এক সময় বাংলাদেশের পরিচিতি ছিল প্রাকৃতিক দুর্যোগপূর্ণ অর্ধাহার অনাহার কবলিত বিধ্বস্ত অর্থনৈতিক কাঠামোর একটি দরিদ্র দেশ হিসাবে। এখন বাংলাদেশের বর্তমান সাফল্য দেখে বিশ্ববাসী বিস্মিত হয়। আর্থসামাজিক অগ্রগতির পথে দৃঢ় পদক্ষেপে এগুচ্ছে বাংলাদেশ, যা একটু লক্ষ্য করলেই চোখে ধরা পড়ে। বর্তমানে ৬ শতাংশেরও বেশি হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করে চলেছে এ দেশ। দারিদ্র্যের হার ৩০ শতাংশেরও নিচে নেমে এসেছে। কৃষিপ্রধান দেশ হলেও এক সময় বাংলাদেশ খাদ্য উত্পাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল না। অথচ খাদ্য উত্পাদন এখন প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ দেশ এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। অথচ জনসংখ্যা বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। মাথাপিছু আয় বেড়েছে চারগুণ। দেশের বর্তমান মাথাপিছু আয় প্রায় ৮০০ ডলার। বাংলাদেশের অর্থনীতি ও এর সামাজিক রূপান্তর ঈর্ষণীয় সাফল্যের দাবি রাখে। এর কারণ কৃষিতে বৈপ্লবিক সংস্কার ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি, কৃষকের কঠোর পরিশ্রম, সরকারের অত্যন্ত উদারহস্ত ভর্তুকিমূল্যে বীজ, সার, কৃষিঋণ বিতরণ, এছাড়া সরকারের যথাসময়ে যথোপযুক্ত পদক্ষেপ নেয়া অর্থাত্ গ্রামে গ্রামে কৃষিতে সেচের জন্য অব্যাহত বিদ্যুত্ সরবরাহ করার ফলে খাদ্য উত্পাদন প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। জমির পরিমাণ কমেছে কিন্তু বেড়েছে উদ্যোগ, পরিশ্রম ও জমির উত্পাদনশীলতা। মানুষ তার আপন/ নিজ ভাগ্যের কারিগর। নিজের ভাগ্যকে সে নিজেই নির্মাণ করতে পারে। তার ভাগ্য নির্মাণের হাতিয়ার হলো তার পরিশ্রম। প্রত্যেক মানুষের মধ্যে আছে সুপ্ত প্রতিভা। পরিশ্রমের দ্বারাই সেই সুপ্ত প্রতিভার জাগরণ ঘটতে পারে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কৃষিখাতের উত্পাদন, তৈরি পোশাক রপ্তানি ও প্রবাসীদের প্রেরিত রেমিটেন্স—যার পেছনে রয়েছে এ দেশের কৃষক, মেহনতী ও শ্রমজীবী মানুষের অবদান। অনেক সীমাবদ্ধতা সত্ত্ব্বেও বাংলাদেশের সম্ভাবনার খাত ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে সারা দেশজুড়ে। এখন প্রয়োজন শুধু পরিচর্যার। বিশ্বব্যাংকের মতে, ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার সব ধরনের সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশে।
বৈদেশিক বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে মার্কিন সংস্থা গোল্ডম্যান স্যাক্স, ব্রিকস (ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা) এর উত্তরসূরি হিসাবে ১১টি দেশের একটি তালিকা তৈরি করেছে। এদের নাম দেয়া হয়েছে নেক্সট ইলেভেন। এই উদীয়মান ১১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। সংস্থাটি বলেছে বাংলাদেশে রয়েছে প্রচুর সংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠী। এদের মাধ্যমে ভবিষ্যত্ বদলে দেয়া সম্ভব। কর্মময় এই পৃথিবীতে ঘুমিয়ে জীবন কাটালে চলবে না। যে ঘুমিয়ে জীবন কাটালো পৃথিবীকে তার জানা হলো না। আত্ম স্বরূপের উপলব্ধি ঘটলো না। কথায় আছে-A Sleeping fox catches no poultry. যে ঘুমিয়ে থাকে তার ভাগ্যও থাকে ঘুমিয়ে। সুপ্ত মানবের ভাগ্যও থাকে সুপ্ত। তাই আত্মশক্তিতে উদ্বুদ্ধ হয়ে সকল মানবকে আপন ভাগ্য তথা দেশের ভাগ্য রচনায় ব্রতী হতে হবে। বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম এটি বুঝতে শিখেছে। তারপরও তাদের আমার বলতে ইচ্ছে হচ্ছে, হে তরুণ প্রজন্ম, শোন, জীবনের পথ দুর্গম, অন্তহীন। সেই দুর্গমতাকে পদদলিত করে সৌভাগ্যলক্ষ্মীর বিজয়মাল্য জয় করে/ ছিনিয়ে আনবে এই তোমরাই-তরুণ প্রজন্ম, এ আমার বিশ্বাস। বিশ্ব মানচিত্রে তোমরাই বাংলাদেশকে নিয়ে যাবে সর্বোচ্চ আসনে।
অপার সম্ভাবনার দেশ বাংলাদেশ। যার সাফল্য নির্ভর করছে পুরো জাতির ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার উপর। সমাজ, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে নারীর ক্রমবর্ধমান পদচারণা, তরুণ প্রজন্মের দেশপ্রেম ও প্রযুক্তিনির্ভর হবার আগ্রহসহ নানা ইতিবাচক বৈশিষ্ট্য বাংলাদেশের এগিয়ে চলার পথকে দিন দিন উজ্জ্বলতর করে তুলছে। তাই আমাদের সকলের উচিত নিজেদেরকে সত্, দক্ষ ও দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসাবে গড়ে তোলা। তাহলেই লাখো শহীদের জীবনের বিনিময়ে পাওয়া এই সোনার বাংলাদেশ বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।
লেখক: ব্যাংকার
