[ রা জ নী তি ]

‘জাগিয়া উঠেছে প্রাণ’

আপডেট : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২১:৫৩
এদেশে বাংলা ফাল্গুন মাস আসে ইংরেজি মাস ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝিতে। শুরু হয় বসন্তকাল। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি তথা ৮ই ফাল্গুনের নব বসন্তের দিনটিতে সংঘটিত ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ ভাষা বিদ্রোহ, ফেব্রুয়ারি মাসটিকে দান করেছে এক অপার মহিমা। বাঙালির জীবনে ফেব্রুয়ারি ও ফাল্গুন জাগিয়েছে বিপ্লব-বিদ্রোহের শিহরণ। রক্তের কণিকায় কণিকায় জাগায় উচ্ছল যৌবন তরঙ্গ। প্রকৃতি, দেহের সর্বাঙ্গ, সমাজ, রাজনীতি—সবকিছু জাগরিত হয় বসন্তের পরশে। দেশের রাজনীতি ও সমাজের দৃশ্যপটে এ বছরের বসন্তের আগমন ঘটেছে পঞ্জিকার পাতায় অংক কষা হিসেবের দিনের কিছু আগেই। গণজাগরণের এক পাগল করা ঘূর্ণির দমক বাতাসকে ভর করে নতুন এ বসন্তের আগমন ঘটেছে এবার। ফাল্গুন মাস শুরুর আগেই ‘ফাগুন হাওয়ায়’ উত্তাল হয়ে উঠেছে যৌবনের বিদ্রোহী নিশান। ‘জনতা সাগরে এবার জেগেছে ঊর্মি তাল মাতাল’। এবারও ঊর্মিমালার অগ্রভাগে রয়েছে নব প্রজন্মের তরুণ সমাজ। ঢাকার চিরচেনা ‘শাহবাগের মোড়’কে এখন আর চেনার উপায় নেই। গত ৫ ফেব্রুয়ারি থেকে তা অভূতপূর্ব ও চরম নাটকীয় এক রূপান্তর লাভ করেছে গণজাগরণ চত্বর বা প্রজন্ম চত্বর নামে। চত্বরটি রূপান্তরিত হয়েছে জনসমুদ্রে। দিনের পর দিন এবং একটানা রাত-দিন ২৪ ঘণ্টা বিরামহীনভাবে লাখো জনতা এই চত্বরে আসছে, যাচ্ছে, অবস্থান করছে। বিরতিহীনভাবে চলছে আকাশ কাঁপানো শ্লোগান, মুষ্টিবদ্ধ হাতের ওঠানামা, বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে সমবেত কণ্ঠে সংগ্রামের গান। দল বেঁধে বা বিচ্ছিন্নভাবে ছুটে আসছে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা, আসছে কারখানার শ্রমিকরা, শিশুকে কোলে নিয়ে আসছে গৃহবধূরা, আসছে সর্বশ্রেণী ও স্তরের তরুণ-যুবকরা, আসছে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা, আসছে সমাজের সব স্তরের আবালবৃদ্ধবনিতা। গত ৫ ফেব্রুয়ারি থেকে একটানা চলছে এই দৃশ্য। প্রায় ২ সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও এক মুহূর্তের জন্য গণজাগরণ চত্বরের দখল ছাড়েনি জাগ্রত জনতা। ‘শাহবাগ ঘুমায় না’— এটিও এখন আন্দোলনের একটি স্লোগান হয়ে উঠেছে। এ ধরনের গণজাগরণ চত্বর বা মঞ্চ ইতোমধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে ঢাকাসহ দেশের পাড়ায়-মহল্লায়, জেলায়-জেলায়, উপজেলাগুলোতে এবং এমনকি আরো দূরের গ্রামীণ লোকালয়ে। গোটা বাংলাদেশ এখন জেগে উঠেছে নতুন রূপের উত্তাল সংগ্রামের গণজোয়ারে। ৫ ফেব্রুয়ারি একাত্তরের চিহ্নিত ঘাতক মীরপুরের কসাই কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে উত্থাপিত ৬টি অভিযোগের মধ্যে ৫টি গুরুতর অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও এসবের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বদলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছিল। কাদের মোল্লার বিচারের এহেন রায়ে বিস্মিত, আশাহত ও ক্রোধান্বিত হয়েছিল দেশের মানুষ। ছাত্র ইউনিয়নসহ কয়েকটি ছাত্র সংগঠন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দুপুরেই তত্ক্ষণাত্ প্রতিবাদ মিছিল সংগঠিত করে এবং বিকেলে মশাল মিছিল অনুষ্ঠানের ঘোষণা দিয়েছিল। আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে যে সব আনন্দ মিছিল করার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল, সেগুলো দ্রুতই প্রতিবাদ মিছিলের রূপ পরিগ্রহ করেছিল। এদিকে নতুন ও পুরানো কয়েকটি ব্লগার গ্রুপ ইন্টারনেটের মাধ্যমে শাহবাগের সামনে একত্রিত হওয়ার আহ্বান ছড়িয়ে দেয়। বিকেল নাগাদ শ’খানেক ব্লগার একত্রিত হয়ে শাহবাগ চত্বরে গোল হয়ে বসে পড়ে প্রতিবাদ শুরু করে দেয়। ক্রমেই আরো অন্যান্য মানুষের জটলা বাড়তে থাকে। এ সময় ছাত্র ইউনিয়নের বিশাল মশাল মিছিল চত্বরে এসে বসে পড়ে। সাথে সাথে চলে আসে হারমোনিয়াম, ঢোল, তবলা, গিটার। শুরু হয়ে যায় বাদ্যের তালে তালে একটানা স্লোগান ও সংগ্রামের গান। ছাত্রলীগসহ অন্যান্য ছাত্র ও যুব সংগঠনগুলোও অল্প সময়ের মধ্যে মিছিল করে এসে চত্বরে জায়গা করে নেয়। চারদিকের গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। কিছু সংহতি বক্তৃতাও থাকে। রাজপথে টানা অবস্থান চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে কেউ কেউ বক্তৃতা করেন। তাত্ক্ষণিক সিদ্ধান্ত হয়ে যায় যে, রাতভর সবাই চত্বরে অবস্থান করবে। একথাও স্থির হয় যে, এই সমাবেশের কার্যক্রম চলবে সবরকম দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে থেকে। মিডিয়ার মাধ্যমে এই প্রতিবাদ আন্দোলনের খবর ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। মানুষের সমাগম বাড়তে থাকে। পরদিন তা উথলে পড়তে শুরু করে। সাধারণ মানুষ বিশেষত তরুণ সমাজ বিস্ময়কর সংখ্যায় এবং প্রবল উদ্দীপনায় আন্দোলনের এই অভিনব কর্মসূচিতে শামিল হতে শুরু করে। যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে তরুণ সমাজসহ দেশবাসীর ক্রোধ যে কতো তীব্র তা উন্মোচিত হয়ে পড়ে। রাজাকারের ফাঁসি ও জামাত-শিবির নিষিদ্ধ করার দাবিকে কেন্দ্র করে নতুন পুরনো শ্লোগানে জনজাগরণ চত্বর মুখরিত হয়ে ওঠে। ছাত্র ইউনিয়ন নেত্রী লাকী আক্তারসহ অনেকের মাধ্যমে শ্লোগান দেয়াটা একটি শিল্পকলার রূপ অর্জন করে। অন্যান্য শ্লোগানের পাশাপাশি অন্যতম প্রধান শ্লোগান হিসেবে উঠে আসে ‘একাত্তরের চেতনা, হারিয়ে যেতে দেব না’ শ্লোগানটি। নবীন প্রজন্মের অন্তর থেকে এই শ্লোগান উচ্চারিত হয়। সারাদেশের চিত্রও ছিল একই রকম। এসবের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়ে যায় যে, মুক্তিযুদ্ধ অতীতের বিষয়, অতীতের এসব বিষয় নিয়ে নবীন প্রজন্ম মোটেও চিন্তাভাবনা করে না। কারণ, তারা ভবিষ্যত্মুখী কিংবা মুক্তিযুদ্ধের ইস্যু সামনে আনার মাধ্যমে জাতিকে বিভক্ত করা হয়—এসব হলো সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যমূলক মিথ্যা প্রচারণা। নতুন প্রজন্মসহ প্রজন্মের পর প্রজন্ম যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিকে ও মুক্তিযুদ্ধকে তাদের মনের মণিকোঠায় স্থান দিয়ে চলেছে। একথা প্রমাণিত হয়েছে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে পরিচালিত আন্দোলনের সময়, প্রমাণিত হয়েছে বিগত জাতীয় নির্বাচনের সময়, প্রমাণ হলো আবার এই নবীন বসন্তের অপ্রতিরোধ্য গণজাগরণকালে। গণজাগরণ চত্বরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এবারের অনন্য আন্দোলনের জোয়ার যেমন একদিকে ‘তারুণ্যের জাগরণ’, তেমনি তা হলো ‘মুক্তিযুদ্ধের নবজাগরণ’। নতুন প্রজন্মের মাঝে মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণার যে অভিব্যক্তি ঘটেছে, সেটিই হলো সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অর্জন। এর ঐতিহাসিক তাত্পর্য অপার। সেই সাথে এই আন্দোলন যুদ্ধাপরাধীদের সঠিক বিচার নিশ্চিত করতে এবং তার পথে জামাত যে অন্তরায় সৃষ্টি করে চলেছিল তাকেও পর্যুদস্ত করেছে। জামাত-শিবির কয়েক মাস ধরে সহিংস তাণ্ডব চালিয়ে দেশের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করে তুলতে সচেষ্ট হয়েছিল। তারা মিলিটারি কায়দায় রাজপথে একের পর এক নৈরাজ্যমূলক সহিংস অপারেশন পরিচালনা করে চলছিল। পুলিশের রাইফেল ছিনিয়ে নেয়া শুরু করেছিল। মন্ত্রীর গাড়ি বহর, বিজিবির যানবাহন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে আক্রমণ করা শুরু করেছিল। তারা কার্যতঃ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এক ধরনের অঘোষিত গৃহযুদ্ধ পরিচালনা করছিল। দেশবাসী বিশেষতঃ তরুণ সমাজ জামাত-শিবিরসহ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচালের জন্য পরিচালিত বিভিন্ন ষড়যন্ত্র ও তত্পরতায় প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছিল। সেই সঞ্চিত ক্ষোভ বিস্ফোরণের রূপ নিয়ে ফেটে পড়েছিল কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় না হওয়ার কারণে। কিন্তু এই ক্ষোভের উপাদান ছাড়াও তাদের এভাবে মরিয়া হয়ে বাঁধভাঙ্গা শক্তিতে রাজপথে নেমে সক্রিয় হওয়ার পেছনে ছিল অন্য একটি উপলব্ধির উপাদান। তা হলো, এই সরকার যে তার নিজস্ব তাগিদে ঠিকমতো যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কাজ সম্পন্ন করতে পারবে, সে বিষয়ে সন্দেহ ও অবিশ্বাস। ট্রাইব্যুনাল গঠনে বিলম্ব, ট্রাইব্যুনাল বসার স্থান নির্ধারণ নিয়ে টাল-বাহানা, তদন্ত কাজ ও মামলা পরিচালনা কাজের ক্ষেত্রে নানা ক্রটি-ঘাটতির খবর, বিভিন্ন মন্ত্রীসহ সরকার দলীয় কর্তাব্যক্তিদের বেহিসাবি কথাবার্তার মধ্য দিয়ে প্রকাশ হয়ে পড়া সমন্বয়হীনতা ইত্যাদি এই অবিশ্বাস জন্মাতে সুযোগ করে দেয়। রাজনীতিতে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম-এর বিধান রাখার মাধ্যমে সাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নে আপোস, বিএনপিকে প্রধান শত্রু হিসাবে গণ্য করে সম্ভব হলে জামাতকে হাত করার, বা নিদেনপক্ষে বিএনপির জোট থেকে সরিয়ে আনার আত্মঘাতি ও ভ্রান্ত কৌশলের প্রয়োগ, একতরফা নির্বাচনে জামাতকে শরিক করার জন্য তার প্রতি প্রলোভনমূলক কৌশল প্রয়োগ ইত্যাদি ঘটনা মানুষের মনে আগে থেকেই নানা প্রশ্ন ও সন্দেহের উদ্রেক ঘটাচ্ছিল। ১৬ জানুয়ারি জ্বালানি তেলের দাম কমানোর দাবিতে বামপন্থিদের হরতালে পুলিশের মারমুখী আচরণের বিপরীতে জামাতের সহিংস তাণ্ডবের প্রতি সরকারের আচরণ নমনীয় বলে প্রতীয়মান হওয়াতে মানুষের মনে প্রশ্ন দানা বাঁধতে থাকে। কাদের মোল্লার বিচারের রায়ের আগের দিন জামাতকে মতিঝিল শাপলা চত্বরে সভা করার অনুমতি প্রদান এবং সেই সভা থেকে জামাত কর্তৃক রায়ের দিন হরতাল আহ্বান ও রায় মনপুতঃ না হলে লাগাতার হরতালের ও গৃহযুদ্ধের হুমকি দেয়ার সুযোগ দেয়ায় মানুষ প্রশ্ন করেছে যে, সরকার এসব কি করছে? জামাতের কার্যকলাপে প্রচণ্ড ক্ষোভের পাশাপাশি, জামাতকে মোকাবেলা করে যুদ্ধাপরাধীদের সঠিক বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকারের আন্তরিকতা বা সামর্থ্য নিয়ে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে স?েন্দহ ও অবিশ্বাস জন্ম নেয়। তারা এরূপ সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, সরকারের ওপর নির্ভর করে ঘরে বসে থাকলে যুদ্ধাপরাধীদের জন্য ন্যায়ানুগ দণ্ড নিশ্চিত হবে না। যুদ্ধাপরাধীদের প্রাপ্য মৃত্যুণ্ড নিশ্চিত করতে হলে তাদের নিজেদেরকে তাই এবার পথে নামতে হবে। গণজাগরণ মঞ্চের খবর জানার সাথে সাথে সেখানে সক্রিয় হওয়ার পথ খুঁজে পেয়ে তারা সেখানে ছুটে এসেছে। মৃত্যুদণ্ডের বদলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডকে তারা গ্রহণযোগ্য মনে করেনি আরো একটি কারণে। তা হলো তাদের মনের এরূপ একটি শংকা যে, বিএনপি ক্ষমতায় আসতে পারলে রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদর্শনের ক্ষমতা প্রয়োগ করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগকারী যুদ্ধাপরাধীকে হয়তো মুক্তি দিয়ে দিতে পারেন। তাই, যুদ্ধাপরাধীদের প্রতি ঘৃণার পাশাপাশি সেসব ঘৃণ্য শত্রুদেরকে উপযুক্ত দণ্ড প্রদানে সরকারের সামর্থ্যের বিষয়ে অনাস্থা এবং সেই সাথে বিএনপি কর্তৃক যুদ্ধাপরাধী ও জামাতকে আশ্রয়দানের ঘটনা দেশবাসী বিশেষতঃ তরুণ প্রজন্মকে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার স্বার্থে নিজেরাই নেমে পড়ার জন্য প্রবল তাগিদ জুগিয়েছে। গণজাগরণ চত্বরকে ঘিরে যে ইতিহাসের উপাখ্যান রচনার কাজ চলছে, সবক্ষেত্রে তার স্থায়ী ও গভীর অভিঘাত সৃষ্টি হওয়াটা অবশ্যম্ভাবী। এ কথাটি না বুঝতে পারলে ইতিহাসের অগ্রগতির ধারায় পিছিয়ে পড়তে হবে। আর এর বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর অর্থ হবে, এক সময় না এক সময় ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হওয়া। বিএনপিকে এখনই ঠিক করতে হবে, ইতিহাসের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সে যুদ্ধাপরাধী ও জামাত-শিবিরের পক্ষ নিবে, নাকি এখনো সময় থাকতে ভুল পথ পরিত্যাগ করে জনজাগরণ চত্বরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা তারুণ্য ও মুক্তিযুদ্ধের নব উত্থানের সপক্ষে দাঁড়াবে। আওয়ামী লীগকেও ‘কৌশলগত ঐক্য’, ‘নির্বাচনী অংক’ ইত্যাদি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে দোলাচালের পথ ত্যাগ করতে হবে। মানুষের মনে একটি প্রশ্ন হলো, এই আন্দোলন কোথায় যেয়ে শেষ হবে? এ প্রশ্নের দু’রকম জবাব আছে। প্রথমতঃ তার আশু লক্ষ্য সম্পর্কিত। সেক্ষেত্রে একটি তাত্পর্যপূর্ণ অর্জন ঘটে গেছে, সরকার পক্ষকে আসামী পক্ষের মতো আপিল করার সুযোগে সমতা আনয়ন ও আপিল নিষ্পত্তির সময়সীমা বেধে দিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনটি পার্লামেন্টে সংশোধিত হওয়ার মাধ্যমে। এখন আপিল করা, দক্ষতার সাথে যুক্তি-তর্ক উত্থাপন করা, আপিলেট ডিভিশনের রায় ও সেই রায় কার্যকর হওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনে’ প্রদত্ত দণ্ডাদেশ রাষ্ট্রপতির ক্ষমার আওতার বাইরে রাখার দাবিটি নিয়ে এখনো কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। এজন্য সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন হবে। জামাতের অর্থের উত্সগুলো বন্ধ করার জন্য তার নিয়ন্ত্রিত সব ধরনের আর্থিক ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের হাত থেকে নিয়ে নেয়া ও জাতীয়করণ করার লক্ষ্যেও পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। এক্ষেত্রেও সংবিধান সংশোধন করা প্রয়োজন হবে। ১৯৭২ সালের সংবিধানের ৩৮নং অনুচ্ছেদ যেভাবে ছিল, হুবহু সেভাবে তা পুনঃলিখিত হলেই জামাত নিষিদ্ধ হয়ে যাবে। তাছাড়া, নির্বাচন কমিশনে জামাতের নিবন্ধন বাতিলের ব্যবস্থাও নির্বাচন কমিশন এখনো গ্রহণ করেনি। এদিকে, গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ব্লগার রাজীব হায়দারকে কুপিয়ে হত্যা করে তার মৃতদেহকে জবাই করে বর্বরভাবে অপবিত্র ও বিকৃত করা হয়েছে। এই ঘটনায় ক্ষোভের আগুন আরো দাউ দাউ করে জ্বলে উঠেছে। জনজাগরণ চত্বরের কর্মসূচি বিকশিত ও প্রসারিত হচ্ছে। এই প্রসারমান অবস্থায় তাকে অব্যাহত রাখা ও আরো শক্তিশালী করার দিকে মনযোগ দেয়াটাই বড় কাজ। অবশ্য নিরাপত্তা ও আরো কিছু আনুষঙ্গিক লজিস্টিকের বিষয়গুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ। এসবের দিকে নজর না রাখাটা হবে দায়িত্বহীনতা। জনজাগরণ চত্বরের কর্মসূচির পাশাপাশি আরো নানা পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে আন্দোলনকে দেশময় ছড়িয়ে দেয়াটা এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শ্রমিক, কৃষক, মেহনতী মানুষের সচেতন ও সংগঠিত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাটার উপর এই আন্দোলনের শক্তির নতুন স্তরে উল্লম্ফন নির্ভর করছে। এ বিষয়েও নজর দিতে হবে। এক্ষেত্রে কমিউনিস্ট ও বামপন্থিদের দায়িত্ব হলো প্রধান। এই আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতির বিষয়টি হলো দ্বিতীয় প্রসঙ্গ। গণজাগরণ চত্বরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা আন্দোলনের মর্মবাণীর মাঝে রয়েছে সুদূরপ্রসারী ও গভীরতর উপাদান। সেটি হলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-ধারা। এটি সমাজতন্ত্র অভিমুখীন, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী, অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, প্রগতিবাদী। তাই, রাজপথে শোনা সেই শ্লোগানটি প্রতিধ্বনিত করে বলবো- ‘শাহবাগের গতিমুখ, সমাজতন্ত্র অভিমুখ’। আন্দোলনের সেই গভীরতর ভবিষ্যেক উপলব্ধি করা ও এগিয়ে নেয়ার কাজটি নির্ভর করে কমিউনিস্ট ও বামপন্থিদের উপর। তবে সে কাজ তাদেরকে করতে হবে আন্দোলনের বর্তমানকে চ্যাম্পিয়ন করার মধ্য দিয়েই। কারণ, তারাই ‘আন্দোলনের বর্তমানের মধ্যে থেকেই আন্দোলনের ভবিষ্যতের প্রতিনিধি’। লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি E-mail : [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন