মেয়াদোত্তীর্ণ ঔষধ

আপডেট : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২১:৫২
নিয়ম-নীতি, শৃংখলার বালাই বলিতে কিছুই যেন আর অবশিষ্ট নাই আমাদের এই সমাজে। যে যেইভাবে পরিতেছে সে সেইভাবেই জনসাধারণকে বুদ্ধু বানাইয়া বা প্রতারিত করিয়া দেদারসে পয়সা কামাই করিতেছে। আর এই পয়সা উপার্জনের বিষয়টিই যেইখানে একমাত্র আরাধ্য সেইখানে কোন প্রকার দায়-দায়িত্ববোধ আশা করাটাও তো বাতুলতা। গত শনিবার ও রবিবার পত্রিকান্তরের খবরে প্রকাশ, নকল ও ভেজাল ঔষধে এই দেশের ঔষধের বাজার সয়লাব। মেয়াদোত্তীর্ণ ঔষধের গায়ে আবার নকল লেবেল লাগাইয়া উহার মেয়াদ বৃদ্ধি দেখানোর মাধ্যমে চলিতেছে অভিনব কায়দায় ক্রেতা ঠকানো। আবার চীন হইতে আমদানীকৃত সম্পূরক ঔষধকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রস্তুতকৃত ঔষধ হিসাবে নকল ছাপ মারিয়া বিক্রয় করা হইতেছে। এই ক্ষেত্রে ঐ আমদানিকৃত ঔষধ প্রতারণার মাধ্যমে দশ-বারো গুণ বেশি দামে বিক্রি করিতেছে দোকানদারেরা। মানুষের জীবন রক্ষাকারী ঔষধকে এইরূপে প্রতারকেরা জীবননাশী বস্তুতে পরিণত করিতেছে। খবরে প্রকাশ, মেয়াদোত্তীর্ণ ঔষধ সেবন করিয়া অনেকে নানান মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার শিকার হইতেছে। একদিকে যেমন নকল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ঔষধ ক্রয় করিয়া ক্রেতাদেরকে অর্থ গচ্চা দিতে হইতেছে অন্যদিকে তেমনি তাহারা মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে পড়িতেছে। এই জাতীয় অবৈধ কার্যকলাপের বিরুদ্ধে কোন প্রকার প্রতিকারের ব্যবস্থাই নাই। এইসব দেখিবারও যেন কেহই নাই। ঔষধ প্রস্তুত এবং ঔষধ বিক্রির ব্যাপারে বিশ্বব্যাপী কতিপয় কঠোর নিয়ম-নীতি পালন করা হইয়া থাকে। অথচ, আমাদের দেশে এই ব্যাপারে কাহারও কোন মাথা ব্যথাই নাই। প্রেসক্রিপশন ছাড়া ঔষধ বিক্রি যেইখানে বেশিরভাগ দেশে নিষিদ্ধ সেইখানে আমাদের দেশে ইহা যেন খাদ্যদ্রব্যের মতো সহজলভ্য বিষয় করিয়া তোলা হইয়াছে। ইহার চাইতে চরম দায়িত্বহীনতা আর কি হইতে পারে? সারা দেশে লক্ষ লক্ষ ঔষধের দোকান গজাইয়া উঠিয়াছে কিন্তু ইহাদেরকে লাইসেন্স প্রদানের পর সেই লাইসেন্সের শর্তাবলী তাহারা মানিয়া চলিতেছে কিনা উহা তদারকের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ থাকিলেও এই বিষয়ে কেহই তাহা করেন বলিয়া মনে হয় না। ঔষধ সম্পর্কে জনসচেতনতার অভাবও দুর্বৃত্তদেরকে এমন কাজ করিতে উত্সাহ জোগায় বৈকি! যাহারা ঔষধ বিক্রয় করে তাহাদের কোন প্রকার প্রশিক্ষণ নাই। ফলে কোন ঔষধের কি প্রতিক্রিয়া তাহারা জানে না আবার আসল ঔষধ বিক্রির যে বিবেকী তাগিদ ইহাও তাহারা অনুভবই করে না। ঔষধটি ক্রেতাকে যে কোন প্রকারেই হউক গছাইয়া দেওয়াকেই তাহারা একমাত্র দায়িত্ব বলিয়া জ্ঞান করে। ফলে ভেজাল ও নকল ঔষধ ক্রেতাসাধারণ তাহাদের অজ্ঞাতেই সেবন করিতে বাধ্য হয়। ইহা যে বিক্রেতা বা ঔষধ ব্যবসায়ীদের কত বড় অপরাধমূলক কাজ উহা ভাবাও যায় না। এই দেশের অধিকাংশ মানুষ দরিদ্র। উপরন্তু তাহাদেরকে ঔষধ সম্পর্কে সচেতন করিয়া তুলিবার মতো তেমন কোন ব্যবস্থাও নাই। আর ইহারই সুযোগ গ্রহণ করে এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী ও নকল এবং ভেজাল ঔষধ প্রস্তুতকারী। দারিদ্র্যের এবং অজ্ঞানতার কারণেই ক্রেতাসাধারণ প্রতারিত হইতেছে ইহাতো বলাই বাহুল্য। সস্তায় ঔষধ পাইলে ইহারা বর্তাইয়া যায়। ইহা আসল কি নকল অশিক্ষিত এবং দরিদ্র মানুষের পক্ষে তাহা নির্ণয় করাও অসম্ভব। ভেজাল ঔষধে এমন সব উপকরণ ব্যবহার করা হইয়া থাকে যাহা সেবনকারীর রোগ উপশম দূরে থাকুক তাহার মৃত্যু পর্যন্ত ঘটার আশংকা থাকিয়া যায়। আরেকটি কথা এই যে, দেশের ঔষধ শিল্প মালিকেরাও ঔষধের মূল্য ইচ্ছামাফিক বৃদ্ধি করিয়া রোগী সাধারণকে অতিরিক্ত দুর্ভোগের মধ্যে ফেলিয়া দিতেছে। ঔষধ শিল্পে বিদ্যমান এতসব অব্যবস্থা ও সংকট মোকাবিলায় কঠোর নীতি ও উহার বাস্তবায়ন অত্যাবশ্যক। কিন্তু মুশকিল এই যে, সরিষার মধ্যকার ভূত তাড়াইবে কে?

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন