‘যে রক্তের বানে ইতিহাস হোল লাল
এদেশ আমার এ ভাষা আমার,
এ নহে দাবী এ যে অধিকার।
... ... ...
আবার লড়িব আবার গড়িব
আবার ভাসিব রক্ত লোরে
ভাষা বাঁচাবার তরে।’
বাহান্নর ভাষা আন্দোলনের উপর রচিত এ পঙক্তিমালাই বলে দিচ্ছে মাতৃভাষার প্রশ্নে বাঙালির দৃপ্ত অঙ্গীকারের কথা। আজ মহান একুশে ফেব্রুয়ারি। ১৯৫২ সালের এই দিনে বিশ্বে এক নয়া ইতিহাস রচনা করেছিল আমাদের ছাত্র-যুবারা। মায়ের ভাষা প্রতিষ্ঠার জন্য অকাতরে বুকের তাজা তপ্ত রক্ত ঢেলে দেয়ার সে এক অনন্য গৌরবের ইতিহাস। মায়ের উপর আঘাত বা মায়ের প্রতি অবমাননা আর ভাষার প্রতি অবমাননা যে একই জিনিস এই সত্যটি বাঙালির চেতনায়, বাঙালির উপলব্ধিতে সুপ্ত আকারে বিদ্যমান ছিল হাজার বছর ধরে। আমাদের ভাষা হাজার বছরের পথ পরিক্রমণের মধ্য দিয়ে ফুলে-ফলে সুশোভিত হয়েছে ও হচ্ছে। এ ভাষায় বিশ্বসভায় গৌরবের দাবি করার মতো সাহিত্য রচিত হয়েছে অজস্র ধারায়। বহু মনীষী তাদের চিন্তা-চেতনার ঝাঁপি মেলে ধরেছেন এই ভাষাতে। এই ভারত উপমহাদেশ যুগে যুগে, কালে কালে কতই না বিদেশি শাসকদের পদাবনত হয়েছে। আর তাদের ভাষা-সংস্কৃতি এ দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। গ্রহণে-বর্জনে, আদানে-প্রদানে ভাষা ও সংস্কৃতি এগিয়ে গেছে আপন তালে। শক-হুন-মোগল-পাঠান-ইংরেজ এখানে এসেছে, শাসন করেছে, জয়ধ্বজা উড়িয়েছে। কিন্তু আমাদের ঐতিহ্য-সংস্কৃতি ও উন্নত চেতনার দ্বারা তারাও প্রভাবিত না হয়ে পারেনি। বাংলার সমৃদ্ধ অর্থনীতি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বণিকদেরকে আকৃষ্ট করেছে ও তারা বহু শতাব্দী আগে থেকেই ছুটে এসেছে এখানে। আমাদের ভাষার যে চেহারা আমরা চর্যাপদের মধ্যে দেখি এক সময়ের বিবর্তনে রূপান্তরিত হতে হতে আজ ইতিহাসের যে বাঁকে এসে দাঁড়িয়েছে তা এক দীর্ঘ পথপরিক্রমণের কথাই বলে দিচ্ছে। এই পথপরিক্রমার ক্ষেত্রে পদে পদে নানান প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির অপচেষ্টা যে হয়নি তা নয়, তবু আমরা বাংলা ভাষা-ভাষীরা সেগুলো অনায়াসে অতিক্রম করে গেছি ভাষার অন্তঃজ শক্তির কল্যাণে। বৌদ্ধ নাথদের গুপ্ত মন্ত্র আকারে উচ্চারিত পদগুলো আজ চর্যাপদ হিসেবে আমাদের ভাষার আদি ও অকৃত্রিম রূপটিকে মেলে ধরে আমাদের সামনে।
‘কা আ তরুবর পঞ্চ বি ডাল/চঞ্চল চিএ পৈঠাকাল’ কিংবা ‘দুলি দুহি পীড়া ধরন না যাই/ রুখের তেন্তুলি কুম্ভীরে খাই’ অথবা নগর বাহিরিরে ডোম্বী তোহোরি কুড়িআ/ ছোঁই ছোঁই যাওসি ব্রাহ্মণ নাড়িয়া’—চর্যার এই যে ভাষা এবং দার্শনিক তত্ত্বের প্রকাশভঙ্গি এর মধ্যে সুপ্ত ছিল বাংলা ভাষার বিরাট শক্তি ও সম্ভাবনা। সে সম্ভাবনাকে সর্বপ্রথম অন্তর দিয়ে যিনি ধরতে পেরেছিলেন তিনি বাংলা সাহিত্যাকাশের অন্যতম পুরোধা পুরুষ মাইকেল মধুসূদন দত্ত। তিনি ইংরেজি প্রীতিতে আকৈশোর আকণ্ঠ নিমজ্জিত থাকলেও কিংবা বাংলাকে ‘fishermens language’- বলে অভিহিত করলেও এর অন্তর্নিহিত শক্তি উপলব্ধি করতে দেরি হয়নি তার। কথায় বলে, ‘কবির আত্মা সেতো স্বপ্নদ্রষ্টা ঋষির আত্মা’। মধুসূদনের এই উপলব্ধি বোধের মধ্যে এই মনীষী বাক্যের প্রমাণ পাওয়া যায় বৈকি। তিনি যখন বন্ধু রাজনারায়ণ বসুকে লিখলেন, ‘Bengali is a fishermens language, it only requires men of genious to polish it up’. জেলেদের এই ভাষা প্রকৃত প্রতিভাধরদের পরিচর্যা পেলে সম্ভাবনার সিংহদ্বার খুলে যাবে এই বোধ মাইকেলের মাঝে এক ধরনের ঈমানী জোর তৈরি করেছিল। আর সে কারণেই আমরা তাকে আরেকটি পত্রে তার আত্মবিশ্বাস ও আত্মোপলব্ধির চেতনালব্ধ সহজ সত্যের সরল প্রকাশ ঘটাতে দেখি। এ পত্রে তিনি ঐ বন্ধু রাজনারায়ণকে লিখছেন, ‘you may take my word friend Raj, ‘I shall come out like a tremendous comet and no mistake’. আসলেই তো ইংরেজ কবি হতে চাওয়া মাইকেল বাংলা সাহিত্যাকাশে বিস্ময়কর ধূমকেতুরূপে আবির্ভূত হবার প্রত্যয় ঘোষণা করছেন এ কি বিশ্বাস করা যায়? হ্যাঁ যায়, যায় এ জন্য যে, মধুসূদন বাংলা ভাষার ভেতরকার সুপ্ত শক্তি, এর সৌকর্য ও লালিত্যকে তার আশ্চর্য দূরদর্শিতা দিয়ে লক্ষ্য করেছিলেন এমন এক সময়ে যখন কিনা বাংলা প্রকৃত অর্থেই এক দুর্বল গিদ্ধড়ের মতো অরণ্যে রোদন করে ফিরছিল। চর্যাপদের কাঁধে সওয়ার হয়ে যে ভাষার যাত্রারম্ভ সে ভাষা মধ্যযুগে মঙ্গলকাব্য, বৈষ্ণব পদাবলী, রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান ইত্যাদির মধ্য দিয়ে ধীর লয়ে বিকশিত হচ্ছিল বটে, কিন্তু এর ভেতরকার প্রবল প্রচণ্ড ও প্রমত্ত রূপ তাতে কখনই ফুটে ওঠেনি। কারণ ঐসব কাব্যে আমরা যে বিষয়বস্তু, এর প্রকাশভঙ্গি ও ভাষার সীমাবদ্ধতা লক্ষ্য করি তাতে সমুদ্রের কলমন্দ্রমুখর ধ্বনিগাম্ভীর্য এবং এর অতলস্পর্শী ব্যঞ্জনা আর রূপ সুষমা অনাবিষ্কৃতই থেকে গেছে। দেব-দেবীর কিংবা মানব-মানবীর প্রাত্যহিক জীবনের হাসি-কান্না, দুঃখ-সুখ, হিংসা-দ্বেষ ইত্যাদি এসব রচনায় ঠাঁই পেলেও ভাষার অমিত শক্তির প্রকাশ এখানে উহ্যই থেকে গেছে। পদাবলীর মধ্য দিয়ে জীবাত্মা ও পরমাত্মার মিলনের যে গাঁথা রচিত হয়েছে তার ভাব ও ভাষা যে মানবচিত্তে এক অসাধারণ দ্যোতনা সৃষ্টি করে একথা অস্বীকার করা যাবে না। ‘ঈ ভরা বাদর মাহ ভাদর শুন মন্দির মোর’—রাধার এই আকুতি কিংবা ‘জনম অবধি হাম রূপ নেহারলু নয়ন না তিরপিত ভেল/লাখ লাখ যুগ হিয়ে হিয়া রাখলু তবু হিয়ে জুড়নো না গেল’ এই আর্তি এক অদ্ভুত ব্যঞ্জনা ছড়ায় মানব মনে। রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং এই বৈষ্ণব গীতি ও এর ভাব-ভাষায় এতই মুগ্ধ ছিলেন যে, ভানু সিংহ ঠাকুর এই ভণিতা ব্যবহার করে নিজেই অনেক পদ রচনা করেছিলেন। ‘মরণ রে, তুঁহু মম শ্যাম সমান/মেঘবরণ তুঝ মেঘ জটাজুট, রক্ত কমলকর রক্ত অধরপুট/তাপ বিমোচন করুন কোর তব/মৃত্যু অমৃত করে দান’—রবীন্দ্রনাথের এই জাতীয় পদগুলিতে চন্ডীদাস, বিদ্যাপতি ও জ্ঞানদাসরাই যেন কথা কয়ে ওঠেন। ইংরেজ আগমনের মধ্য দিয়ে বাংলার সমাজ জীবনে যে আধুনিকতার সূত্রপাত ঘটে তা সাহিত্যাঙ্গনেও আছড়ে পড়ে বিদ্যাসাগর, মধুসূদন, বঙ্কিমচন্দ্র, হেমচন্দ্র, নবীন সেন, কালিপ্রসন্ন সিংহ, প্যারী চাঁদ মিত্র প্রমুখের সাহিত্য সাধনার মধ্য দিয়ে। এ আধুনিক জীবনবোধের উদ্গাতা হিসাবে কাব্যাঙ্গনে সবচাইতে সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করি মাইকেলের। বাংলা ভাষা যখন জলাবদ্ধতায় আবদ্ধ তখন আপন শক্তিতে নির্ভরশীল মাইকেল একা নিজে কোদাল হাতে যেন সে জলাবদ্ধতার অবসান ঘটাতে নামলেন। তিনি সেই জলাবদ্ধ অবস্থা থেকে বাংলা সাহিত্যকে মুক্তি দিলেন,—একটি নদী প্রবাহের সৃষ্টি করলেন যেন। মেঘনাদবধ, বীরাঙ্গনা বা তিলোত্তমা সম্ভব কাব্যের মধ্য দিয়ে অমিত্রাক্ষরের বান ডেকে নিয়ে এলেন তিনি। বহু বিদেশি ভাষা আয়ত্তে থাকায় এবং কবিরূপে আত্মপ্রতিষ্ঠার অদম্য স্পৃহা আর সেইসঙ্গে জন্মগতভাবেই এক্ষেত্রে বিপুল ক্ষমতার অধিকারী হওয়ায় এই অসাধ্য সাধন সম্ভব হোল তার পক্ষে। ‘কি কহিলি বাসন্তী, পর্বত গৃহ ছাড়ি/বাহিরায় যবে নদী সিন্ধুর উদ্দেশ্যে/কার হেন সাধ্য যে সে রোধে তার গতি/ দানব নন্দিনী আমি রক্ষকুল বধু/রাবণ শ্বশুর মম মেঘনাদ স্বামী/আমি কি ডরাই সখী ভিখারী রাঘবে?’। মেঘনাদ বধের এই ভাষা-গাম্ভীর্য এবং ছন্দের দোলা এক অভূতপূর্ব ও অভিনব ব্যঞ্জনা হয়ে দেখা দিল আমাদের সাহিত্যে। এই আধুনিকতার আগুন পরবর্তীতে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শরত্চন্দ্রসহ অসংখ্য প্রতিভাদীপ্ত ব্যক্তির হাতের ছোঁয়ায় সাহিত্যের সর্বাঙ্গনে ছড়িয়ে গেল।
মোটামুটিভাবে বাংলা সাহিত্য ও ভাষার এই হচ্ছে একেবারেই সংক্ষিপ্ত এক ইতিহাস। এই যে শক্তিধর ভাষা আমাদের তার বিরুদ্ধে সেই মধ্যযুগে বা আধুনিক যুগের কিছু আগে চক্রান্ত ও কূপমণ্ডুকতা কম দেখা যায়নি। আব্দুল হাকিম সে সময় লিখছেন, ‘যে জন বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী/সে জন কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি’। অর্থাত্ এ থেকে স্পষ্ট যে, বাঙলা ভাষার বিরুদ্ধে তখনও একশ্রেণীর কূপমণ্ডুক ও স্বার্থবাজ সক্রিয় ছিল। এরপর সাতচল্লিশের দেশ বিভাগ, আর এর কিছু আগে থেকে এতদঞ্চলের রাষ্ট্রভাষা কি হবে তা নিয়ে বিতর্কের জন্ম দেয়া হোল আর এক গভীর চক্রান্তকে সামনে রেখে। ৪৮-এ ঢাকার রেসেকার্সে জিন্নাহ সাহেবের ঘোষণা ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’ ঐ চক্রান্তেরই অংশ ছিল বৈকি! কিন্তু বাঙলা ভাষাভাষী মানুষেরা তাদের ভাষার শক্তি থেকে যে সাহস এবং মমত্ব বংশপরম্পরায় অর্জন করেছিল তা-ই রুখে দিল সে চক্রান্তকে। আমরা এরই ধারাক্রমে ‘৪৮ থেকে ‘৫২ পর্যন্ত মায়ের ভাষার মর্যাদা রক্ষার এক অনবদ্য সংগ্রাম গড়ে উঠতে দেখলাম মুসলিম অধ্যুষিত এই বাঙলায়। বাহান্নতে ছাত্র-যুবারা সংগ্রামের চূড়ান্ত পর্ব রচনা করল আত্মবলিদানের মধ্য দিয়ে। বিশ্বের প্রথম ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় বাহান্নর প্রেরণা থেকে উত্সারিত এতে সন্দেহ কী! দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পথ বেয়ে আমরা এতদঞ্চলের বাঙালিরা একাত্তরে এসে যে মোহনায় পৌঁছলাম তা এক নতুন মহিমায় জাতিকে উদ্ভাসিত করার ক্ষেত্রভূমিতে পরিণত হল। অসংখ্য কবি-সাহিত্যিক- বুদ্ধিজীবী- ছাত্র-যুবা-মেহনতী মানুষ ভাষা রক্ষার, স্বাজাত্য বোধ রক্ষার জন্য একাত্তরে যেভাবে গর্জে উঠল তা অগ্নিগর্ভ সূর্যসম্ভাবনার প্রতীক বৈ নয়। পাকিস্তান আমলে আমাদের ভাষার উপর যে আঘাতটি এলো তা কিন্তু শাসকদের এক বিকৃত মানসিকতা উদ্ভূত বিষয়। বাঙলা ভাষার সহজ স্বাভাবিক প্রবাহ রুদ্ধ করে এক কৃত্রিম বাঙলা ভাষা সৃষ্টির দুর্মতি কিছু কিছু বুদ্ধিজীবী ও শাসক গোষ্ঠীর পরামর্শদাতাকে পেয়ে বসেছিল তখন। তাই রবীন্দ্রনাথকে বর্জনের মতো হঠকারী সিদ্ধান্ত নিতেও সেদিন তারা কুণ্ঠিত হয়নি। হুমায়ুন আজাদের ভাষায় ‘রবীন্দ্রনাথই আমাদের সব।’ আর পাকিস্তানি শাসকরা এই সত্যকে উপেক্ষা করে এমন এক আজগুবী জাতিসত্তার উম্মেষ ঘটাতে চাইলো যা ইতিহাস সমর্থন করে না। ফলে জনতার ঝড় যখন এলো তখন তাদের তখতে তাউস ভেসে গেল দিগভ্রষ্ট তরণীর মতো। কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা বা গদ্যের উপর অস্ত্রোপচার চালানো তাদের ঐ হীন উদ্দেশ্য ও মানসিকতার এক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। নজরুল যেখানে লিখেছেন ‘মহাশ্মশান’ বা ‘ভগবান’ আমাদের এই তথাকথিত মুসলিম ভাষা নির্মাণের উদ্ভট চিন্তাবিদদের পরামর্শে তাকে ‘গোরস্থান’ ও ‘রহমান’ করা হোল। এ ধরনের খোদকারী জনগণ মানবে কেন? কেননা, এতো শুধু অবিমৃষ্যকারিতাই নয়, এ যে ঘোরতর চক্রান্ত! ভাষাকে মুসলমানী জেওর পরাবার এই হীন মানসিকতা কিংবা পরবর্তীকালে আরবী বা রোমান হরফে বাঙলা রচনার উদ্ভট সব আইডিয়া জনগণ দৃঢ়তার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেছে। আমাদের ভাষার ইতিহাস আছে, ব্যাকরণ আছে, অত্যন্ত উন্নত সাহিত্য আছে। অথচ এগুলিকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে মুসলিম অধ্যুষিত পূর্ব পাকিস্তানে ভাষাকেও সাম্প্রদায়িক করে তোলার অপচেষ্টা লক্ষণীয় হয়ে উঠল। ভাষা যে সাম্প্রদায়িক হয় না, মানব শিশুর প্রথম বোলই ফোটে তার মাতৃভাষায়, আর সেটাইতো স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের শাসকেরা সেই ভাষার স্বাভাবিক গতিধারায় প্রতিবন্ধকতা রচনা করে ব্যাঘাত সৃষ্টির যে আয়োজন করেছিল তা শুধু ভ্রান্তই ছিল না, ছিল ধ্বংসাত্মকও। ভাষাতো মাতৃদুগ্ধের মতো। সকল নবজাতকেরই তাতে অধিকার। এই ভূখণ্ডে যে কোন ধর্মাবলম্বীর পরিবারে যে শিশুটি জন্মলাভ করে বা করছে বাঙলা ভাষাতেই তার অধিকার। অর্থাত্, জন্মগতভাবেই সে বাঙালি এবং বাঙলা ভাষার উপর তার পূর্ণ অধিকার। সে হিন্দু না মুসলমান, বৌদ্ধ না খ্রীস্টান এসব বিষয়তো এক্ষেত্রে কোন বিবেচ্য বিষয়ই নয়। আমরা এ ধরনের চিরসত্য ও বাস্তব সত্যকে অস্বীকারের মাধ্যমে যে হীনমন্যতার পরিচয় দেই তা শুধু বেদনাদায়কই নয়, চরম অভব্যতা, অসভ্যতা ও অসংস্কৃত মানসিকতারই প্রকাশ মাত্র!
বাহান্নতে যে ভাষা আন্দোলন হয়েছিল তা কিন্তু নিছক কোন আবেগী বিষয় ছিল না। এর পেছনে আমাদের ইতিহাস ছিল, ঐতিহ্য ছিল। মানুষ এম্নিতেই আকস্মিকভাবে ঐ দুরাচারদের বিরুদ্ধে ক্ষেপে ওঠেনি বা কারও প্ররোচনায় তারা অন্দোলনে নামেনি। তারা ক্ষেপে উঠেছে, আন্দোলনে নেমেছে এই শাশ্বত সত্যকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য যে, বিনে স্বদেশি ভাষা, মেটে কি আশা। ’৪৭-’৭১ পর্বের পাকিস্তান রাষ্ট্রটি সর্ববিচারেই ছিল বাঙালিদের জন্য বৈরী। ধর্মের জিকির পেড়ে যারা বাঙালিত্বের মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করতে চেয়েছে সেদিন তারা মতলববাজ হতে পারে দেশপ্রেমিক নয়। দুনিয়াবি মতলবী স্বার্থে বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনা ও বাঙলা ভাষাকে তারা সহিংসভাবে আক্রমণ করতেও কুণ্ঠা বোধ করেনি কখনও।
যাহোক, ভাষা অন্দোলনের মাধ্যমে সর্বত্র বাংলা ভাষা চর্চার যে অঙ্গীকার করা হয়েছিল তা এখনও আমরা পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করতে পারিনি এটি নিশ্চয়ই কোন শ্লাঘার কথা নয়। মাতৃভাষা চর্চার ব্যাপারে এক ধরনের ঔদাসীন্য ও কান্ডজ্ঞানহীন কান্ডকারখানা দুঃখজনক। প্রচুর বইপত্রের প্রকাশনা আমরা প্রধানত: একুশে ফেব্রুয়ারিকে ঘিরে দেখি বটে তবে বইয়ের গুণগত মান সেখানে কতটা রক্ষা করা হয় সেগুলো নিয়ে গভীরভাবে ভাবনা ও পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন। গবেষণা এবং ভাষার প্রতি মমত্ত্ববোধ সৃষ্টির জন্য সরকারি এবং বেসরকারি বহুমুখী উদ্যোগের দরকার, যা কিনা শুধু ব্যবসায়ী মানসিকতা হতে উত্সারিত হলে চলবে না। চিন্তাবিদ ও সমাজতত্ত্ববিদদের এসব বিষয়ে আন্তরিকভাবে ভাবতে হবে। বিশ্বায়নের এ যুগে মাতৃভাষার প্রয়োজনীয়তা হারিয়ে যাচ্ছে বা যাবে এমন কথা যারা বলেন তারা বাস্তবের জমিনে পা রাখেন বলে মনে হয় না। বাঙলা ভাষা আমাদের অহংকার,-এর মধ্যে রয়েছে আমাদের অমিত তেজ ফুটিয়ে তোলার শক্তি। সুতরাং, একুশে ফেব্রুয়ারিকে শুধু আনুষ্ঠানিক আড়ম্বতার ঘেরা টোপে বন্দী না রেখে নবীন প্রজন্মকে বাঙলা ভাষার গৌরব, সৌকর্য্য, লালিত্য ও এর অবারিত সৌন্দর্য উপভোগের জন্য অনুপ্রাণিত করতে হবে। মনে রাখতে হবে যে, মাতৃভাষার আবেদন আবাহন নিয়ত। বরকত, সালাম, রফিক, জব্বার ভাষা রক্ষার জন্য আত্মদানের মধ্য দিয়ে আমাদেরকে যে মহিমায় উচ্চকিত করে দিয়ে গেছেন তা বাঙালির জন্য গর্ব ও প্রেরণার উত্সভূমি হয়ে রয়েছে ও রইবে চিরকাল।
লেখক : সাংবাদিক
