দেশের সেবাখাতের ক্রমবিস্তৃতি ঘটিয়া চলিয়াছে। এইভাবে একদিকে মানুষের জীবিকার ব্যবস্থা হইতেছে, অন্যদিকে ইহা জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখিতেছে। আমাদের জাতীয় প্রবৃদ্ধির অর্ধেকেরও বেশি এখন সেবাখাতের অবদান। একসময় কৃষি ও শিল্পখাতের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ থাকিলেও এখন পরিবর্তন ঘটিয়া চলিতেছে। গত প্রায় এক দশকের হিসাবে দেখা গিয়াছে, অর্থনীতিতে সেবাখাতের অবদান কেবলি বাড়িতেছে। মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ভোগলিপ্সা মিটাইতে গিয়া সেবা খাত অন্যান্য প্রকৃত অর্থনৈতিক খাতের তুলনায় আগাইয়া গিয়াছে। ইহার ফলে দেশের অর্থনীতিতে কাঠামোগত পরিবর্তন সাধিত হইয়াছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি এক সময় ছিল কৃষিনির্ভর। পরে কৃষিনির্ভরতার সঙ্গে যোগ হয় উত্পাদনমুখী খাত। দেশীয় উদ্যোক্তা সৃষ্টি করিতে সরকারি ব্যাংকগুলো থেকেও প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হইয়াছে। কিন্তুু শিল্পের কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানি করিতে হওয়ায় অভ্যন্তরীণভাবে শিল্পখাত নানা চ্যালেঞ্জ ও প্রতিকূলতার মধ্যে পড়িয়া যায়। যাহার কারণে মোট জাতীয় আয়ে এ খাতের অবদানও কমিয়া যায়। আর প্রবৃদ্ধির হার বাড়াইতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে সেবাখাত। আধুনিক অর্থনীতিবিদরা ইহাকে ইতিবাচক আখ্যা দিয়া অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তন বলে দাবি করেন। আবার কাহারো কাহারো মত হইতেছে, প্রকৃত খাত বিস্তার না ঘটিলে অর্থাত্ শিল্প খাতের প্রসার না ঘটিলে, উত্পাদনমুখী খাতের প্রাধান্য কমিয়া গেলে কর্মসংস্থানের সুযোগও কমিয়া যাইবে।
সে যাহাই হউক, জাতীয় প্রবৃদ্ধির হার বাড়াইবার জন্য প্রকৃত খাতের পাশাপাশি সেবা খাতও খুবই প্রয়োজনীয়। কিন্তুু ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থানের সুযোগ কমিয়া গেলে তাহা হইবে উদ্বেগজনক। তাই সেবাখাতের পাশাপাশি শিল্পখাতের বিস্তার বাড়াইবার জন্যও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ লইতে হইবে। পাশাপাশি সেবা খাতের অনেকগুলো উপখাতই এখনো আমাদের জাতীয় আয়ের হিসাবের মধ্যে আসে নাই বলিয়া সংবাদ প্রকাশিত হইয়াছে। সেই দিকেও বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া আবশ্যক।
বিশেষত: যেই সব খাত ভাল করিতেছে, সেই সব খাত অবশ্যই হিসাবের মধ্যে নিয়া আসা উচিত। এরমধ্যে কিছু উদাহরণ দেওয়া যাইতে পারে। যেমন নিরাপত্তা সেবা। বেশকিছু বেসরকারি কোম্পানি এখন নিরাপত্তা সেবা দিয়া আসিতেছে। ইহাছাড়াও সাজসজ্জা বা ডেকোরেটর, ইন্টেরিয়র, পরিচ্ছন্নতা, নিয়োগ প্রভৃতি সেবার বাণিজ্যিকায়ন হইয়াছে। কিন্তু এই সব খাত এখনো মোট জাতীয় উত্পাদনের (জিডিপি) অন্তর্ভুক্ত হয় নাই। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সামপ্রতিক এক জরিপে দেখানো হইয়াছে, ২০১০-১১ অর্থবত্সরের জিডিপিতে উক্ত খাতসমূহ তিন হাজার ৮৫৬ কোটি টাকার সমপরিমাণ মূল্য সংযোজন করিয়াছে। ২০০৯-১০ অর্থবত্সরে ইহার পরিমাণ ছিল তিন হাজার ২২৮ কোটি টাকা। আর এই ধরনের সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও নেহায়েত কম নহে। প্রায় ১৮ হাজার ৯৩১টি প্রতিষ্ঠান সক্রিয় রহিয়াছে উক্ত সেবা প্রদান করিবার জন্য। আলোচ্য কয়েকটি সেবার মূল্য সংযোজন করিলে চলতি অর্থবত্সরে জিডিপির আকার দশমিক ৫২ শতাংশ বাড়িবে বলিয়া দাবি করিয়াছে খোদ পরিসংখ্যান ব্যুরোর কর্মকর্তারা। আমরা মনে করি এইসব সেবা নিশ্চয়ই জাতীয় প্রবৃদ্ধির হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হইবে। সাথে সাথে সেবা খাতের সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের যাবতীয় বাধাগুলি দূরীভূত করিবার উদ্যোগ, সরকারের পক্ষ হইতে নেওয়া হইবে- সেই প্রত্যাশা করি।
