দেশভাগের সময় যখন উপমহাদেশে হিন্দু—মুসলিম দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন পশ্চিমবঙ্গের ব্যারাকপুরে এক জনসমাবেশে মহাত্মা গান্ধীর উপস্থিতিতে মনু গান্ধী ও আভা গান্ধী প্রথমে আলহামদু (সুরা ফাতিহা) ও কুলহু (সুরা ইখলাস) সুরা পাঠ করেন। অতঃপর রামবন্দনা গেয়ে সকলকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা পরিহারের আহ্বান জানিয়ে বক্তৃতা করেছিলেন। মহাত্মাজী রবিবার কথা বলতেন না। সমাবেশটি রবিবার হওয়ায় তার লিখিত বক্তব্য তার সেক্রেটারি পড়ে শোনালে সমবেত হিন্দু-মুসলিম যেন মুহূর্তের মধ্যেই সব ভেদাভেদ ভুলে গিয়েছিল। হিন্দু মুসলিম ভাই ভাই শ্লে¬াগানে মুখরিত হচ্ছিল ব্যারাকপুর। সে সমাবেশে গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উপস্থিত ছিলেন । বঙ্গবন্ধু তার “অসমাপ্ত আত্মজীবনী”তে লিখেন, “শহীদ সাহেব ছিলেন উদার, নিচতা ছিল না, দলমত দেখতেন না, কোটারী করতে জানতেন না, গ্রুপ করারও চেষ্টা করতেন না। কারণ তার আত্মবিশ্বাস ছিল অসীম।” তার উদার গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য সাময়িকভাবে কায়েমী স্বার্থান্বেষী মহল কর্তৃক কিছুটা বাধাগ্রস্ত হলেও স্থায়ীভাবে জনগণের হূদয়ে তার আসন ছিল সবার ঊর্ধ্বে ।
সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বিরোধী দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বীকে তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী করে উদার গণতান্ত্রিক রাজনীতির দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। আমাদের দেশে এমনটি আশা করা আকাশ-কুসুম কল্পনা বৈকি। আমাদের দেশের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ বরাবরই উদার রাজনীতির বিপরীত মেরুতে অবস্থান করেন। তাদের বিদ্বেষপূর্ণ আচরণ দেখে মনে হয় আদৌ তারা পরস্পরের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং শত বছরের পুরনো গোত্রীয় শত্রু। অত্যন্ত ঘৃণ্য ও দুঃখজনক হলেও সত্য যে, প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের দুই নেত্রী একজন আরেকজনের ছায়াও মাড়াতে পারেন না। নেত্রীদ্বয় একে অপরকে চোরের মা, মহাচোর খেতাব দিয়েছেন। সংসদ সদস্যের কেউ কেউ তো পরস্পরকে নিষিদ্ধ পল্লী¬¬র মেম্বারশিপ দিয়েছেন। তাদের নিচু আন্ত.করণ ও কটূক্তি থেকে রক্ষা পান না আমাদের পরম শ্রদ্ধাভাজন স্বর্গবাসী জনপ্রিয় দুই জাতীয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানও। প্রয়াত এই নেতাগণের সম্পর্কে প্রায়ই নানা কটূক্তি তাদের বিদেহি আত্মাকে জর্জরিত করে। জাতিকে করে ভীষণ মর্মাহত। এখন তত্ত্বাবধায়ক ইস্যুতে দল দুটি মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে। পদ্মা সেতু কেলেঙ্কারি, শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি, হলমার্ক কেলেঙ্কারিসহ নানা দুর্নীতিতে জর্জরিত ও ইলিয়াছ আলী গুম, সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি খুন, ব্ল¬গার রাজীব খুনসহ অসংখ্য খুনের আসামিদের গ্রেফতারে ব্যর্থ এ সরকার তার অধীনেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিরাপদ বলে অনড় রয়েছে। এদিকে বিরোধী দল তত্ত্বাবধায়ক ছাড়া নির্বাচন করলে আরেকটি ১৫ আগস্টের পুনরাবৃত্তির সন্ত্রাসী হুমকি দিয়েছে। দেশের এই সংকট নিরসনে বুদ্ধিজীবীগণ তাদের সুচিন্তিত অভিমত ব্যক্ত করলে নানা কটূক্তি শুনতে হচ্ছে তাদের। রাজনৈতিক দলগুলোর নিচু অন্তঃকরণ ও বিদ্বেষপূর্ণ আচরণ পর্যবেক্ষণে মনে হয় তাদের রাজনীতি দেশ বা দশ কারোর জন্যই নয়; বরং শুধুই দলের জন্য। মূলত প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর এতিম কন্যা ও বিরোধী দলীয় নেতা শহীদ জিয়াউর রহমানের এতিম দুই সন্তানের মা হওয়ার সুবাদে অদ্যাবধি জনগণের ভালবাসা বা করুণা পেয়ে আসছেন। নতুবা নিজস্ব আলোয় আলোকোজ্জ্বল বিশ্ববরেণ্য অসংখ্য কৃতী সন্তান বঙ্গমাতা জন্ম দিয়েছে। তাই আমি দুই নেত্রীকে বলব, নিজেদের নিচু অন্তঃকরণ আর বিদ্বেষ চরিতার্থ করার হীন মানসে মায়ের ষোল কোটি সন্তানের ভাগ্য নিয়ে খেলবেন না। রাজনৈতিক অরাজকতা সৃষ্টি করে বিদেশি বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করে অর্থনীতিকে স্থবির করবেন না। আজ আমরা তরুণ প্রজন্ম জেগেছি । আপামর সাধারণ জনগণ জেগেছে। এই মহা জাগরণ যুদ্ধাপরাধসহ দুর্নীতি, হত্যা, খুন, গুম, লুঠ, নির্যাতন ইত্যাদি সব অপরাধের বিরুদ্ধে। তাই বিশ্বকবির ভাষায় “মন হতে বিদ্বেষ বিষ নাশো” জনগণের এ আহ্বানে সাড়া দিয়ে সব বিদ্বেষের ঊর্ধ্বে এসে দেশ ও জনগণের স্বার্থে উদার গণতান্ত্রিক রাজনীতির ভবিষ্যত্ সুনিশ্চিত করুন—এমনটিই দাবি দেশবাসীর। অন্যথায় জাগ্রত জনতা আপনাদের ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করবে।
লেখক : ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ,
২য় বর্ষ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়,
চট্টগ্রাম।
