক দল এতে নেতৃত্ব দেয়নি, কোন বড় সুযোগ নেয়া বা লোভের জন্য এ আন্দোলন নয়, কোন কোটারি স্বার্থও এখানে নেই। বরং দেশের এক সত্যিকারের দুর্যোগের মুহূর্তে তরুণ প্রজন্ম এগিয়ে এসেছে দেশকে সত্যিকার অর্থে মুক্তি দিতে। একাত্তরের পরাজিত শক্তি, যুদ্ধাপরাধীদের সহযোগিরা বিচার কাজ বাধাগ্রস্ত করতে যেভাবে দেশে তাণ্ডব চালানো শুরু করেছিল তাতে জনমনে কিছুটা সংশয় দেখা দিয়েছেল। মনে হয়েছিল বিচারকার্য বুঝি বাধাগ্রস্ত হবে। সরকারও খানিকটা বিচলিত হয়ে পড়েছিল। আর ঠিক সেই সময় কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় না হয়ে হলো যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। সাধারণ মানুষ এই রায় মানতে পারেনি। বিচার ব্যবস্থার প্রতি কেউ কটুক্তি করেনি, তারা শুধু বিস্ময় প্রকাশ করেছে, নিজেদের দাবির কথা বলেছে। যেখানে পাঁচটি মামলা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত সেখানে কেন কাদের মোল্লা, যাকে সবাই মিরপুরের কসাই নামে জানে তার ফাঁসি হলো না।
এরপর যা হলো তাকে ইতিহাস বলতে হবে। গত ক’দিন ধরে যা হচ্ছে এদেশে তা বাঙালিকে নতুন করে চিনিয়ে দিচ্ছে। জামায়াত বলেছিল, তারা দেশে গৃহযুদ্ধ বাধিয়ে দেবে, গণঅভ্যুত্থান ঘটাবে। আর সহ্য করতে পারেনি যুবসমাজ। যুদ্ধাপরাধীদের এই দম্ভোক্তি সহ্য করতে পারেনি ওরা। তারা নেমে এলো শাহবাগে। দীপ্ত শ্লোগানে ফাঁসির দাবি নিয়ে। সেই আন্দোলন এখন নানা মাত্রায় বিকশিত, সারা বাংলাদেশ এখন শাহবাগ, সবার আত্মায় যোগ হয়েছে শাহবাগের উত্তাপ। শ্লোগান, গান, নাটক, মোমবাতি প্রোজ্জ্বলন, শপথ নীরবতা ইত্যাদিতে নানাভাবে তারা মাতিয়ে রেখেছে যেন গোটা বাংলাদেশকে।বাঙালি বঙ্গবন্ধুর ডাকে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিল। পাকিস্তানী সমারিক জান্তা নত হয়েছিল এই বাঙালির কাছে। বাংলাদেশের মানুষ সামরিক জান্তা এরশাদকে ক্ষমতা থেকে নামিয়েছিল নব্ব্ইয়ে। তারপর এই জাগরণ। এটা আমাদের সর্ব্বোচ্চ সংহত রূপ। জাতি হিসেবে আমরা যে হারতে পারি না তা এখন প্রমাণিত। সারাদেশে শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই চিত্কার করে বলছে রাজাকারের ফাঁসি চাই, রাজাকারমুক্ত বাংলাদেশ চাই। আবার জয় বাংলা শ্লোগান দিয়ে তারা মুক্তিযুদ্ধের মতো ঝাপিয়ে পড়তে প্রস্তুত। ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী ও অন্যান্য যায়গায় প্রজন্ম মঞ্চে লক্ষ লক্ষ মানুষ একক সত্তা নিয়ে সামিল হয়েছে। জনগণের এই গণদাবিকে অগ্রাহ্য করার শক্তি কারো নেই।
একটু দেরীতে হলেও সুখবর যে বিএনপি অবশেষে এই আন্দোলনের সাথে সংহতি প্রকাশ করেছে। তারা এর আগে পর্যবেক্ষণ করছিল। তারা কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত এখনো। সেজন্য বলেছে এটাতে কোন একটি রাজনৈতিক দলের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। তবে বিএনপি বলেছে, তারা ক্ষমতায় গেলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করবে। এটা তারা বলতে বাধ্য হয়েছে বলা যায়। তারা বুঝতে পেরেছে গোটা জাতি যেখানে এক হয়ে গেছে একটি ইস্যুতে সেখানে তারা এর বিরোধীতা করলে তাদের অস্তিত্বের সংকট দেখা দিতে পারে। তবু পঁচাত্তর পরবতী সময়ে এই দলটি যেভাবে রাজাকারদের বিচার বন্ধ করেছে, তাদেরকে নিজেদের দলে নিয়েছে, মন্ত্রী বানিয়ে জাতীয় পতাকার অপমান করেছে সেই পাাপ যদি কিছুটা স্খলন করতে পারে সেটাও দেশের জন্য ভালো।
এখন গোটা জাতি একই মন্ত্রে উজ্জীবিত। সত্যিকার অর্থে ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক, আধুনিক জাতিরাষ্ট্র গড়ার সময় আমাদের দ্বারপ্রান্তে। এখানে কেউ যেন মুখ বিকৃত করে বলতে না পারে এদেশে কোন মুক্তিযুদ্ধ হয়নি। ওটা ছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রের অন্তঃকলহ। এদেশে কোন স্বাধীনতা বিরোধী যেন আমাদের গৌরবময় ইতিহাস নিয়ে তাচ্ছিল্য করতে না পারে। এখনই সেই সময় আমাদের মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা । বাঙালি জাতির সাংস্কৃতিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে সত্যিকারের সংহত দেশ গড়ার এখনই সময়।আমরা পিছু হটতে চাই না। স্বাধীনতা বিরোধী সব অপশক্তিকে রূখে দেবার এখনই সময়। সংসদে বিল আসতে পারে, গণভোট হতে পারে; জামায়াতকে নিষিদ্ধ করে আমরা নতুনভাবে জেগে উঠতে চাই। আশা করি সবার দাবীকে বিএনপিও সমর্থন দেবে।আমরা আশা করি গণজাগরণ মঞ্চের সব দাবি মেনে নিয়ে স্বপ্নের গৌরবের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ গড়ার জন্য সবাই কাজ করবে এক যোগে।
লেখক :সহযোগী অধ্যাপক, ফোকলোর বিভাগ,
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
