স্মরণ

আহমদ শরীফ স্মরণে

আপডেট : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২১:৩৬
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের গবেষক ড. আহমদ শরীফ চট্টগ্রামের পটিয়ার সুচক্রদণ্ডী গ্রামে ১৯২১ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। বাংলাদেশের জ্ঞানমনীষা ও পাণ্ডিত্যের জগতে আহমদ শরীফ মহীরুহসদৃশ ব্যক্তিত্ব। বিশ্ববিদ্যালয়ের মননধারার সাহিত্যের ক্ষেত্রে তিনি এক প্রভাবশালী পুরুষ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের গবেষণা সহকারী হিসেবে তাঁর যথার্থ শিক্ষকতা জীবন শুরু। তবে প্রভূত অধ্যয়ন, পরিচ্ছন্ন ইতিহাসজ্ঞান ও সমাজদৃষ্টির বিশ্লেষণী ক্ষমতা দিয়ে তিনি তাঁর গবেষণা ও জ্ঞানকে অসামান্য এক ঠিকানায় পৌঁছে দেন। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের গবেষক হিসেবে তাঁর খ্যাতিও তুঙ্গে ওঠে। এ খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে সবখানে, বাংলাভাষী সব অঞ্চলে। আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের ভাইপো ও পোষ্যপুত্র এবং ভাবশিষ্য আহমদ শরীফ চাচার পদাঙ্ক অনুসরণ করে বাঙালি ও বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস রচনায় ব্রতী হন। সংস্কৃতি ও সাহিত্য ক্ষেত্রে বাঙালি মুসলমানের আত্মস্বরূপ অনুসন্ধানে ড. আহমদ শরীফের গবেষণা দৃঢ় ভিত্তি দিয়েছে। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের মতো মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যও যে হিন্দু-মুসলমানদের মিলিত সাহিত্য, সেই সত্যটি প্রতিষ্ঠা করার কৃতিত্ব আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের ও আহমদ শরীফের। আহমদ শরীফের মধ্যযুগের সাহিত্য গবেষণা মূলত উপাত্তে মধ্যযুগ; কিন্তু ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে ও দৃষ্টিভঙ্গিতে সম্পূর্ণ আধুনিক। তবু অচিরে ‘মূর্তিমান মধ্যযুগের’ তথাকথিত ভাবমূর্তি ভেঙ্গে দেন আহমদ শরীফ এবং পদার্পণ করেন আধুনিক সাহিত্যের জগতে। মূল্যায়নে অভিনিবেশি হন ঊনিশ-বিশ শতকের বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ রূপকারদের- বিদ্যাসাগর, মধুসূদন, বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সুকান্তসহ আরো অনেকের। এক সময় তিনি মূল্যায়ন করেছিলেন দৌলত উজির বাহরাম খান, আলাওল, কাজী দৌলত, মুহম্মদ কবীর, সৈয়দ সুলতান, মুহম্মদ খান প্রমুখ মধ্যযুগের সাহিত্যিকদের। হয়তো কখনো তাঁর মূল্যায়ন প্রতিক্রিয়াপূর্ণ কিংবা কখনো বিতর্কিত; কিন্তু আহমদ শরীফের লেখার মূল্য এইখানে যে, একটা নতুন অভিমত ও দৃষ্টির পরিচয় সেখানে মেলে। আবার প্রতিদিনের সমাজ প্রবাহকে তিনি অভিনিবেশ সহকারে দেখেন, প্রগতি ও প্রগতির দ্বন্দ্বকে বুঝতে চেষ্টা করেন। তবে সব সময় প্রগতির পক্ষেই নিজের চিন্তা ও অভিমত অনুকূল করে রাখেন। আহমদ শরীফের লেখায় বাংলাদেশের ভাঙাচোরা ও দুষ্টু সমাজের ক্লেদ ও ক্লিন্ন চিত্রগুলো অবশ্যই আছে। তবে কোনো অবস্থাতেই আহমদ শরীফ নৈরাশ্য ভারাতুর নন বরং মানবিক প্রত্যয় ও প্রত্যাশায় দারুণভাবে বিশ্বাসী। আহমদ শরীফ কলাবাদী নন, উপযোগিতাবাদী লেখক। সেই উপযোগিতাবাদের মূল আধার মানুষ, বাংলাদেশের মানুষ, বাংলা ভাষার মানুষ, নির্যাতিত নিপীড়িত মানুষ। বাংলাদেশের আধুনিক চিন্তা-চেতনার জগতে আহমদ শরীফ একটি বলিষ্ঠ ভিত্তি নির্মাণ করেছেন। তিনি পুরনো মূল্যবোধ ও সংস্কারের ঘোর বিরোধী, সর্বপ্রকার সামাজিক-রাজনৈতিক আধি-ব্যাধির তুমুল সমালোচক। শ্রেয়সের সন্ধানী তিনি, তিনি গণমানুষের হিতৈষী, সমাজতন্ত্রে আস্থাশীল, শতভাগ অসামপ্রদায়িক, মানবতাবাদী। তাঁর গণমানব হিতৈষণা, মানবতাবাদ এবং সামন্তবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা তাঁকে বাংলাদেশের বামধারার লোকদের প্রিয় করেছে। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের সাহসী বুদ্ধিজীবীর ভূমিকায় তিনি সব সময় শ্রদ্ধেয় ও মান্য। অসংখ্য প্রগতিবাদী ও স্বদেশহিতৈষী সংঘ, সমিতি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তিনি ছিলেন যুক্ত এবং এসব জায়গায় সব সময় তিনি স্পষ্টভাষী, অন্যায়ের প্রতিবাদকারী এবং গণমানুষের হিতকারী। তারুণ্যমণ্ডিত আহমদ শরীফ জীবনে প্রচুর আড্ডা দিয়েছেন, জ্ঞান ও বিদ্যার কথা বলেছেন অজস্র। ভাষণ, বক্তৃতা, বিবৃতি দিয়েছেন অসংখ্য। তিনি জীবত্কালে বেশকিছু পুরস্কার লাভ করেছিলেন, তাঁর মধ্যে রাষ্ট্রীয় পুরস্কার একুশে পদকসহ পশ্চিমবঙ্গের রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘সম্মানসূচক ডিলিট’ ডিগ্রী। উপমহাদেশের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও রাজনীতির ক্ষেত্রে অসামান্য পণ্ডিত দ্রোহী, অসামপ্রদায়িক যুক্তিবাদী, দার্শনিক, প্রগতিশীল, মুক্তবুদ্ধি ও নির্মোহ চিন্তার ধারক ড. আহমদ শরীফ গোটা কর্মজীবন ধরে জনগণের গভীর শ্রদ্ধালাভ করেছেন। কথা ও কর্মে অবিচল, অটল, আপসহীন দৃঢ় মনোভাবের এই মানুষটি সব রকম মেকি প্রথা-সংস্কার-শৃংখল ছিন্ন করে ১৯৯৫ সালে লিপিবদ্ধ করা ‘অসিয়তনামা’-র মাধ্যমে মানবকল্যাণে মরণোত্তর চক্ষুদান ও দেহদান করে গেছেন। সেই অসিয়তনামায় উল্লেখ ছিল ‘চক্ষু শ্রেষ্ঠ প্রত্যঙ্গ, আর রক্ত হচ্ছে প্রাণ প্রতীক। কাজেই গোটা অঙ্গ কবরে কীটের খাদ্য হওয়ার চেয়ে মানুষের কাজে লাগাই তো বাঞ্ছনীয়।’ ১৯৯৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি আজকের এইদিনে ড. আহমদ শরীফ ঢাকাতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। লেখক :গবেষক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন