বহুল আলোচিত হাতিরঝিল-বেগুনবাড়ি প্রকল্প উদ্বোধন করা হইয়াছে গত ২ জানুয়ারি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইহার উদ্বোধন করেন। প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার ব্যয়বহুল এই প্রকল্পটি একদিকে যেমন কংক্রীটের অরণ্যে বন্দি ওষ্ঠাগত প্রাণ রাজধানীবাসীর মনে ব্যাপক সাড়া জাগাইয়াছে, অন্যদিকে তেমনি কিছু আশঙ্কারও সৃষ্টি করিয়াছে। আশঙ্কার মূলে রহিয়াছে নাজুক সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। প্রকল্পটি উদ্বোধনের পরপরই অনেকে এই ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মনোযোগও আকর্ষণ করিয়াছিলেন। সেই আশঙ্কা যে অমূলক ছিল না মাত্র দেড়মাসের ব্যবধানে অকালে দুইজন তরুণ-তরুণীর মর্মান্তিক মৃত্যুর মধ্য দিয়া তাহা প্রমাণিতও হইয়াছে। ইত্তেফাকে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার রাত্রে প্রকল্পের একটি সেতুর রেলিংয়ের সাথে ধাক্কা লাগিয়া মোটরসাইকেল আরোহী এই তরুণ-তরুণী মারাত্মকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হন। হাসপাতালে আনার পরপরই মাত্র ২৫ বত্সর বয়সী বিবিএর ছাত্র শরিফ মাসিউল্লাহ এবং ১৯ বত্সর বয়সী কলেজছাত্রী তানজিনা আনোয়ার সজনীর মৃত্যু হয়। আমাদের দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু একটি নৈমিত্তিক বিষয় হইয়া দাঁড়াইয়াছে। আর ইহার জন্য চালকদের অসাবধানতাও যে কোনো অংশে কম দায়ী নহে, তাহাও বলার অপেক্ষা রাখে না। তবু কর্তৃপক্ষের গাফিলতিজনিত যেকোনো মৃত্যু মানিয়া লইতে কষ্ট হয়। সেইদিক হইতে ইহা নিছক দুর্ঘটনামাত্র নহে, ভবিষ্যতের জন্য একটি সতর্কবার্তাও বটে।
ইহা অনস্বীকার্য যে, হাতিরঝিল-বেগুনবাড়ি প্রকল্পটি সকল অর্থেই তাত্পর্যপূর্ণ এবং ইহার উপযোগিতাও ব্যাপক ও বহুমাত্রিক। তিন শতাধিক একর জায়গা জুড়িয়া গড়িয়া ওঠা এই প্রকল্পে রাজধানীর পূর্ব-পশ্চিমের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ সৃষ্টিকারী ৯ কিলোমিটার সড়ক ছাড়াও রহিয়াছে ৯ কিলোমিটার ফুটপাত। প্রাতঃ ও সান্ধ্যকালীন ভ্রমণকারীদের জন্য লেকপার্শ্বস্থ ১০ কিলোমিটার হাঁটাপথ প্রকল্পটিকে আরও আকর্ষণীয় করিয়া তুলিয়াছে। সর্বোপরি, ক্রমপ্রসারমান ঢাকা মহানগরীর সুদূরপ্রসারী পরিবেশগত ভারসাম্যের বিবেচনা ও বন্যার পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনার বিষয় তো আছেই। এককথায়, রাজধানীবাসীর যাতায়াতের দুর্ভোগ লাঘবের পাশাপাশি তাহাদের নান্দনিক তৃষ্ণা নিবারণের উদ্যোগ-আয়োজনেরও খুব একটা অভাব নাই এই প্রকল্পে। কিন্তু এই মহাযজ্ঞে যেই বিষয়টি মারাত্মকভাবে উপেক্ষিত হইয়াছে তাহা হইল সড়ক নিরাপত্তা। অভিযোগ আছে যে, এই পথে চলাচলকারী যানবাহনের নিরাপত্তার জন্য যথাযথভাবে সতর্কতামূলক চিহ্ন বা সাইন ব্যবহার করা হয় নাই। দৃষ্টিগ্রাহ্যভাবে চিহ্নিত করা হয় নাই সড়কের বিপজ্জনক বাঁক ও সেতুসমূহ। কেন হয় নাই তাহা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষই ভালো বলিতে পারিবেন। জননিরাপত্তার সাথে সম্পর্কিত অত্যাবশ্যক এই কাজটি সম্পাদনের জন্যও প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করিতে হইবে কিনা আমরা জানি না।
‘ভয়ঙ্কর সুন্দর’ বলিয়া একটি কথা সাহিত্যিক মহলে প্রচলিত আছে। হাতিরঝিল-বেগুনবাড়ি প্রকল্পের সৌন্দর্য ও বহুমাত্রিক উপযোগিতা প্রশ্নাতীত। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা কিংবা গাফিলতির কারণে সেই সৌন্দর্য যাহাতে ভয়ঙ্কর রূপ পরিগ্রহ না করে এবং রাজধানীবাসীর মৃত্যুফাঁদে পরিণত না হয়— জরুরিভিত্তিতে তাহা অবশ্যই নিশ্চিত করা দরকার। পাশাপাশি, এই পথে চলাচলকারী যানবাহন, বিশেষ করিয়া মোটরসাইকেল চালকদেরও বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত বলিয়া আমরা মনে করি।
