মুক্তির সংগ্রাম বনাম প্রজন্ম চত্বরের সংগ্রাম

আপডেট : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২০:০৪
সারাদেশে গোটা তরুণ সমাজসহ সাধারণ জনগণের যে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালিত হচ্ছে তা বাঙালি জাতির সামাজিক ও রাজনৈতিক মুক্তির সংগ্রাম বললে কোনো অংশেই ভুল হবে না বলে আমার মনে হয়। বিশেষ করে গত ১২ ফেব্রুয়ারি বিকাল ৪টা থেকে ৩ মিনিট গোটা জাতি যে নীরব গর্জন দেয় তা ছিল জাতির ইতিহাসে অনন্য কর্মসূচি। একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের দাবিতে শাহবাগ প্রজন্ম চত্বরসহ সারাদেশ আজ একাত্মভাবে সোচ্চার ও আন্দোলিত। দাবি আদায়ের শ্লোগানে শ্লোগানে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। পরিণত হয়েছে এক নিরস্ত্র যুদ্ধক্ষেত্রে। মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার মহান বাণী-“এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” মুক্তিযুদ্ধের এ আহ্বানে বাঙালিরা যুদ্ধ করেছে, পেয়েছে স্বাধীনতা। কিন্তু সামাজিক ও রাজনৈতিক মুক্তির দায় এ বাঙালি জাতির কাঁধে থেকেই গেছে দীর্ঘ ৪২ বছর। বাঙালির হূদয়ে স্বাধীনতার ছোঁয়া লাগলেও চূড়ান্ত মুক্তি এখনও সম্ভব হয়নি। ৩০ লক্ষ শহীদ, অসংখ্য মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে। কিন্তু এ সমাজে থেকে গেছে মানবতাবিরোধী অপরাধীরা- রাজাকার, আলবদর নামে সামাজিক অভিশাপ । স্বাধীনতা-পরবর্তী দীর্ঘ ৪২ বছর ধরেও জাতি এ অভিশাপ থেকে মুক্ত হতে পারেনি। আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি; কিন্তু পাইনি সামাজিক কিংবা রাজনৈতিক মুক্তি। সামাজিক-সামপ্রদায়িক নিরাপত্তাও নেই। অর্থনৈতিক মুক্তি এসেই আসছে না। আমরা এসব অভিশাপ থেকে মুক্তি চাই। শাপ মোচন করে স্বাধীনতার স্বাদ নিয়ে ঘরে ফিরে যাওয়াই আজ গোটা জাতির প্রত্যাশা। আজকের প্রজন্মে শুধু যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লা নয়, গোলাম আযম, নিজামী নয়, এরকম হাজারো কাদের মোল্লা, গোলাম আযম, নিজামী খোলস বদল করে আমাদের সমাজে মিশে গেছে, আত্মীয়-নিকটাত্মীয় হয়ে অভিশাপের যন্ত্রণা দিচ্ছে। আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ সেই খোলস পাল্টানো লোকটি যদি আমার বাবা, আমার ভাই, আমার বোন, এমনকি বৈবাহিক সম্পর্কের কোনো আত্মীয় হয়, আমরা তাদের বর্জন করবো, তাদের অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আওতায় এনে বিচার করবো। নতুবা এই অভিশাপের বীজ থেকেই যাবে, বারবার কলুষিত হবে সামজিক, সামপ্রদায়িক, এমনকি রাজনৈতিক ক্ষেত্র । এ প্রজন্মের নীরব যুদ্ধের সাথে সরকারের একাত্মতা কিংবা সংহতির ঘোষণা বাঙালির মুক্তির চেতনাকে নতুনভাবে উজ্জীবিত করেছে। ইতিমধ্যেই সরকার আইন সংশোধন করে আন্দেলনে নতুন মাত্রা দিয়েছে। সরকারের কাছে দাবি জানাই, যেন এই ঐতিহাসিক আইন সকল মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের উপযুক্ত করে তোলা হয়। সমাজে প্রতিনিয়ত যে হত্যা, ধর্ষণ, খুন প্রভৃতি মানবতাবিরোধী অপরাধ ঘটছে তার বিচারও অনিবার্য হওয়া দরকার। একাত্তরের মানবতাবিরোধীদের মতো ৪২ বছরে হাজার হাজার খুন, অসংখ্য মা-বোন এবং শিশু ধর্ষণ ও হত্যাসহ হাজারো মানবতাবিরোধী কাজের নজির সৃষ্টি হয়েছে। একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধসহ ’৭১ পরবর্তী সকল মানবতাবিরোধী অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত হোক এটা আমাদের সবারই কাম্য। আজ সময় এসেছে একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক মুক্তির সকল দায় ঘোচানোর। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার বন্ধের দাবিতে বা বিচার প্রক্রিয়াকে থমকে দিতে বিভিন্ন সময় হরতাল চলাকালে অসহনীয় নৈরাজ্য, সন্ত্রাস এবং ভয়াবহ ধ্বংসাত্মক তাণ্ডবলীলা হয়, যাতে জনমনে গভীর আতঙ্ক সৃষ্টির বাহন হিসেবে কাজ করে। হরতালে ঢাকাসহ সারাদেশে অসংখ্য যানবহন ভাংচুর, আগুনে পোড়ানোসহ নানাবিধ সহিংস কর্মকাণ্ডে অসংখ্য নাগরিক নিহতের ঘটনাও ঘটে। নিহত কে বা কারা কিংবা তাদের দলীয় পরিচয়ইবা কী, সেটা বড় কথা নয়—প্রশ্ন হলো এ মৃত্যুর দায় কার? এ দায় কী সরকারের, জনগণের, নাকি যারা হরতাল ডেকে নাশকতার পরিবেশ সৃষ্টি করছে? যুদ্ধাপরাধের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বাতিল এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আটক নেতাদের মুক্তির দাবিতে জামায়াত-শিবির যে শ্লোগান ও কর্মসূচি দিয়ে আসছে তা কতটুকু যৌক্তিক সেটা সাধারণ জনগণের নিকট সহজেই অনুমেয়। আসন্ন নির্বাচন কীভাবে হবে, কোন সরকারের অধীনে হবে তা নিয়ে যথেষ্ট পক্ষ-বিপক্ষ মতামত রয়েছে, যা খুব শীঘ্রই যে কোনো একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান হওয়া বাঞ্ছনীয় এবং সরকার ও বিরোধী দল উভয়কেই সহনশীলভাবে তা মেনে নিয়ে জনগণের মনে আস্থার জায়গা সৃষ্টি করা উচিত। দশম সংসদ নির্বাচন কোন সরকারের অধীনে হবে এবং কীভাবে হবে তার সাথে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধের দাবি কোনোভাবেই এক করে দেখা যায় না। কারণ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি দেশের এই প্রজন্ম তথা দেশের জনসাধারণের দাবি। কিন্তু যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া থমকে দিতে কোনো আন্দোলন কিংবা সহিংসতামূলক কোনো কর্মসূচি জনগণ কোনোভাবেই মেনে নিতে পারে না এবং এসব আন্দোলনে নিহতদের দায়ও তাদেরকেই নিতে হবে, যারা হরতাল ডেকে এমন নাশকতার পরিবেশ-পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধিত দল হিসেবে যে কোনো গণতান্ত্রিক আন্দোলন করার অধিকার জামায়াতের রয়েছে; কিন্তু সেটা যদি সংবিধান পরিপন্থি হয় তাহলে সেটা মেনে নেয়া যৌক্তিক হতে পারে না। কারণ মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য যে ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছে তা সংবিধানসম্মতভাবেই হয়েছে। কাজেই এই ট্রাইব্যুনালের কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে চাওয়া সংবিধানসম্মত নয়। দেশে রয়েছে একটি নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার, আইন-কানুন ও বিভিন্ন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। এতদসত্ত্বেও জামায়াত-শিবির কীভাবে এত ভয়ানক নাশকতা চালাতে পারছে, সেটাও সাধারণ জনগণের মনে একটি বড় প্রশ্ন। সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে ইতিমধ্যেই জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করারও দাবি উঠেছে। এই সংগঠনকে নিষিদ্ধ করা কতটা গণতন্ত্রসম্মত সেদিকে না গিয়েও অন্তত এটুকু বলা যায়, তারা যেভাবে নাগরিক জীবনের প্রতি হুমকি হয়ে পড়েছে, তাতে এ ধরনের রাজনীতি বন্ধের স্বতঃস্ফূর্ত দাবি উঠাই স্বাভাবিক। তাদের কর্মকাণ্ড কোনো বিচারেই গণতান্ত্রিক কিংবা শান্তিপূর্ণ নয়। আমরা বিশ্বাস করি, স্বাধীনতাবিরোধীদের নানাবিধ নাশকতা ও তাণ্ডব শক্ত হাতে দমন করলে গণতন্ত্রের কোনোই ক্ষতি হবে না; বরং দমন করতে না পারলেই সামাজিক ও রাজনৈতিক মুক্তির দায় থেকেই যাবে। সামাজিক ও রাজনৈতিক মুক্তির দায় থেকে মুক্তির লক্ষ্যেই তা শক্ত হাতে দমন করা উচিত। এমন অবস্থায় তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের সব ইতিবাচক শক্তির মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। তবে এক্ষেত্রে সরকারকে সজাগ থাকতেও হবে যথেষ্ট। কারণ এমন কোনো পদক্ষেপ নেয়া যাবে না যাতে বিরোধী শক্তির কোনো লুক্কায়িত স্বার্থ উদ্ধার হয়ে যায়। সরকারের উচিত হবে স্বাধীনতাবিরোধীদের সহিংস কর্মকাণ্ডকে প্রশ্রয় না দিয়ে এবং যত দ্রুত সম্ভব আইনানুগ কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের রায় ও তা কার্যকর করার মধ্য দিয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক মুক্তির দায় থেকে মুক্তি পাওয়া। লেখক:শিক্ষক রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। Email: [email protected]