প্রজন্ম স্কয়ার

গণদাবি বনাম সরকার ও বিরোধীদল

আপডেট : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২০:৫৭
লিবিয়ার গ্রীনস্কয়ার, মিশরের তাহরীর স্কয়ার, বেনগাজির সিটিস্কয়ার, বাহরাইনের পার্লস্কয়ার আরব বসন্তের জোয়ার সারা বিশ্বে আজো আলোড়ন ও উত্সাহ যুগিয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সুদূর দেশ মহাদেশ ছাড়িয়ে বাংলাদেশে আরেক বসন্তের ছোঁয়া লেগেছে শাহবাগের প্রজন্ম স্কয়ার-এ। বাংলাদেশ সরকারের একটি বিরল রায়ের জন্য সারা বাংলাদেশ ফুলে ফেঁপে উঠেছে। নাম হয়েছে প্রজন্ম স্কয়ার। আরব বসন্তের ডাক এসেছিল দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার এ রাজশাসনের পতনের। বাংলাদেশে ডাক এসেছে যুদ্ধাপরাধের বিচারের। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সংঘটিত বিভিন্ন নারকীয় ঘটনার বিচারের দাবিতে সত্যি যেন নতুন প্রজন্মের জন জাগরণ হয়েছে। মানবতা বিরোধী কর্মকাণ্ডের জন্য ১ম ফাঁসির রায় আসে আবুল কালাম আযাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকারের বিরুদ্ধে। সারাদেশের মানুষ তখন আশার আলো দেখেছিল। দীর্ঘ ৪২ বছর পর স্বাধীনতা বিরোধীদের বিচার বাংলার মাটিতে হবে। রাজাকার, আলবদর, আল শামস পালাতে পারবে না বাংলার মাটি থেকে। কিন্তু জামায়াতে ইসলামের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার রায় যাবজ্জীবন করায় বাংলার মানুষ ‘৭১’ এর মত ফুঁসে উঠেছে। আন্দোলন দেখে মনে হচ্ছে এটা আরেক লিবার্টি স্কয়ার। তাদের একটাই দাবি সকল যুদ্ধাপরাধীর রায় হবে ফাঁসি। বাংলার বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলন যখন বেগবান, জামায়াত-শিবিরের তাণ্ডব বিএনপি’র তত্ত্বাবধায়ক ইস্যু তখনই একটি নিরপেক্ষ তথা অরাজনৈতিক আন্দোলনের ডাক আসল যা সরকারকে তার বিচার কার্য নিয়ে আবারো প্রশ্নবিদ্ধ করল। এই আন্দোলনের কর্মী হলো মূলত সামাজিক যোগাযোগের নেটওয়ার্ক তথা ফেসবুক, ব্লগার, নেটওয়ার্ক এক্টিভিস্ট এবং টুইটার। এর পাশাপাশি একাত্মতা ঘোষণা দিয়েছে সামাজিক সংগঠন সাংস্কৃতিক সংগঠনসহ সমস্ত শ্রেণির পেশাজীবী অরাজনৈতিক সংগঠন। তাদের একটাই দাবি কাদের মোল্লাসহ সকলের ফাঁসি চাই। আজ বাংলাদেশের রিকশাওয়ালা ঠেলাগাড়ি হতে আরম্ভ করে বিমানচালক পর্যন্ত ফাঁসি চাই, ফাঁসি চাই বলে ধ্বনিত হচ্ছে। নতুন প্রজন্মের ডাক দেখে অত্যন্ত খুশি হয়েছেন আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের বীরসহ তাদের নিপীড়িত পরিবারবর্গ। জনমনে যে দাবি উঠেছে, জন্ম নিয়েছে নতুন প্রজন্ম, প্রজন্ম স্কয়ার তাতে বিরোধী দলের কোন সাধ ইচ্ছা নেই। তারা সরাসরি জামায়াতের সাথে তাল মিলাচ্ছে না। তবে মানসিক পৃষ্ঠপোষক হচ্ছে অন্যতম। আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি তার ভোট ব্যাংক যেন হাতছাড়া না হয় সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি দিচ্ছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ মনে করেন। তবে জনসাধারণের দাবি বিরোধী দলও নাকচ করতে পারে না। তরুণ প্রজন্মের দাবি তাদের মানতে হবে। সামাজিক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দিয়ে তাদের দমন করা যাবে না। প্রজন্ম স্কয়ারের একটি দাবি দলমত নির্বিশেষে ‘৭১’ বিরোধীদের যথাযোগ্য বিচার। কোন আঁতাত নয়, চাই ফাঁসি। নির্বাচনের জালে ফেলে কোন দলকে তাদের পক্ষে অবস্থান নিলে অবশ্যই আজকের এই তরুণ প্রজন্ম নির্বাচনের মাধ্যমেই জবাব দিবে। তরুণ প্রজন্মের আশীর্বাদ নিয়ে, ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে ক্ষমতার মসনদে আহরণ করেছিল আওয়ামী সরকার। প্রধানতম দাবি ছিল যুদ্ধাপরাধীর বিচার কার্যসম্পন্ন। সরকারের পক্ষ হতে নিতে হবে বলিষ্ঠ পদক্ষেপ। যদিও সরকার বলছে তারা বিচার কার্যের জন্য বা রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবে, তা অবশ্যই হতে হবে দ্রুতবিচার ট্রাইবুনালে। রায়ের পর বিচার বিভাগ,সরকার এবং আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানে। ট্রাইব্যুনালের ২১নং ধারা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা হচ্ছে বাদী-বিবাদী ও সুধীমহলে। যদি উক্ত ধারায় কোন সমস্যা বিদ্যমান থাকে তবে আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের নিকট হতে পরামর্শ নিয়ে যথাযথ পদক্ষেপ হবে ক্ষমতাসীন সরকারের জন্য আশীর্বাদ স্বরূপ। আজকের প্রজন্ম আর অপেক্ষা করতে চায় না। দীর্ঘ ৪২ বছর চাপা ক্ষোভ বিদ্যমান ছিল শহীদ ও নির্যাতিত পরিবারের মাঝে তা আবার ফুঁসে উঠেছে। আর কোন চক্রান্ত মেনে নিতে চায় না বাংলার নতুন প্রজন্মের দামাল সন্তানেরা। স্বাধীনতা বিরোধী রাজাকারদের গাড়িতে বাংলাদেশের পতাকা আর দেখতে চায় না আমরা উদীয়মান প্রজন্ম। নিজামী, মুজাহিদ, গোলাম আজম এবং সাঈদীর বিরুদ্ধে গঠিত ট্রাইব্যুনাল দ্রুত সম্পন্ন এবং সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করার আহ্বানে প্রজন্ম স্কয়ারে যে শ্লোগান জানানো হয়েছে তা অবিলম্বে কার্যকর হতে হবে। নির্দলীয়, নিরপেক্ষ এবং অরাজনৈতিক আন্দোলন তথা জনতার দাবি সরকারকে মানতে হবে। কোন আপোষ নয়, কোন আঁতাত নয়, কোন সন্ধি নয় এবং কোন নির্বাচনী জাল নয় উভয় দলকে বিশেষত বিএনপি আওয়ামী লীগ হতে হবে আপোষ হীন। দূর করতে হবে বাংলার মাটি থেকে রাজাকারের ঘাঁটি। মুক্ত হবে বাংলা, বাসযোগ্য হবে নতুন শিশুর আস্তানা। এ আমাদের প্রজন্ম স্কয়ারের দৃপ্ত অঙ্গীকার। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ কবি জসীম উদ্দীন হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। Email; imamhasam [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন