জীবনসাধনা

ঝর্ণাধারা চৌধুরী মানবকল্যাণে নিরলস সাধক

আপডেট : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২১:০২
ঝর্ণাধারা চৌধুরী আমাদের দেশের মানবকল্যাণে নিবেদিত এক নিরলস ও নিরহঙ্কার সাধক যাকে অনুসরণ করা যায়, যাকে দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরা যায়। মুক্তবুদ্ধি ও অহিংস চেতনার এই মানুষটি তার জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত লড়ে যাচ্ছেন মানবতার পক্ষে, সকল রকম সংকীর্ণতা ও সামপ্রদায়িকতার বিরুদ্ধে। অতি সমপ্রতি তিনি পেয়েছেন এক মর্যাদাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক পুরস্কার। তিনিই প্রথম বাংলাদেশি যিনি এ বছর ভারতের সর্বোচ্চ সম্মানজনক বেসামরিক পদক ‘পদ্মশ্রী’ অর্জন করে এক অনন্য গৌরবে ও অসামান্য মর্যাদায় সিক্ত হলেন। এ বছর ভারতের গণপ্রজাতন্ত্র দিবসে এই পদক প্রদানের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। ২০০০ সালের প্রথম দিকের কথা। পাক্ষিক অনন্যার ২০০১ সালে অনন্যা শীর্ষ দশ পুরস্কারের জন্য তালিকা তৈরির কাজ করছি। ইতিপূর্বেই তার সম্পর্কে জানতে পেরেছি নারী নেত্রী চিত্রা ভট্টাচার্য এবং উন্নয়ন কর্মী শামসুল হুদার কাছ থেকে। তারপরে তার সম্পর্কে বিস্তারিত জানলাম তাকে জানে এমন দু’একটি সংগঠনের মাধ্যমে। নীরবে-নিভৃতে দেশ ও মানুষের কল্যাণের মহান ব্রত নিয়ে যিনি নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছেন তিনিই নোয়াখালীর সোনাইমুরীর জগয়ায় প্রতিষ্ঠিত গান্ধী আশ্রম ট্রাস্ট-এর সচিব ঝর্ণাধারা চৌধুরী। ২০০০ সালে তার জীবন ও মহতী কর্মের আলোকে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে আমি নিজেই বিস্ময়ে চমত্কৃত হলাম। সেই প্রতিবেদনের আলোকেই অনন্যা কর্তৃপক্ষ ২০০১ সালের মানবকল্যাণে বটবৃক্ষতুল্য এই মানুষটিকে অনন্যা শীর্ষ দশ পুরস্কার প্রদানের সিদ্ধান্ত নিলেন। সেদিনের সেই সিদ্ধান্ত যে কত সঠিক ছিল ২০১৩ সালে তার যথার্থ প্রমাণ মিললো। ঠিক এই মুহূর্তে মনে পড়ছে আরো তিন কৃতী নারীর কথা যারা অনন্যা পুরস্কারের পর আন্তর্জাতিক অসামান্য পুরস্কার পেয়ে দেশকে অবিস্মরণীয় মর্যাদার জায়গায় নিয়ে গেছেন। সেই অনন্য মর্যাদার অংশ হিসেবে আমরাও গর্বিত। তারা হচ্ছেন- অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার বিজয়ী অধ্যাপক সানজিদা খাতুন যিনি শান্তি নিকেতনের দেশীকোত্তম পদক, অনন্যা শীর্ষ দশ বিজয়ী- যশোরের বাঁচতে শেখার আঞ্জেলা গোমেজ ও সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। এরা দু’জনেই ম্যাগ সাই সাই পুরস্কার এবং আইন ও মানবাধিকার কর্মী সুলতানা কামাল পেয়েছিলেন জাতিসংঘের মানবাধিকার সনদের রচয়িতা কানাডীয় নাগরিক জন হামফ্রে এওয়ার্ড এর নামে প্রদত্ত ‘জন হামফ্রে ফ্রিডম এওয়ার্ড’। এছাড়া অনন্যা পুরস্কার প্রাপ্ত অনেকেই রোকেয়া পদক ও রাষ্ট্রীয় পদক পেয়ে আমাদের এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রেরণা ও দিক নির্দেশনা দিয়েছেন। প্রচার বিমুখ এবং নির্যাতিত ও নিপীড়িত মানুষকে পথ দেখানো এই মানুষটি ১৯৩৮ সালের ১৫ অক্টোবর লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন। বাবা প্রয়াত প্রমথ চৌধুরী ও মা আশালতা চৌধুরী। এগার ভাই-বোনের মধ্যে তিনি দশম। মাধ্যমিক পর্যায়ের লেখাপড়া করেছেন চট্টগ্রাম খাস্তগীর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে। উচ্চ মাধ্যমিক পড়েছেন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ এবং স্নাতক করেছেন ঢাকা কলেজ থেকে। ১৯৬০ সালে নিজ বাড়ি ত্যাগ করে স্বেচ্ছায় বিক্রমপুর জেলার বাউতভোগ গ্রামে ঢাকেশ্বরী কটন মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সর্বশ্রী সুনীলবসু ও চারু চৌধুরীর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ‘অম্বর চরকা’ প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন এবং সুতাকাটা, মৌমাছি পালনের প্রশিক্ষণ নেন। ১৯৪৬ সালে নোয়াখালীর দাঙ্গার সময় মহাত্মা গান্ধীর নির্দেশে ওড়িশ্যা থেকে সত্য নারায়ণজী দাঙ্গাপীড়িত অঞ্চলে কাজ করেন। সত্য নারায়ণজীর সেই অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা মানুষের সামনে তুলে ধরেন ঝর্ণাধারা চৌধুরী তার ‘সত্য নারায়ণজী’ গ্রন্থ প্রকাশের মধ্য দিয়ে। ১৯৬০ সালে চট্টগ্রামের উপকূলীয় অঞ্চল দিয়ে বয়ে যাওয়া সামুদ্রিক সাইক্লোনে আহত নিঃস্ব গৃহহীন মানুষের পাশে দাঁড়ান। মানুষের কল্যাণের জন্য প্রতিষ্ঠিত প্রবর্তক সংঘের স্বেচ্ছাসেবকদের সাথে যুক্ত হয়ে দীর্ঘদিন এই অসহায় মানুষদের জন্য সেবা ও ত্রাণ কাজ চালান। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রবর্তক সংঘ ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য এক শক্তিশালী ঘাঁটি। ঝর্ণাধারা চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে সেখানে স্বেচ্ছাসেবকের কাজ করতেন। পাক বাহিনীর নৃশংস হত্যাযজ্ঞের সময় এই প্রতিষ্ঠানের সকল পরিচালক নিহত হলে ঝর্ণাধারা চৌধুরী প্রচণ্ড ঝুঁকির মধ্যে সাহসের সাথে চারশত শিশুকে ক্যাথলিক মিশনের সহায়তায় সীমান্তের ওপারে নিয়ে তাদের প্রাণরক্ষা করেন। ১৯৭৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি গান্ধী আশ্রমে যোগ দেন এবং গান্ধী আশ্রম ট্রাস্টের ক্ষতিগ্রস্ত উন্নয়ন প্রকল্পগুলোকে শক্তিশালী ও ব্যাপকভাবে জনমুখী করার বাস্তব কর্মসূচি গ্রহণ করে নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করেন। নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের জয়াগে অবস্থিত এই গান্ধী আশ্রম ট্রাস্টের সচিব ঝর্ণাধারা চৌধুরী ৭৪ বছর বয়সে এখনও আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সাথে তার কাজ করে যাচ্ছেন। ঝর্ণাধারা চৌধুরী মনে করেন সাফল্য হল সাধনার ফল। সাফল্য বা স্বীকৃতির জন্য তিনি কাজ করেননি, একটি আদর্শ নিয়ে বাঁচতে চেয়েছেন। অনেক কঠিন সময় কাটিয়েছেন, কিন্তু আদর্শ থেকে এতটুকু বিচ্যুত হননি। মহাত্মা গান্ধীর প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে নিজেকে তিনি তৈরি করেছেন এক দৃঢ় চিত্ত নারী হিসেবে। দেশ ও মানুষের সেবাকেই জীবনের লক্ষ্য হিসেবে স্থির করলেন। তাই তিনি আমাদের নমস্য- আমাদের প্রাণ ঢালা অভিনন্দন ঁতাঁকে । ++লেখক : সাংবাদিক ও নারী অধিকার কর্মী

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন