জলবায়ু

ইস্টার দ্বীপের ভাস্কর্য

আপডেট : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২০:৪০
প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ের জনাকীর্ণ দ্বীপ ইস্টার দ্বীপ যা এত উষ্ণ যে, এতে কোন বৃক্ষ নেই। তা না থাকলেও অনিন্দ্যসুন্দর কিছু ভাস্কর্য আছে, যা সাক্ষ্য বহন করে কয়েক শতাব্দির। মাত্র কয়েক হাজার জনবসতির এক দ্বীপে কেমন করে নির্মিত হলো শয়ে শয়ে ভাস্কর্য, যার বৃহত্তমটি ৩৩ ফুট উঁচু এবং ৮২ টন ভারি? প্রশ্নটি এরিক ফন ডানিকেনকে, যিনি ১৯৭০ দশকের সর্বাধিক বিক্রীত বইয়ের লেখকদের একজন, ভাবতে বাধ্য করেছিলো যে, এগুলো ভিন্ন গ্রহের প্রাণিরা এখানে নিয়ে এসেছে কি না!। এইসব ভাস্কর্য ও এর ভাস্করদের ‘সত্যিকারের কাহিনী’ জানা যায়, Jared Diamond এর বইয়ের প্রথম অধ্যায়ে, বইয়ের নাম, Collapse: How Societies choose to fail or Survive (Published by Penguin in 2006)। Diamond লস এনজেলেসের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্বের একজন অধ্যাপক এবং বেশ কয়েকটি পুরস্কারপ্রাপ্ত বইয়ের লেখক, যেগুলো মানব ইতিহাসের উপর পরিবেশের প্রভাব বিষয়ে রচিত। বিশেষ করে তাঁর বর্ণিত ইস্টার দ্বীপের ইতিহাস আজও আমাদেরকে পরিবেশ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়ে চলেছে। Diamond উল্লেখ করেন যে, প্রত্নতাত্ত্বিকরা প্রমাণ করেছেন যে, ইস্টার দ্বীপ এক সময় সম্পূর্ণ অন্যরকম ছিল, মনুষ্য বসতি স্থাপনের আগে এটি অন্যান্য নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপের মতোই বনজঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল। অন্যান্য দ্বীপ থেকে কেনুর মাধ্যমে লোকজন এখানে হাজির হয়। এটি একটি সুন্দর বাসযোগ্য দ্বীপ মনে হয় তাদের কাছে, জনসংখ্যাও দ্রুত বাড়তে থাকে। ঘটনাক্রমে এই ব্যাপারটি ভাস্কর্যের রহস্য উন্মোচিত করে, কারণ একটি বড় জনগোষ্ঠীর পক্ষে এতগুলো মিনার তৈরি করা সম্ভবপর। যদিও অচেনা অধিবাসীদের এটা জানা ছিল না যে, দ্বীপের উর্বরতা তাদের পূর্বে বসবাসকৃত অন্যান্য দ্বীপের থেকে অনেক কম, এই অনুর্বরতা বৃক্ষ উত্পাদনকে শ্লথ করে দেয়। এই কারণে দ্বীপবাসী যখন জ্বালানির জন্য, বাড়িঘর ও কেনু তৈরির জন্য গাছ কাটা শুরু করে, তখন তারা এমন হারে কাটে যেটা অন্যান্য দ্বীপের বর্ধনশীল বৃক্ষের সাথে তাল মেলাতে সক্ষম হলেও এই দ্বীপের নতুন বৃক্ষ উত্পাদনের থেকে অনুপাতে অনেক বেশি। আর তাই এটা দ্বীপে ধীরে ধীরে এক ভয়ঙ্কর দুর্যোগের জন্ম দেয়। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে জ্বালানি ও কেনুগুলো বানানোর জন্য গাছ কাটা বৃদ্ধি পায়। কেনুগুলো গুরুত্বপূর্ণ কেননা ডলফিন শিকার প্রাণীজ আমিষের বড় উত্স ছিল (সাথে অন্যান্য বুনো পাখি এবং বনের ছোট প্রাণিসমূহ। কিন্তু যখন বনের আচ্ছাদন ভেঙ্গে পড়ে পুরো দ্বীপের ভূমি, বৃষ্টি ও বাতাসে ক্ষরিত হতে থাকে, ফসল উত্পাদন কমে যায় এবং এর আশু সমাধান হিসাবে আরো গাছ কাটা হয় বেশি করে ফসল লাগানোর জন্য, তখন পুরো দ্বীপটি বৃক্ষশূন্য হয়ে পড়ে। সে কারণে কোনো বুনো পাখি বা শিকারের জন্য ছোট প্রাণিও থাকে না, কেবলমাত্র ইঁদুর ছাড়া। কেনুর জন্য কাঠ না থাকায় ডলফিন শিকারও বন্ধ হয়ে যায়, দ্বীপবাসীরা পতিত হয় খরা, যুদ্ধ এবং নরমাংস ভক্ষণে (দুর্ভাগ্যজনকভাবে মানুষের মাংস ছিল আমিষের টিকে থাকা অল্প কিছু উেসর একটি)। জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশ এই রকম ভয়ঙ্করভাবে বিলুপ্ত হয়। Diamond বর্ণনা দেন যে, অন্যান্য সমাজ মূলত পরিবেশগত বিপর্যয়ে ধবংস হয়, তন্মধ্যে প্রশান্ত মহাসাগরীয় কিছু দ্বীপ, গ্রীনল্যান্ড এর Norse Colony, দক্ষিণ পশ্চিম আমেরিকার Anasazi সভ্যতা, মধ্য আমেরিকার মায়া সভ্যতা এবং আধুনিক রুয়ান্ডা। তিনি জাপানের কথাও উল্লেখ করেন, যারা এই নিয়তির কাছাকাছি এসেছিল, কিন্তু বুদ্ধিদীপ্ত সিদ্ধান্ত আর দক্ষ নেতৃত্বে রক্ষা পায়। আমাদের জন্য এটি একটি শিক্ষা হতে পারে, বৈশ্বিক উষ্ণতার এই সময়ে এটা বিশ্বাস করাই সুখপ্রদ যে, আমাদের নেতারা সব সমস্যার সমাধান করবেন এবং মানবতা কখনোই ধ্বংস হতে দেবেন না, কিন্তু এই ধরনের বিশ্বাসের কোনো ভিত্তি নেই, অনেক পূর্বতন সমাজ এইভাবে ভেবেছিল এবং তারা ব্যর্থ হয়েছিল। দীর্ঘ সময় নিয়ে টিকে থাকার জন্য পরিবেশগত সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সত্যিকারের বোঝাপড়া এবং সেই সাথে শক্তিশালী রাজনৈতিক সদিচ্ছা জরুরি। ইস্টার দ্বীপের প্রথম আদিবাসীদের মতো আমরাও এখন এক নতুন পরিবেশে আছি, যা শিল্প সমৃদ্ধ একুশ শতক নামে পরিচিত, যেখানে গ্রীন হাউস গ্যাসের স্তর এত বেশি যা মানব ইতিহাসে আগে কখনো ছিল না। আমাদেরকে অচেনা পরিবেশগত অভিজ্ঞতা পেতে এখন আর নতুন করে দ্বীপ দখলের প্রয়োজন পড়ে না, আমাদের কার্বন ডাই অক্সাইডের নির্গমন পুরো পৃথিবীর জলবায়ু পরিবর্তন করে দিচ্ছে, যা পৃথিবীর সবার জন্য অজানা আশঙ্কা বয়ে আনছে। ইস্টার দ্বীপের দৃষ্টান্ত থেকে আমাদের ভাবা উচিত আমাদের নেতাদের অপুটতা সম্পর্কে, যারা গত বিশ বছর ধরে অসংখ্য আলোচনার পরেও কোন ঐকমত্যে আসতে পারেননি ভয়ঙ্কর জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিরোধে। লেখক :পরিবেশবাদী গবেষক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন