কোহিনুর হীরা ও ক্যামেরনের মন্তব্য

আপডেট : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২১:৩৫
ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন তিন দিনের ভারত সফর শেষ করিয়া দেশে ফিরিয়া গিয়াছেন। কিন্তু ভারত সফরে আসিয়া তাঁহার দুইটি মন্তব্যকে ঘিরিয়া সর্বত্র আলোচনার রেশ এখনো ফুরাইতেছে না। প্রথমত তিনি জালিনাওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের জন্য দুঃখ প্রকাশ না করিলেও ইহাকে চরম লজ্জাজনক বলিয়া অভিহিত করেন। এই ভয়াবহ ও নৃশংস হত্যাকান্ডটি সংঘটিত হইয়াছিল পাঞ্জাবের অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগে ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিলে। ব্রিটিশ আর্মির গুলিতে হতাহতের সংখ্যা ছিল দেড় সহস্রাধিক। তবে এই সফরে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি ইহাও বলেন যে, ১০৫ ক্যারেট ওজনের কোহিনুর হীরাটি ফেরত দেওয়া হইবে না। ঔপনিবেশিক আমলে ভারত হইতে এই মূল্যবান সম্পদটি ব্রিটেনে লইয়া যাওয়া হয়। ১৮৫০ সালে ভারতে নিযুক্ত তত্কালীন ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেল রানি ভিক্টোরিয়াকে এই হীরাটি উপহার দেন। বহুদিন ধরিয়া ইহা রানি এলিজাবেথের মুকুটে শোভা পাইতেছিল। তবে হীরাটি বর্তমানে টাওয়ার অব লন্ডনে রাখা হইয়াছে। এই হিরাটি আসলে অনেক কথা বলে। বিশ্বের বড় হীরাগুলির অন্যতম এই কোহিনূর। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা মহাত্মা গান্ধির নাতিসহ ভারতের অনেক ব্যক্তিত্ব বিভিন্ন সময় এই হীরাটি ফেরত আনার দাবি তুলিয়াছেন। ১৯৯৭ সালে ভারতের স্বাধীনতার ৫০ বত্সর পূর্তি উদযাপনের সময় রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ ভারত সফরে আসিলে একই দাবি উত্থাপন করা হয়। কিন্তু তাহা বড় কথা নয়। আসলে একটি হীরা ঔপনিবেশিক শোষণের প্রতীকে পরিণত হইয়াছে। আমরা জানি, ১৭৫৭ সালে পলাশির আম্র কাননে নবাব সিরাজ উদ্দৌলার পরাজয়ের পর ধূর্ত লর্ড ক্লাইভের নেতৃত্বে ইংরেজরা প্রথমে বাংলার ও পরে গোটা ভারতের শাসনক্ষমতা ছিনাইয়া নেয়। ব্যবসা-বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে আসা ইংরেজরা এতদঞ্চলের জাতিভেদ, অরক্ষিত সমুদ্র ও নৌসীমা এবং রাজ পরিবারের কলহ ও অন্তর্দ্বন্দ্বের সুযোগ গ্রহণ করিয়া ক্ষমতায় আরোহণ করে। ইহার পর কী পরিমাণ লুটপাট চলে, তাহা বলিয়া শেষ করা যাইবে না। ক্লাইভের আত্মজীবনীতে প্রকারান্তরে ইহার প্রমাণ রহিয়াছে। তিনি যখন কয়েকটি নৌকায় ভর্তি করিয়া ভারতবর্ষের সোনাদানা, মণিমুক্তা ও অন্যান্য সম্পদ ব্রিটেনে পাচার করিতেছিলেন, তখন এ দেশের কোন মানুষ সামান্যতম প্রতিবাদ করে নাই, যাহা তাহাকে বিস্মিত করে। সাধারণ মানুষ একটি করিয়া ঢিল ছুঁড়িলেও ইহা সম্ভব ছিল না। কিন্তু দীর্ঘদিনের পরাধীনতার কারণে তাহাদের মধ্যে প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতার চেতনাই ঠিকমত কাজ করে নাই। ভারতবাসীর কোহিনুর ফেরত চাওয়ার পর ক্যামেরন বলিয়াছেন যে, ইহা ফিরাইয়া দেওয়া ঠিক হইবে বলিয়া তিনি মনে করেন না। তাহার মতে, অতীতের চাইতে বর্তমানকেই গুরুত্ব দেওয়া উচিত। কিন্তু মনে রাখিতে হইবে, ধনে-মানে-বলে আগের ভারত আর নাই। যথেষ্ট শক্তি ও সাহস অর্জন করিয়াছে। অন্যদিকে গোটা ইউরোপেরই এখন ত্রাহি অবস্থা। বিশ্বে ব্রিটেনের প্রভাব কমার পাশাপাশি লন্ডন দাঙ্গা, জাতীয় নির্বাচন নিয়া অনিশ্চয়তা ইত্যাদি কারণে কেহ কেহ ব্রিটেনকে তৃতীয় বিশ্বের সহিত তুলনা করিতেছেন। তাহাছাড়া স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার দাবিতে ব্রিটেন আছে বেকায়দায়। শুধু ভারতই নহে, এখন গ্রিসও এলগিন মার্বেলস ভাস্কর্য ফেরত চাহিতেছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হইতেছে, ঔপনিবেশিকতার জোরে শোষণ করিয়াও রক্ষা নাই। কোন না কোন সময় এজন্য প্রশ্নের মুখোমুখি হইতে হয়, জবাবদিহি করিতে হয়। তবে ক্যামেরন যখন বলিয়াছেন ফেরত দেওয়া হইবে না, তখন বুঝিতে হইবে সেই শক্তিও ব্রিটেনের আছে। আর ভারত সরকারও এখন এ ব্যাপারে কিছুই বলিতেছে না। তবে একদিন বাংলাদেশও যদি হারানো কোন সম্পদ ফেরত পাওয়ার দাবি করে, তাহা হইলে বিস্মিত হইবার কিছুই থাকিবে না।