স্মরণ

প্রিয় আবিদ রহমান, আমার স্মৃতির কী বোর্ডে ডিলিট বাটন নেই

আপডেট : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২১:১৮
তিন দিন হয়ে গেল অস্ট্রেলিয়ায় এসেছি। এখনো কাঙ্ক্ষিত ফোনটা আসেনি। ভীষণ অস্বস্তিতে আছি। প্রতিদিন না হোক তিন দিনে অন্তত একবার কথা হওয়া জরুরি। একবার ব্যস্ততার কারণে বেশ কিছুদিন কথা হয়নি। তখনি উপলব্ধি করলাম, তিনদিন কথা না হলেই বুকের ভেতর কথার পাহাড় জমে যায়। আমি বলেছিলামও তাকে সেই কথা। তিনি বোধ হয় তা ভুলে গেছেন। নইলে এইভাবে হুট করে আর কোনদিন ফোন না করার শর্তে কেউ কি চলে যায়? আর কোনদিন আবিদ রহমান মেলবোর্ন থেকে আন্তরিক গলায় ফোন করে বলবেন না ‘ডা. মিল্টন...’। তার নামের সাথে আমার অনেক আগে থেকেই পরিচয়। সেই যে বিচিন্তার নির্বাহী সম্পাদক আবিদ রহমান। ছয় বছর আগে বর্তমানের অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী সাংবাদিক ফজলুল বারীকে নিয়ে মেলবোর্নে গিয়েছিলাম। পরিচয় হল বারী ভাইয়ের পূর্ব পরিচিত আবিদ রহমানের সাথে। সেই পরিচয় গাঢ়তর হলো তখন থেকেই, অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই তিনি আবার লেখালেখি শুরু করলেন। আমরা একসাথে সিডনির প্রথম অনলাইন পত্রিকা বাসভূমিতে লিখেছি। লিখেছি বাংলাদেশের কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে, ওয়েব সাইটে। আশির দশকের উজ্জ্বল তারুণ্যের প্রতিনিধি ছিলেন সাংবাদিক, কবি, কলামিস্ট ও নাটকের মানুষ আবিদ রহমান। ঈর্ষণীয় বন্ধুভাগ্যের অধিকারী ছিলেন তিনি। প্রবাসে থাকাকালীন প্রায়শই স্মৃতিকাতর হয়ে যেতেন। ফোনালাপের সময় মাঝেমধ্যে তাই ফিরে যেতেন আশির দশকে। কত গল্প যে জমা ছিল তার ভাণ্ডারে! কত স্মৃতি! আর কী অকপট সব স্বীকারোক্তি তার! কোথাও কোন রাখঢাক নেই। সামান্য এই জীবন তার ঋদ্ধ হয়েছে দুর্লভ-অসামান্য সব অভিজ্ঞতায়! আমি মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনতাম। যে কোন আড্ডায় অনায়াসে মধ্যমণি বনে যেতে পারতেন। আর পারতেন বন্ধুর বিপদে পেতে দিতে বিশাল প্রান্তরের মত বিস্তৃত বুকটা। মানুষের জন্য কী ব্যাপক মমতাই না পুষে রাখতেন বুকে! প্রবাসে থেকে শত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও অনেক কিছু করতে চাইতেন আবিদ রহমান। তারই ধারাবাহিকতায় গত বছর হঠাত্ একদিন মেলবোর্ন থেকে ঢাকায়, দৈনিক আমাদের অর্থনীতির ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্ব নিলেন। জুন মাসে দেশে বেড়াতে এসে পড়লাম মহা ফাপরে। দুপুর নেই, রাত নেই, আবিদ ভাইয়ের ফোন। পত্রিকার জন্য লেখা চাই। অনুরোধের ঢেঁকি গিলে প্রায় নিয়মিতই লেখা শুরু করলাম। অধিক লেখায় যা হয়, দুয়েকট লেখার মান ভালো হল না। সরাসরি জানিয়ে দিলেন, ‘আপনার লেখা আমি না পড়েই কম্পোজে পাঠাই। আপনার ওই লেখাগুলো আরো ভাল হতে পারতো।’ সেই সাথে কিছু পরামর্শ। ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক আবিদ রহমান ঢাকায় অসুস্থ হলেন। লক্ষণ দেখে সুবিধার মনে হল না। বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডা. মোশাররফ হোসেনের কাছে পাঠালাম। প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে ডাক্তারের কপালে ভাঁজ। জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে ভর্তি হতে বললেন। তিনি ভর্তি হলেন না। তবে মাঝেমধ্যেই বলতেন শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। অসুস্থতা নিয়ে আলোচনা তিনি পছন্দ করতেন না। বেশি জোরাজুরি করলে বলতেন, ‘কী আর হবে? মরেই তো যাবো’। সেই সাথে হাসতে হাসতে বলতেন, ‘মরে গেলে দুকলম লিখেন ভাই’। আবিদ রহমানের মৃত্যু মেনে নে্ওয়া কষ্টকর। একজন চিকিত্সক হিসেবে আমার কষ্টটা তাই একটু বেশিই। ঢাকা থেকে মেলবোর্ন ফিরলেন, জরুরি ভিত্তিতে অ্যানজিওগ্রাম করা হল, হুদপিণ্ডে চারটে ব্লক। তাত্ক্ষণিকভাবে বাইপাস অপারশেনের কথা বললেন ডাক্তার। তিনি রাজি হলেন না। আমি আর শুভ ভাই মিলে অনেক বোঝালাম, তার আত্মীয়-স্বজনরাও বললেন। অবশেষে তিনি রাজি হলেন ঠিকই, ততদিনে বেশ দেরি হয়ে গেছে। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে নেই। গত ২৫ জানুয়ারি মেলবোর্ণ থেকে এসএমএস করে জানালেন, ‘বউয়ের মিষ্টি রান্না খেয়ে সুগার লেভেল হাই এবং আনস্টাবল। ইনসুলিন নিচ্ছি দিনে দুইবার। সুগার স্টাবল হলেই সার্জারি’। দুর্ভাগ্য আমাদের! সেই ডায়াবেটিস আর স্টাবল হল না। তার আগেই, গত ১১ ফেব্রুয়ারি বিকেলে মেলবোর্নে আকস্মিক বুকে ব্যথায় ঢলে পড়লেন মৃত্যুর কোলে। আবিদ ভাই তার একটি কবিতার জন্য আমার ভ্রমণ কাহিনী ‘সবুজ পাসপোর্ট’ থেকে একটি বাক্য ধার চেয়েছিলেন। আমি সানন্দে ‘কবির স্মৃতির কী বোর্ডে ডিলিট বাটন নাই’ বাক্যটি তাকে ধার দিয়েছিলাম। তার অকাল প্রয়াণে বাক্যটি আজ বারবার মনে পড়ছে। যেখানেই থাকবেন ভালো থাকবেন বস, প্রিয় আবিদ রহমান। আমার স্মৃতির কী বোর্ডে ডিলিট বাটন নাই। আমি, আমরা আপনাকে মনে রাখবো দীর্ঘকাল। বিদায় প্রিয় কবি। লেখক :কবি ও চিকিত্সক, অস্ট্রেলিয়াস্থ নিউক্যাসেল ইউনির্ভাসিটিতে অধ্যাপনারত