মান্যতা, মানবতা ও মহানুভবতা মহা মুশকিলে মুহ্যমান। প্রায় প্রতিদিন পনের থেকে বিশ কি: মি: এই ঢাকা শহরে কর্ম ব্যস্ততায় ছুটছি আঠারো বছর। দু’চোখ খোলা, চোখের সামনে অনেক কিছু ঘটে দেখি। কখনও কখনও ভীষণভাবে ব্যাকুল হয়ে উঠি। কিছু একটা করতে চাই কিন্তু পারি না। শেষটায় মনের কষ্ট বা সুখটা মনের অজান্তেই গানে-কবিতায়-কলামে বেরিয়ে আসে।
আজকের এ লেখাটিও তার ব্যতিক্রম নয়। শেষে আবার মিলে যাই দু/তিন কোটি মানুষের এই মেগাসিটি আজব শহরে আর দশজনের মত ভীষণ স্বার্থপর হয়ে। আমরা ভুলে যাই ঘর আমার, রাস্তা সবার। রাস্তায় ধুলো আছে গাড়ি চালক জানেন, কত শত পথচারী সরু রাস্তা দিয়ে হাঁটছেন, হুট করেই জোরছে টান। সকালের শুরুটা হয় ধুলো খেয়ে আর বাকি দিন রইলো বাকি। আসলে আমরা স্বার্থপর। কিন্তু বুঝি না কেমন স্বার্থপর? তবে বুঝতে শুরু করেছি বোধকরি। মান্যতা পরিবার থেকে শিখতে হয়। বুঝি না সেটি কতজনে শিখে মেনে থাকেন। মান্যতা বলতে সহজে বুঝি যার যে সম্মান তাকে তা দেওয়া। ছাত্ররা শিক্ষক/প্রিন্সিপাল প্রকাশ্যে পেটাবে, পত্রিকায় শিরোনাম হবে এ কেমন মান্যতা? তাও আবার বৃহত্ রাজনৈতিক দলের ব্যানার। শিক্ষকের মর্যাদা নামে একটি কবিতা ছোটবেলায় আমরা পড়েছি, ওরা পড়েছে কিনা জানি না। শিক্ষকও ফায়দা লুটতে দলীয় ভূমিকায়, অবশ্য সবাই না। তাহলে আমরা যাচ্ছি কোথায়? ভিসি স্যারের বাগান ভাংচুর। ক্ষোভে পদত্যাগ, পরে প্রত্যাহার। আমার এক স্যার অফিসিয়ালি ভারতে বেড়াতে গিয়েছিলেন, একটি কমবয়সী বালক বিড়ি খাচ্ছিল রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে, অপর একজন পথচারী তাকে (বালকটিকে) রীতিমত ধমকালেন, বালকটি বিড়ি ফেলে চলে গেল মাথা নিচু করে। স্যার ঐ ভদ্রলোকটিকে জিজ্ঞেস করলেন, মশাই বালকটিকে চেনেন নাকি? উনি জিজ্ঞাসিলেন কেন বলুন তো। স্যার বললেন, না, মানে যেভাবে ধমকালেন ভাবলাম আপনার পরিচিত বোধহয়। উত্তরে মশাই বললেন, দেখুন, এটা ভারতবর্ষ। বালকটিতো আমার সন্তান হতে পারত। আমরা পয়সা দিয়ে পত্রিকা কিনি এই সব ঘৃণ্য ছবি আর কাহিনী পড়ার জন্য। কোমলমতি বাচ্চারা শিখে গেল স্যারকেও ছাত্ররা মারতে পারে। দিন শেষে রাতের প্রথম প্রহর পেরিয়ে বাসায় ফিরে খবর দেখার ইচ্ছা অনেকের। কিন্তু বর্তমানে তাও দেখার উপায় নেই। কেননা বীভত্সতায় রাতের ঘুমকে নষ্ট করতে পারে। গাড়ি ভাংচুর বাদাম খাওয়ার মত। গাড়ি সাধারণ মানুষের-যারা রাজনীতি বোঝে না, করে না, সেগুলো যেন চুলোর লাকড়ি। জটলা বাঁধলেই গাড়িতে আগুন। পুলিশের অস্ত্র কেড়ে পুলিশকে নির্মম প্রহার, আবার মিছিলের পলায়নরত মানুষের ভিড়ে পাখি শিকারের মত পুলিশের পিস্তলের গুলি—এইসব শিরোনামের কোনটিই কাম্য নয়। বিশ্বজিতের চাপাতির কোপের দৃশ্যতো অনেকর ঘুমে দু:স্বপ্ন হয়েছে। আমার ক্লাস টুতে পড়া ছোট মেয়ে আগে আমার পাশে বসত কোলে এসে একটু বাবার সান্নিধ্যের জন্য। বিশ্বজিতের ঘটনা দেখার পর হতে ও আর খবরের সময় আসে না।
আমরা কোথায় যাচ্ছি? আশার কথা, তরুণরা জেগেছে, অনাগত ভবিষ্যত্ ওদের। মানবতা, মান্যতা কমবেশি প্রতিদিনই পদদলিত। মহানুভবতা অনেক উঁচু বিষয়, সেখানে আপাতত যেতে চাই না। প্রতিদিন পথে চলতে রাস্তা বন্দ করা অবস্থায় প্রধানমন্ত্রীকে পাশ দিয়ে দ্রুত গতিতে যেমন যেতে দেখি, মঝেমধ্যে তেমনি দেখি রাস্তার পাশে ফুটপাতে শুয়ে অথবা বসে থাকা নিরন্ন ছোট বাচ্চা, অসুস্থ মা, নেশাগ্রস্ত কিশোর, যুবক, বৃদ্ধ পিতা বা নানা দাদা-দাদি নানি বয়সী অসহায়, বেদনার্ত অবয়ব। ভীষণ ব্যতিত হই, পাঁচ দশ টাকা দান করি সাধ্যমত, কিন্তু বিবেককে থামাতে পারি না। মাঝেমধ্যে এমন এমন ঘটনা দেখি, ভাবি, না দেখলে ভালো হত। এ জন্য কি আমাদের স্বাধীনতা? জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানরা কি এজন্য প্রাণ দিয়েছিলেন? বেকার ভাতা, বয়স্ক ভাতা স্বপ্নের মত। মেধা যাচাই করার সুযোগ নেই, তদবির অথবা গোপন পথে বাহিরে ফিটফাট সব ঠিকঠাক, ভিতরে ক্যানসার। আজকের এই তরুণ কোটি কোটি যুবসমাজ, ওরা যাবে কোথায়? ওদেরও তো স্বপ্ন আছে কিছু করার। যদি দলীয়করণ না হয় অন্তত প্রজন্ম চত্বর শাহবাগের মোড়ে ওরা এক হতে পেরেছে এটাই বড় পাওয়া। প্রয়োজনে এই দ্রোহ ঘুরে ঘুরে আসবে। জানি না সেদিন পৃষ্ঠপোষকতা পাবে কিনা, তবে জনতা থাকবে। দেশ আছে, আইন আছে, বিচার আছে, তবুও অবিশ্বাস! যারা রাজনীতিবিদ তাদের জন্য এর চেয়ে বড় পরাজয় আর কি হতে পারে।
লেখক :তরুণ কবি
[email protected]
