তথ্যপ্রযুক্তির এই জোয়ারের যুগে এসে প্রযুক্তির ব্যবহার ছড়িয়ে পড়েছে বিভিন্নভাবে। দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই অবশ্যম্ভাবীভাবে প্রযুক্তির ব্যবহার ছড়িয়ে পড়েছে। একটা সময় পর্যন্ত এসব প্রযুক্তির ব্যবহারকে বিভিন্ন কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা গেলেও এখন আর তা সম্ভব নয়। এখন প্রতিটি কাজের মধ্যেই পৌঁছে গেছে প্রযুক্তি। সামাজিক এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও প্রযুক্তির ব্যবহার পেয়েছে এক ভিন্ন মাত্রা।
বিভিন্ন বিষয়ে নিজের মতামতকে প্রকাশ করার এক অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে সামাজিক যোগাযোগ এবং ব্লগ সাইটগুলো স্বীকৃত পেয়ে এসেছে আগে থেকেই। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্লগ এবং সামাজিক যোগাযোগের এসব সাইটের ব্যবহার এমনভাবে প্রসার লাভ করেছে, যাতে করে এসব সাইট একটা সময়ে এসে পরিণত হয়েছে বিকল্প গণমাধ্যমে। প্রিন্ট বা ইলেকট্রনিক মিডিয়ার পাশাপাশি এখন অনলাইন বিশ্বব্যাপী পরিগণিত হচ্ছে শক্তিশালী মিডিয়া হিসেবে। যেকোনো খবরকে মুহূর্তের মধ্যেই সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়ার যে প্রক্রিয়া, তার কারণেই এসব মাধ্যমের দিকে ঝুঁকে পড়েছে সারা বিশ্বের মানুষ। বিশেষ করে যারা ইন্টারনেট ব্যবহার করে থাকেন, তাদের কাছে এসব সাইটের কোনো বিকল্প নেই। এসব সাইটকে ব্যবহার করে তাই নানা ধরনের আন্দোলনের গড়ে ওঠার নজির তৈরি হয়েছে বিশ্বব্যাপী। আমাদের দেশেও শাহবাগে যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে চলমান যে আন্দোলন, তার গড়ে ওঠার পেছনেও রয়েছে সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন ওয়েবসাইট, বিশেষ করে ফেসবুক এবং বিভিন্ন ব্লগসাইটের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। আর শুধু আন্দোলন গড়ে তোলাই নয়, দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে অনলাইনেও সমানতালে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন আমাদের নতুন প্রজন্মের সাইবার যোদ্ধারা, ব্লগ যোদ্ধারা।
৫ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার রায়ে যখন তাকে সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদান করা হয়নি, তখন থেকেই তাত্ক্ষনিকভাবেই অনলাইনে চলতে থাকে প্রতিবাদ আর ক্ষোভ। ব্লগার, ফেসবুক ব্যবহারকারী থেকে শুরু করে অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টরা সরব হয়ে ওঠেন এই রায়ের প্রতিবাদে। ব্লগার অ্যান্ড অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট নেটওয়ার্কের ব্যানারে তখন অনলাইন থেকে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে শাহবাগের রাজপথে। সময়ের সাথে সাথে তাদের সাথে একাত্ম হয়ে সারা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী আপামর জনগণ একাত্মতা প্রকাশ করতে থাকে। এক নতুন জোয়ার যেন তৈরি হয় শাহবাগে। গণজাগরণের এই জোয়ারে শাহবাগ চত্বরের নতুন নামকরণ হয় ‘প্রজন্ম চত্বর’।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী মানুষের ঢল যখন শাহবাগকে কেন্দ্র করে ছড়িয়ে পড়ছে দেশজুড়ে, তখন শাহবাগে যেমন আন্দোলনকারীরা জড়ো হয় অনলাইনের ডাকে, তেমনি স্বাধীনতার চেতনার বিপক্ষের শক্তিও অনলাইনকেই বেছে নেয় তাদের অপপ্রচার চালানোর জন্য। বিভিন্ন ব্লগসাইট, টুইটার আর ফেসবুকে তারা বিভিন্ন ধরনের পোস্ট আর কমেন্টের মাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দিতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টায় লিপ্ত হয়। শাহবাগের রাজপথে আন্দোলনে ব্যস্ত তরুণরা তখন তাদের জবাব দিতেই নিজেদের সক্রিয়তা সমানতালে বজায় রাখে অনলাইনেও। ফেসবুকের বিভিন্ন পোস্ট, বিভিন্ন পেজ, ওয়েবসাইট, ব্লগ, অনলাইন রেডিওর মাধ্যমে সাইবার স্পেসেও যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।
যুদ্ধ চলছে ব্লগে
শাহবাগে চলমান আন্দোলন নিয়ে নানা ধরনের তথ্য, আলোচনা আর ছবি নিয়ে প্রতিনিয়তই বিভিন্ন ব্লগে আসছে বিভিন্ন পোস্ট। এসব ব্লগসাইটের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ব্লগ হচ্ছে সামহোয়্যারইন ব্লগ (www.somewhereinb log.net), আমার ব্লগ (www.amarbl og.com), সচলায়তন (www.sachalay atan.com), আমারবন্ধু (www.amrab ondhu.com) প্রভৃতি। এসব ব্লগে ব্লগাররা সবসময়ই শাহবাগের চলমান আন্দোলনের খবর নিয়ে নানা পোস্ট দিয়ে যাচ্ছেন, পোস্ট করছেন ছবি। সেইসাথে সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে চলছে নানা ধরনের আলোচনা।
শাহবাগ নিয়ে ওয়েবসাইট
শাহবাগের আন্দোলনের নানা খবর, ছবি আর আলোচনা নিয়ে তৈরি হয়েছে বেশ কয়েকটি ওয়েবসাইট। এসব সাইটের মধ্যে রয়েছে http://shahbag. org/news, http://proj onmochattar.c o m, http://www.shah bagchottor.com, http://www.sh ahbagprotest.com প্রভৃতি। এসব সাইটের প্রতিটিতেই আন্দোলনের শুরু থেকে দিন ধরে ধরে বিভিন্ন খবর আর ছবি পাওয়া যাবে। শাহবাগের পাশাপাশি সারা দেশের বিভিন্ন স্থানে এই আন্দোলনের সাথে সংহতি প্রকাশ করে যেসব কার্যক্রম চলছে এবং দেশের বাইরেও যেসব কর্মসূচী পালিত হচ্ছে বিভিন্ন দেশে, সেসব খবর আর তার ছবিও মিলবে এসব সাইটে।
ফেসবুক আর টুইটার
ফেসবুকে যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবীতে চলমান আন্দোলন নিয়ে রয়েছে অনেক পেজ। এসব পেজেও মিলছে সর্বশেষ সব খবর, ছবি আর আলোচনা। এসব পেজের মধ্যে রয়েছে প্রজন্ম চত্বর (http://go o.gl/SLsMV), শাহবাগে সাইবার যুদ্ধ (http://goo.g l/e QtCv), শাহবাগ:প্রজন্ম চত্বর (http://go o.gl/N 5xnG), শাহবাগ স্কয়ার (http://goo. gl/ oqGjW), শাহবাগ প্রতিবাদ (http:/ /goo .gl/LycDn), শাহবাগ আন্দোলন (http://g oo.gl/ aOx0d), শাহবাগ চত্বর-প্রজন্ম চত্বর (http://goo .gl/QPFLe), প্রজন্ম চত্বর-শাহবাগ (http://goo.gl/ aiDph)। এর বাইরে ‘প্রজন্ম চত্বর বুলেটিন’ নামের একটি নিয়মিত প্রকাশনাও পাওয়া যাচ্ছে শাহবাগে, যার ফেসবুকেও রয়েছে পেজ (https://www. facebook.co m/PCB2013)।
টুইটারেও https://twitter.com/Scyberjuddho লিংকে গেলে টুইটারে শাহবাগকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই আন্দোলন সম্পর্কে বিভিন্ন টুইট এবং লিংক পাওয়া যাবে। আবার শাহবাগকে নিয়ে টুইটারে কোনো টুইট দিতে গেলে এখন সবাই ব্যবহার করছেন #Shahbag। #Shahbag ট্যাগ দিয়ে সার্চ দিলেই পাওয়া যাচ্ছে টুইটারে শাহবাগের আন্দোলন নিয়ে সব টুইট।
আন্দোলনের গান/কবিতা অনলাইনে
আন্দোলনের এই সময়ে বসে নেই কবি, শিল্পী, সাহিত্যিকরা। কবিতা, গান আর নানা ধরনের লেখায় তারা প্রতিবাদ জানিয়ে যাচ্ছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে; সংহতি জানিয়ে যাচ্ছেন আন্দোলনরতদের সাথে। শিল্পী কবীর সুমন বরাবরই বিভিন্ন আন্দোলনে অন্যতম প্রতিবাদী একটি কণ্ঠ। শাহবাগের আন্দোলন শুরুর পর থেকেই তিনি তার কবিতা কিংবা গানে উত্সাহ দিয়ে যাচ্ছেন সকলকে। এ পর্যন্ত তার চারটি কবিতা কিংবা গানে তিনি স্মরণ করেছেন এই আন্দোলনকে। তার নিজস্ব ওয়েবসাইট http://www.k abirsumanonline.com কিংবা তার ফেসবুক পেজ https://www. facebook. com/kab irsuman?ref=ts&fref=ts গেলেই পাওয়া যাবে এসব গান কিংবা কবিতা। https://www. faceb ook.com /photo. php?v=10151296722231448 লিংকে গেলে আবার মিলবে প্রীতমের লেখা, সুর করা এবং গাওয়া গান একাত্তরের হাতিয়ার। ব্রদারহুড প্রজেক্টের নামে এ নিয়ে আরেকটি গান মিলবে http://goo.gl/8rmxY লিংকে। http://goo.gl/RsqAt লিংকে গেলে পাওয়া যাবে সুমনের গান। তরুণ শিল্পীরাও বসে নেই শাহবাগের আন্দোলনের এই সময়ে। তারাও লিখছেন, গাইছেন নতুন নতুন সব গান। অডিও শেয়ারিং সাইট সাউন্ড ক্লাউডে (https://sound cloud.com) এসব গানের লিংক পাওয়া যাবে। এর মধ্যে রয়েছে একাত্তর সালের চরমপত্রের আদলে তৈরি করা নতুন চরমপত্র (http://go o.gl/9zqgq)। শাহবাগের গানের একটি বড় তালিকা রয়েছে http://goo.gl/8 udel লিংকে। সংশ্লিষ্ট ৩৫টি গান পাওয়া যাবে এই লিংকে গেলে।
অনলাইন রেডিও
আন্দোলনের খবর সরাসরি সবসময় জানতে চালু হয়েছে অনলাইন রেডিও ‘ম্যাংগোরেডিও’ (http://man godio.com)। আমজনতার জন্য এই রেডিও তৈরি করা হয়েছে বলেই এর এমন নাম দেওয়া হয়েছে। এখানে অবশ্য রেডিও’র পাশাপাশি একটি ব্লগসাইটও রয়েছে।
মোটকথা, দৃপ্ত তারুণ্য যে গণদাবী নিয়ে এবার নেমেছে এই আন্দোলনে, তাতে তারা ছড়িয়ে পড়তে চায় সবখানেই। তাই রাজপথের বাইরে সাইবার স্পেসেও সমানভাবে সক্রিয় এই তরুণরা। প্রযুক্তির সহায়তায় তারা তাদের আন্দোলনকে সফল করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।
