পুষ্টিহীনতা ও জীবনমানের উন্নয়ন

আপডেট : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২১:০১
সমপ্রতি প্রকাশিত জাতীয়ভিত্তিক এক জরিপের ফলাফলে দেখা গিয়াছে যে, বাংলাদেশে অনুপুষ্টি বা মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টস-এর অভাব প্রবল। প্রাক্-স্কুল শিশুদের ৪৫ শতাংশ এবং গর্ভবতী নয় কিংবা শিশুদের স্তন্য দেয় না এমন নারীদের ৫৭ শতাংশ দস্তার স্বল্পতায় ভুগিতেছে। বস্তিবাসী শিশু ও নারীদের মধ্যে এই হার আরও বেশি। প্রাক্-স্কুল ও স্কুলগামী শিশুদের মধ্যে ভিটামিন ‘এ’-এর স্বল্পতা ব্যাপক। প্রতি পাঁচটি শিশুর মধ্যে একটি শিশু ভিটামিন ‘এ’ স্বল্পতায় ভুগিতেছে। দীর্ঘদিন যাবত্ এই অবস্থা চলিয়া আসিতেছে। অন্যদিকে, লৌহের অভাবজনিত রক্তস্বল্পতার প্রকোপ কিছুটা কমিলেও প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজন নারী এখনও ভিটামিন ১২-এর অভাবে ভুগিতেছেন। সরকারের জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান, আইসিডিডিআরবি, ইউনিসেফ ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল অ্যালায়েন্সের যৌথ উদ্যোগে দেশে প্রথমবারের মতো পরিচালিত ‘জাতীয় অনুপুষ্টি জরিপ ২০১১-২০১২’-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এই চিত্রটি ফুটিয়া উঠিয়াছে। বাংলাদেশের মতো দারিদ্র্যকবলিত একটি দেশের জন্য উপর্যুক্ত চিত্রটি অপ্রত্যাশিত না হইলেও একেবারে উপেক্ষা করিবার মতোও নহে। ইহা অনস্বীকার্য যে স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে সমাজ ও অর্থনীতির নানা ক্ষেত্রে যে বিপুল অগ্রগতি সাধিত হইয়াছে, জরিপের ফলাফল সেই তুলনায় আশাব্যঞ্জক নহে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের নিকট ইহার জুতসই ব্যাখ্যাও নিশ্চয় আছে। আমরা বিশেষজ্ঞ নহি। অবশ্য সামগ্রিকভাবে পুষ্টিহীনতার সাথে দারিদ্র্যের সম্পর্ক যে অবিচ্ছেদ্য তাহা বুঝিবার জন্য বিশেষজ্ঞ হইবার প্রয়োজন পড়ে না। বিগত দশকগুলিতে দারিদ্র্য পরিস্থিতির উন্নতির সাথে সাথে অনাহার-অর্ধাহার ও অপুষ্টিজনিত সমস্যার তীব্রতাও যে অনেকাংশে হ্রাস পাইয়াছে তাহাও অস্পষ্ট নহে। অনুপুষ্টির অভাবের মূল কারণও যে দারিদ্র্য তাহা অস্বীকার করিবার উপায় নাই। তবে এই ক্ষেত্রে খাদ্যাভ্যাসেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রহিয়াছে বলিয়া বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। তাহাদের মতে, শাক বা উদ্ভিদ জাতীয় খাদ্যে দস্তা কম থাকে। দেশের এক-তৃতীয়াংশ নারীর খাদ্য-তালিকায় উদ্ভিদ-জাতীয় খাদ্যই থাকে অধিক পরিমাণে। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও শুধু খাদ্যাভ্যাসের কিছুটা পরিবর্তনের মাধ্যমে পুষ্টির অভাব যে অনেকটাই পূরণ করা সম্ভব তাহা ইতিমধ্যে প্রমাণিত হইয়াছে। ইহার জন্য অর্থের চাইতে সচেতনতার প্রয়োজনই বেশি। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলিকে এইদিকে আরও বেশি নজর দিতে হইবে। পাশাপাশি, সরকারের কিছু নীতিগত সিদ্ধান্ত ও উদ্যোগেরও প্রয়োজন রহিয়াছে। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, লবণের সাথে আয়োডিন মিশ্রণ বাধ্যতামূলক করার কারণে আয়োডিন ঘাটতিজনিত গুরুতর সমস্যার কবল হইতে আমরা রক্ষা পাইয়াছি। এখন ভোজ্যতেলের সাথে ভিটামিন ‘এ’ মিশ্রণের একটি উদ্যোগের কথা শোনা যাইতেছে। উদ্যোগটি জরুরিভিত্তিতে বাস্তবায়িত হওয়া উচিত বলিয়া আমরা মনে করি। পুষ্টি লইয়া যতো আলাপ-আলোচনা হয় তাহাতে অনুপুষ্টির বিষয়টি প্রত্যাশিত গুরুত্ব পায় বলিয়া মনে হয় না। কিন্তু জনস্বাস্থ্যের জন্য ইহা খুবই জরুরি। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভিটামিন এ’ রাতকানা রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে। লৌহ শুধু যে রক্তের লোহিত কণিকা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে তাহাই নহে, ইহার অভাবে মানুষের শিক্ষার ও কাজের ক্ষমতা হ্রাস পায়। শরীরের স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে দস্তার ভূমিকা অপরিহার্য। অতএব, অনুপুষ্টির বিষয়টিকে হালকা করিয়া দেখিবার কোনো অবকাশ নাই। ইহার জন্য সচেতনতা দরকার, দরকার সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগ। তবে সবচাইতে বেশি দরকার হইল, জনগণের জীবনমানের উন্নয়ন। সংখ্যাগরিষ্ঠ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনমানের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করিতে না পারিলে পুষ্টিহীনতার এই দুষ্টচক্র হইতে পরিত্রাণের পথ সুদূরপরাহতই বলা চলে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন