এ প্রজন্মের তরুণদেরকে জানাই অভিনন্দন

আপডেট : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২১:৩২
‘ফাঁসি চাই ফাঁসি চাই'। বজ্রকণ্ঠে গগনবিদারী শ্লোগানে প্রকম্পিত হচ্ছে শাহবাগের প্রজন্ম চত্বর। বিগত দুই সপ্তাহের গণজাগরণের মাধ্যমে ১২ ফেব্রুয়ারি দেশের আমজনতা পালন করছে বিকাল ৪টা হতে ৩ মিনিটের জন্য নিঃশব্দ-নিষ্কর্ম দণ্ডায়মান ৩ মিনিটের সারা বাংলায় পালিত হয়েছে নিস্তব্ধ দিবস। ’৭১-এর রণাঙ্গনে যারা জীবনবাজি রেখে একটি শক্তিধর দেশের শক্তিশালী সেনাবাহিনীকে যুদ্ধের মাধ্যমে এ দেশের স্বাধীনতা এনে দিয়েছে তারই ফসল আজকের এ “প্রজন্ম চত্বর” এবং প্রজন্মের গণজাগরণ। এ জাগরণে দেশের প্রধানমন্ত্রীও বলতে বাধ্য হয়েছেন যে, তার মনও ছোটে যায় সেই গণজাগরণের উত্তাল ঢেউয়ের মাঝে। তখনকার ’৬৯-এর ছাত্র, গণঅভ্যুত্থানের বজ্রকণ্ঠী নায়ক আজকের প্রবীণ রাজনীতিবিদ তোফায়েল আহমেদ এ গণজাগরণের জোয়ারকে এভাবে দেখতে পেয়ে তিনি ভাষাহীনভাবে আনন্দ প্রকাশ করেছেন। আসলে দেশের বিবেকবান লোকদের, বিবেকবান দেশপ্রেমিকদের এবং বিবেকবান রাজনীতিবিদদের স্বাধীনতার দীর্ঘ ৪২ বছরে পা দেয়ার পরেও কারো কোন সঠিক বিচারের, সঠিক পদক্ষেপ নেয়া হয়নি, সময়ের বিচার সময়ে করেনি। আজ তারই বিস্ফোরণ ঘটেছে সেই শাহবাগের “প্রজন্ম চত্বরে”। এখানে একটু না বললেই নয়, ’৭১-এ আমরা যারা মাতৃভূমি রক্ষা করতে জীবনবাজি রেখে যার যার অবস্থান থেকে মহান মুক্তিযুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলাম তাদের মধ্যে অনেকেই পরলোক গমন করেছেন। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় দেশদ্রোহিতাদের, মাতৃভূমি বিরোধিতাদের, মা-বোনের ইজ্জত লুটকারীদের বিচার দেখে যেতে পারেননি সেই দেশগর্বিত মুক্তিযোদ্ধা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তানেরা। যাদের বিনিময়ে আজ এ বাংলার মাটিতে ১৬ কোটি মানব, এ সোনার বাংলার সকল সুবিধা ভোগ করছে। এ দুঃখ কাকে বলব? কাকে শোনাব? কাকে লিখব? সবই যেন মুখ থুবড়ে পড়েছে। আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এ দেশের বেঁচে থাকা মানুষের বিশেষ করে ৬০ হতে ৮০ বছরের প্রত্যেক মুক্তিযোদ্ধা ভাইদেরকে, সুশীল সমাজের বুদ্ধিজীবীদের, প্রত্যেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমনকি প্রাথমিক স্কুলশিক্ষক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের পর্যন্ত বলতে চাই, আপনারা আজ যে যেখানে আছেন গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করে, বুকে হাত রেখে ভেবে দেখুন, আপনারা কেউ এখনও সেই মহান ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগের মর্যাদা কতটুকু রক্ষা করেছেন। আমাদের ’৭১-এর স্বাধিকার রক্ষায় মাঠের জানা-অজানা লাখ লাখ শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মার শান্তির বিচারটুকু আজও করা হয়নি এবং করতে পারিনি । আপনারা যে যাই মনে করেন না কেন এ দেশের মানুষ ক্ষমতালাভের বিষয়টাকে বড় করে দেখছেন। এ দেশের প্রতিজনকে বলব বিশেষ করে রাজনীতিতে যারা বলিষ্ঠ ভূমিকা নিয়ে জীবন অতিবাহিত করছেন এখনো সময় আছে দেশ ও জাতির জন্য ভাবুন। দেশ ও জাতির জন্য রাজনীতি করুন। আর কত? একটি দেশ স্বাবলম্বী, স্বনির্ভর হতে ৪২ বছর অবশ্যই লাগে না, অবশ্যই না। তার জাজ্বল্য একটি প্রমাণ দক্ষিণ কোরিয়া নামের দেশটি, মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সকল দেশে তারা ছোট থেকে মধ্যম আকারের ঠিকাদার হিসাবে কাজ শুরু করে এবং পাশাপাশি তারা তাদের দেশ থেকে কোরিয়ান জনবল, শ্রমিক থেকে শুরু করে সব ধরনের নির্মাণ কাজের কর্মীবাহিনী নিয়ে প্রবল জোরে কাজ করেন। সেই জাতি এবং দেশ ১৯৭৫ হতে ১৯৮৫-এর মধ্যে ভাল অবস্থানে দাঁড়িয়ে গেছে। দুঃখের বিষয়, তাদের দেশের লোক, শ্রমিক আরও অনেক পূর্ব থেকেই নিজ দেশে স্বয়ংসম্পূর্ণ। তাদের দেশে আমার সোনার বাংলার মানবসম্পদ রফতানী হয় বহু লাখ টাকার বিনিময়ে। কেন আজ আমাদের এই চরম ব্যর্থতা? তার মূল ব্যর্থতা রাজনীতির আদর্শের ব্যর্থতা। দেশ ও জাতির মূল্যায়নের ব্যর্থতা, সবাই মিলে দেশের কথা ভাবি ষোল আনা স্বার্থটাকে অত্যন্ত বেশির ভাগটা দেশ ও জাতির মধ্যে বিলিয়ে দিতে চেষ্টা করি, তবেই হবে একাত্তর-এর শহীদদের আত্মার শান্তি। লেখক : বীর মুক্তিযোদ্ধা

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন