ওবামার বক্তব্য ও সরকারের দায়িত্ব

আপডেট : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২০:৩৯
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলিয়াছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নিম্ন ও মধ্যবিত্তের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি প্রয়োজন। গত শনিবার শিকাগোর বাড়িতে এক সাক্ষাত্কার প্রদানকালে ওবামা একথা বলেন। ওবামার এই উক্তির মধ্যদিয়া একটি সরকারের কাজ বা দায়িত্ব কি হওয়া উচিত উহাই স্পষ্ট হইয়া উঠিয়াছে। জনগণের জীবনের মান উন্নত করার জন্যই সরকারের সর্বাত্মক প্রয়াস-প্রচেষ্টা চালানো উচিত ইহাই একটি গণতান্ত্রিক সরকারের কথা। যুক্তরাষ্ট্রে অর্থনৈতিক মন্দাজনিত কারণে বিগত কয়েক বত্সর যাবত্ জনগণের জীবনের মান হ্রাস পাইতেছে। আর এ কারণেই আবার মানুষের জীবনে নানামুখী সংকটও দেখা দিতেছে। কিন্তু বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সম্পদশালী দেশ যুক্তরাষ্ট্রে এই অবস্থা যাহাতে দীর্ঘদিন না চলে সেজন্য সরকারের দায়িত্ব অনেক। সেই দায়িত্ব পরিপূর্ণভাবে পালনের মধ্যেই সরকারের সাফল্য ও সার্থকতা নিহিত। কিন্তু তৃতীয় বিশ্বে আমরা সরকারগুলির মধ্যে এতদ্বিষয়ক দায়িত্বশীলতার পরিচয় খুব কমই দেখিতে পাই। তৃতীয় বিশ্বে সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা বজায় রাখিয়া স্বার্থান্বেষী মহলকেই পূর্ণ কর্তৃত্ব করিতে দেখা যায়। ফলে দেশের মানুষের জীবনমানের উন্নতির পরিবর্তে গুটিকয় মানুষ আঙ্গুল ফুলিয়া কলাগাছ বনিয়া যায়। সরকারের দায়িত্ব শুধু ব্যবস্থাপনা, সমাজে শৃংখলা বজায় রাখার মাধ্যমে একটি চেইন অব কমান্ড প্রতিষ্ঠিত করা, সেখানে তৃতীয় বিশ্বে দুর্ভাগ্যজনকভাবে নৈরাজ্যবাদী চিন্তা-চেতনার ও অবস্থা সৃষ্টির পাঁয়তারা লক্ষণীয় হইয়া ওঠে। যাহারা দেশ শাসন করেন তাহাদের মধ্যে জনকল্যাণমুখী চিন্তা-চেতনার অভাব ঘটিলে রাষ্ট্রে শৃংখলা ও ন্যায় বিচার যেমন বিপন্ন হয় তেমনি সব ক্ষেত্রেই অনিশ্চয়তা দেখা দেয় বৈকি। তাই তৃতীয় বিশ্বে অর্থনৈতিক উন্নতি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হুমড়ি খাইয়া পড়ে। জনগণের জীবনের মান বৃদ্ধিকল্পে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অপচয় ও দুর্নীতি রোধ, অবকাঠামোগত উন্নতিসাধন, ব্যবস্থাপনা-দক্ষতা, সুপরিকল্পনা প্রণয়ন ইত্যাদি অত্যন্ত জরুরি। আর এইগুলির নিশ্চয়তা দিতে হইলে নেতৃত্বের দূরদর্শিতা, সাহস, জনকল্যাণের প্রতি অঙ্গীকার এইসবকে প্রাধান্য দিতে হয়। উন্নত বিশ্বে দীর্ঘদিন যাবত্ গণতন্ত্র চর্চার ফলে সেখানে মানুষের মনে পরমতসহিষ্ণুতা এবং নিয়ম-শৃংখলা মানিয়া চলার ব্যাপারে তাহাদের বিবেকী তাগিদ সৃষ্টি হইয়াছে। ফলে নিয়ম-নীতির অনুশীলনের মধ্যদিয়া সকলেই নিয়মানুবর্তী ও শৃংখলাপরায়ণ হইয়া উঠিয়াছে। কিন্তু তৃতীয় বিশ্বে এক ধরনের কর্তৃত্ববাদী নীতি-কৌশল গ্রহণের ফলে এবং দলবাজিসহ নানান সংকীর্ণ চিন্তা-চেতনা ও কর্মকাণ্ডে আচ্ছন্ন হইয়া পড়ার কারণে সরকার তাহার আসল কর্তব্যকর্ম ভুলিয়া অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অল্প কিছু লোকের স্বার্থের পৃষ্ঠপোষক হইয়া দাঁড়ায়। উপরন্তু তৃতীয় বিশ্বে সম্পদ সীমিত থাকায় একশ্রেণীর মোসাহেব বা তাঁবেদার সরকারকে ভাঙ্গাইয়া স্বার্থ সিদ্ধির সুযোগ করিয়া লয়। তাহাছাড়া, জনগণের জীবনের মান উন্নয়নের জন্য যে ধরনের মমত্ববোধ ও স্বার্থত্যাগের মানসিকতার প্রয়োজন হয় উহার পরিবর্তে একেবারেই সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি লইয়া দেশ শাসন করিতে গিয়া সকলের জন্য নানান বিপত্তি ডাকিয়া আনে। জনগণের সার্বিক কল্যাণ সাধনই যেখানে সরকারের কর্তব্য সেখানে প্রশাসনকে জনগণের স্বার্থে কাজে লাগাইবার মতো দক্ষতা ও যোগ্যতা অপরিহার্য। তৃতীয় বিশ্বে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে অনেক ক্ষেত্রেই আমলানির্ভর হইয়া পড়িতে দেখা যায় দেশবাসীর প্রতি তাহাদের অঙ্গীকার সম্পর্কে পরিপূর্ণ ধারণার অভাবের কারণে। তাহাছাড়া আত্মকেন্দ্রিক ও স্বার্থকেন্দ্রিক মনোভাবের বিষয়তো রহিয়াছেই। সুতরাং যত সীমাবদ্ধতাই থাকুক না কেন তৃতীয় বিশ্বের নেতৃত্বকে প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতা ও দক্ষতা অর্জন করিতে হইবে দেশের সার্বিক কল্যাণের কথা মাথায় রাখিয়া। আর উহা করিতে না পারিলে উন্নয়ন-উন্নতি জনগণের কল্যাণের পরিবর্তে নেতাদের মুখ নি:সৃত ‘বাণী’ হইয়াই থাকিবে শুধু।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন