নাব্যতা সংকট ও খাল খননের প্রাসঙ্গিকতা

আপডেট : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২০:২৯
নদীমাতৃক বাংলাদেশে যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনের প্রধান মাধ্যম ছিল নৌপথ। সেই কারণেই নদীর পাড়ে পাড়ে গড়িয়া উঠে ব্যবসায়িক মোকাম, পত্তন ঘটে শহরের। এই দেশের প্রায় প্রতিটি বড় শহরই কোনো না কোনো নদীর তীরে। প্রমত্তা নদীর কূলে যেমন, তেমনই শাখা ও উপ-নদীর পাড়েও গড়িয়া উঠিয়াছে নগর-বন্দর। সেইসব শহর ও বন্দর, মোকাম এখনও আছে। কিন্তু নেই পরিবহনের ঐতিহ্য, বিলীন হইয়া গিয়াছে প্রায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ‘নাই’ হইয়া গিয়াছে নদীপথ। বড় নদীর সাথেই যেমন ছিল বহু বিচিত্র মনোহর নামের শাখা ও উপ-নদীর সংযোগ, তেমনই ছিল অসংখ্য খাল, হাওর, বাঁওড়, বিল-ঝিল। খাল ও বিলের সাথেও নদীর যোগ ছিল। সরকারি হিসাবে বাংলাদেশে এখনও নদীর সংখ্যা সাতশত। কিন্তু জানা যায়, অতীতে আমাদের ছোট-বড় মিলাইয়া নদী ছিল আরও অনেক বেশি। এখনও এই দেশে অশ্রেণিকৃত রুটসহ নৌপথের দৈর্ঘ প্রায় তের হাজার কিলোমিটার। এরমধ্যে বর্ষাকালে ৮,৪৩৩ কিলোমিটার নদীপথে বড় নৌযান চলিতে পারে। এই আট সহস্রাধিক নৌপথের মধ্যে ৫,৯৬৮ কিলোমিটার পথ নৌ পরিবহনের জন্য শ্রেণিকৃত অর্থাত্ সরকারিভাবে স্বীকৃত। শুষ্ক মৌসুমে ৪,৮০০ কিলোমিটার নৌপথ হ্রাস পায়। নৌ চলাচলের আর যোগ্য থাকে না। দিন যত যাইতেছে নৌপথের দৈর্ঘ ততই কমিয়া আসিতেছে। বর্ষা মৌসুম চলিয়া যাইবার পর পত্র-পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয় নাব্যতা সংকটের। গত বুধবার দৈনিক ইত্তেফাকে রিপোর্ট ছাপা হইয়াছে, নাব্যতা সংকটে বন্ধ খুলনা অঞ্চলের ৩০ নৌপথ। প্রকাশিত খবরে বলা হয়, খুলনা বিভাগে নৌপথের দৈর্ঘ্য ছিল ১ হাজার ১৮৪ কিলোমিটার। কিন্তু পলি জমিয়া এবং চর পড়িয়া ৪৯১ কিলোমিটার নৌপথ ইতিমধ্যে বন্ধ হইয়া গিয়াছে। কোনোমতে বাঁচিয়া থাকা ৬৯৩ কিলোমিটার নৌপথেও নৌযানের সংখ্যা কম। কেননা এই নৌপথও নির্বিঘ্ন নহে। স্থানে স্থানে জাগিয়া উঠিয়াছে ডুবোচর। খুলনা অঞ্চলের নৌপথ দিয়া দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে যাত্রী ও মালামাল পরিবহন করা হইয়া থাকে। নৌপথ বন্ধ হইয়া যাওয়া কিংবা বিঘ্নসংকুল হইয়া পড়ায় পরিবহন কার্যে সড়কপথের ব্যবহার বাড়িয়াছে। বলাবাহুল্য, নৌপথের তুলনায় সড়কপথে যাত্রী কিংবা মালামাল পরিবহন উভয়ই অধিক ব্যয়সাধ্য। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অনেক ঘুরিয়া গন্তব্যে পৌঁছাইতে হয়। পরিবহন ব্যয় বাড়িয়া যাইবার কারণে বোধগম্য কারণেই পণ্যের দাম বাড়ে। চাপ পড়ে ভোক্তাসাধারণের উপর। এই অবস্থা যে শুধু খুলনা বিভাগের তাহা নহে। সিলেটের নদীগুলিও নাব্যতা সংকটের শিকার। ইতিমধ্যে শুকাইয়া গিয়াছে বহু নদী। প্রায় বারশত কিলোমিটার নৌপথ সংকটাপন্ন। বরিশাল বিভাগেও একই অবস্থা। ঢাকার চারপাশের নদীগুলির অবস্থাও সংকটাপন্ন। নদী, খাল ও বিল শুকাইয়া যাওয়ায় শুধু নৌ পরিবহনে নয়, সেচকার্যও বিঘ্নিত হইতেছে। নদী ও খাল হইতে পাওয়ার পাম্পের সাহায্যে পানি তুলিয়া যেইসব এলাকার কৃষিজমিতে সেচ দেওয়া হইত, সেইসব এলাকাতেও এখন বসান হইয়াছে গভীর নলকূপ। কারণ নদীতে পানি নাই। ডিপ টিউবওয়েলের সাহায্যে মাটির গভীর স্তর হইতে পানি তুলিয়া সেচ বাড়িয়া যাওয়ায় দেখা দিতেছে পরিবেশ-প্রতিবেশের সমস্যা। পানির স্তর নামিয়া যাইতেছে। দেখা দিতেছে আর্সেনিক দূষণ। প্রশ্ন হইল, বিপর্যয়কর এই অবস্থার প্রতিকার কী। সরকার ক্যাপিটেল ড্রেজিং-এর মহাপরিকল্পনা ঘোষণা করিয়াছিল। কিন্তু সেই পরিকল্পনা শুধু কল্পনা হইয়া রহিয়াছে। উহা বিপুল ব্যয়সাপেক্ষও বটে। এমতাবস্থায় খাল খননের মাধ্যমে পরিস্থিতির অনেকটাই উন্নতি সাধন সম্ভব বলিয়া মনে করেন তথ্যাভিজ্ঞমহল। সত্তরের দশকে খাল খনন কর্মসূচির মাধ্যমে হাজিয়া-মজিয়া যাওয়া অনেক ছোট নদী ও খালের পুনর্জীবন দান সম্ভবপর হইয়া ছিল। অনেকক্ষেত্রে ভাঙ্গন রোধ করিতে পারা গিয়াছিল। কিন্তু, সেই কর্মযজ্ঞের ধারাবাহিকতা রক্ষিত হয় নাই। খাল খনন কর্মসূচি আবারও চালু করা যাইতে পারে। কাজের বিনিময়ে খাদ্য, কর্মসৃজন প্রকল্প ইত্যাদি খাতে যেইসব সাহায্য-সহযোগিতা কর্মসূচিমূলক রহিয়াছে, সেইসব ব্যবহার করা যাইতে পারে খাল খননের কাজে। বিষয়টি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনায় আনিতে হইবে। হাজিয়া-মজিয়া যাওয়া খাল, ছোট ছোট শাখা ও উপনদী খনন করা হইলে দেশের চারটি প্রধান নদী প্রণালিতে তাহার প্রভাব পড়িবে। বর্ষা মৌসুমে উপনদী ও খালের মাধ্যমে জনপদের বৃষ্টির পানি আসিয়া পড়িবে বৃহত্ নদীসমূহে। ফলে ওইসব নদীতে পানির ধারা বেগবান হইবে। ইহাতে নদ-নদীর নাব্যতা সংকট অনেকটাই তিরোহিত হইতে পারে। বিষয়টির প্রতি আমরা সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করি।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন