জামায়াত ও সাম্রাজ্যবাদের মধ্যে যে একটি ভাই-ভাই সম্পর্ক রয়েছে, সম্প্রতি আবার তার নিদর্শন পাওয়া গেল। তা পাওয়া গেল সপ্তাহখানেক আগে, বাংলাদেশে তিন দিনের সফরকালে বৃটিশ পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ব্যারনেস সাইয়েদা হুসেন ওয়ার্সির কথায়। স্থানীয় সাংবাদিকরা জামাত-শিবির নিষিদ্ধ করার দাবি সম্পর্কে তার অভিমত জানতে চাইলে তিনি বললেন, রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করাকে সবচেয়ে ভালো পথ বলে তিনি মনে করেন না।
ব্যারনেস ওয়ার্সি তার ঢাকা সফরে এসেছিলেন এমন এক সময়ে যখন এদেশে পক্ষকাল ধরে এক গণআন্দোলনের উত্তাল তরঙ্গমালা প্রবাহিত হচ্ছে। এক অভূতপূর্ব গণজাগরণে রূপ নেয়া এই আন্দোলনের শ্লোগানগুলোর মধ্যে রয়েছে যুদ্ধাপরাধী-রাজাকারদের সর্বোচ্চ দণ্ড অর্থাত্ মৃত্যুদণ্ড, জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধকরণ এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-ধারা পুনঃস্থাপন। ঢাকার শাহবাগে শুরু হওয়া এই আন্দোলন দ্রুতই দেশব্যাপী ‘গণজাগরণ মঞ্চ’ রূপ নিয়ে ছড়িয়ে পড়ে গণশক্তির এক নবজাগরণ ঘটিয়েছে। এগিয়ে চলেছে একদিকে ‘তারুণ্য’ ও একই সাথে ‘মুক্তিযুদ্ধের’ চেতনা-ধারার নব উত্থান।
এ রকম এক পটভূমিতে বাংলাদেশে সফরে এসে এদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনির সাথে বৈঠক শেষে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্র শিবিরকে নিষিদ্ধ করার জন্য ‘গণজাগরণ মঞ্চ’ থেকে যে দাবি উঠেছে সেটিকে তিনি কিভাবে দেখছেন সে সম্পর্কে সাংবাদিকরা তাকে জিজ্ঞেস করলে ব্যারনেস ওয়ার্সি বলেন, বৃটেন বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের পক্ষে নয়। কারণ কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধের চেয়ে গণতান্ত্রিক পন্থায় আদর্শগত ও রাজনৈতিকভাবে তাকে মোকাবেলা করাই শ্রেষ্ঠ বলে বৃটেন মনে করে। রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করাই সর্বোত্কৃষ্ট পথ নয়, বরং জনগণের হাতেই এটি ছেড়ে দেয়া উচিত যে, কোন পথে তারা আগামী দিনের বাংলাদেশকে এগিয়ে নিবেন ইত্যাদি। বৃটিশ পররাষ্ট্র উপমন্ত্রী ব্যারনেস ওয়ার্সি জামাত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করার বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়েছেন এবং সেক্ষেত্রে ‘সব রাজনৈতিক দলের কাজ করার গণতান্ত্রিক অধিকার’, ‘আদর্শের লড়াইয়ের জন্য জনগণের মতামতের মুখাপেক্ষি হওয়ার’ যুক্তি হাজির করেছেন। আমেরিকাও এসব যুক্তি হরহামেশাই দিয়ে থাকে। পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের এ ধরনের যুক্তি উত্থাপনের কারণ স্পষ্ট। তা হলো, সাম্রাজ্যবাদ জামায়াতের মতো দল ও শক্তির প্রত্যক্ষ মদদদাতা। জামায়াতের মতো দলকে সাম্রাজ্যবাদের মদদ দেয়ার এই বিষয়টি দীর্ঘদিনের।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে অবিভক্ত ভারতে ঔপনিবেশিক শাসকদের প্রত্যক্ষ সহায়তায় জামায়াতে ইসলামী দলটির প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। ব্রিটিশ আমলে জামায়াত ব্রিটেনের দালালি করেছে। পরে তা পরিণত হয়েছে পাকিস্তানের দালালে। আগাগোড়াই জামায়াত হলো মার্কিনীদের পদলেহী দালাল সংগঠন। ইতিহাসের পর্বে পর্বে সে পবিত্র ইসলাম ধর্মকে রাজনৈতিক পণ্য হিসেবে ব্যবহার করে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়েছে। গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে ধ্বংস করার জন্য দাঙ্গা লাগিয়েছে। পাকিস্তানে দাঙ্গা লাগিয়ে কাদিয়ানিদের হত্যা করায় জামায়াত নেতা মওদুদির ফাঁসির দণ্ডও হয়েছিল, যা পরে সাউদি আরবের অনুরোধে মওকুফ করা হয়েছিল। জামায়াত সব সময় জাতীয় আত্মপরিচয় ও স্বাধিকারের দাবিকে বিরোধিতা করেছে। ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে তারা ‘মওদুদিবাদ’ প্রচার করেছে। কবি নজরুলকে ‘কাফের’ বলে প্রচার করেছে। ভাষা আন্দোলন নাস্তিক ও ভারতীয় চরদের ইসলামবিরোধী ষড়যন্ত্র বলে প্রচার করেছে। ’৫৪ সালে কেউ যুক্তফ্রন্টকে ভোট দিলে সে ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যাবে এবং তার ‘বিবি তালাক হয়ে যাবে’ বলে ফতোয়া দিয়েছে। ইসলামের চেয়ে আমেরিকার প্রতি তার ভালোবাসা যে বেশি তার প্রমাণ, প্যালেস্টাইনে হামলা, ইরাক দখল, আফগানিস্তান দখল, লিবিয়ায় আগ্রাসন, পাকিস্তান-আফগানিস্তানে ড্রোন হামলা ইত্যাদি কোন বিষয়েই জামায়াত তেমন সরব হয়নি। হোয়াইট হাউজ, ডাউনিং স্ট্রিটের সাথে জামায়াতের দহরম-মহরমের কথা সর্বজন বিদিত। তাই বৃটেনের পররাষ্ট্র উপমন্ত্রী যে জামায়াতের নিষিদ্ধকরণের বিরুদ্ধে বলবেন তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই।
রাজনৈতিক দলের নিষিদ্ধিকরণের বিষয়ে যুক্তি বা নীতির বিবেচনা যে কখনোই আমেরিকা-বৃটেনের কাছে প্রধান নয় বিভিন্ন সময় তাদের নেয়া বিভিন্ন অবস্থান থেকে সে কথা স্পষ্ট। তাদের কাছে প্রধান বিষয় হলো, দলটি তাদের পক্ষের না বিপক্ষের। হিজবুত তাহরির, জেএমবি, হরকাতুল জিহাদ ইত্যাদি সংগঠনগুলো অনেকটাই জামায়াতের মতো হলেও এগুলো আমেরিকার-বৃটেনের বিরুদ্ধে সবর। বাংলাদেশে এই দলগুলোকে নির্বাহী হুকুমের দ্বারা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আমেরিকা-বৃটেন তাতে কোনো আপত্তি করেনি, কোন কথা তোলেনি। অথচ জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রে তাদের বিরোধিতার কথা তারা প্রকাশ্যে জানিয়ে চলেছে। কারণ, জামায়াত তাদের দালাল সংগঠন।
এক্ষেত্রে তারা এরূপ একটি যুক্তির অবতারণা করে থাকে যে, জেএমবি-হিজবুত তাহরির ইত্যাদি হলো জঙ্গি-সন্ত্রাসী সংগঠন। আর জামায়াত হলো একটি ‘উদার ইসলামী দল’। তাদের একথা যে সত্য নয়, তার প্রমাণের শেষ নেই। একথা ঠিক যে, জেএমবি, হিজবুত তাহরির ইত্যাদি হলো সন্ত্রাসী সংগঠন। কিন্তু সেই সাথে একথাও ঠিক যে, এসব সংগঠনে ক্যাডারের যোগানদাতা, মতাদর্শগত মুরুব্বি, রাজনৈতিক আচ্ছাদন দানকারী হিসেবে যে দলটি কাজ করে সেটি হলো জামায়াত। আটক জঙ্গিদের জামায়াত সংশ্লিষ্টতার ভূরিভূরি অকাট্য প্রমাণ পাওয়া গেছে। তাহলে কি একথাই ঠিক নয় যে, এ ধরনের উদার ইসলামী দলের চেহারা ও একই সাথে তার জঙ্গি চেহারা হলো, অবস্থাভেদে ও প্রয়োজনানুসারে একই দল জমায়াতের ধারণকৃত দুই ভিন্ন রূপ?
তাছাড়া, জামায়াতের নিজস্ব কর্মকাণ্ডই কি তার সন্ত্রাসী-জঙ্গি চরিত্রের প্রমাণ বহন করে না? হাত-পায়ের রগ কাটা, গান পাউডার দিয়ে ঘর-রুম জ্বালিয়ে দেয়া, ক্যাডারদের মিলিটারি কায়দায় প্রশিক্ষণ দেয়া, অস্ত্র-আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে সামরিক ফর্মেশনের কায়দায় পরিকল্পিত সন্ত্রাসী হামলা চালানো—ইত্যাদি কাজকর্ম জামায়াত-শিবিরের সাথে যুক্ত হয়ে রয়েছে। গত ৪ মাস ধরে জামায়াত-শিবির একের পর এক পুলিশকে আক্রমণের ঘটনা চালিয়ে যাচ্ছে। পুলিশের অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে তারই সাহায্যে পুলিশকে রক্তাক্ত করছে, আইনমন্ত্রীর গাড়ি বহরে হামলা করছে, বিজিবির গাড়ি আক্রমণ করছে, হিটলিস্ট তৈরি করছে, রাজিবসহ আন্দোলনের কর্মী ও সাধারণ মানুষকে হত্যা করছে। জামায়াতের এতোসব সহিংস জঙ্গি তাণ্ডবের পরেও কি ‘উদার ইসলামী দল’ হিসাবে তার মার্কিন-ব্রিটিশের দেয়া সার্টিফিকেটের সাথে একমত হওয়া যায়? বস্তুত জামায়াত কোন রাজনৈতিক দলের সংজ্ঞায় পড়ে না। এটি একটি সুগঠিত জঙ্গি-সন্ত্রাসী প্রতিষ্ঠান। কিন্তু যেহেতু জামায়াত আমেরিকা-বৃটেনের সেবা করে থাকে, আমেরিকা-বৃটেন তাই তাকে ‘উদার ইসলামী দলের’ সিল লাগিয়ে এদেশকে নিয়ন্ত্রিত নৈরাজ্যের মাঝে চিরদিন ডুবিয়ে রেখে তাদের সাম্রাজ্যবাদী নয়া উপনিবেশবাদী স্বার্থ এগিয়ে নিতে তত্পর রয়েছে।
ব্রিটিশ পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করাকে সর্বোত্কৃষ্ট পথ নয় বলে আমাদেরকে সবক দিয়েছেন। সেটা যদি তাদের বিবেচনায় সর্বোত্কৃষ্ট পথ না হয়ে থাকে তাহলে কেন তারা হিটলারের নািস পার্টি, গেস্টাপো, এসএস ইত্যাদি রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করলো? কেন ‘কু ক্লাক্স ক্লান’ নামের উগ্র বর্ণবাদী সংগঠনটি আমেরিকায় নিষিদ্ধ? আল-কায়দা, তালেবান ইত্যাদি সংগঠনকে কেন তারা নিষিদ্ধ করতে দিল? এদের ক্ষেত্রে ‘আদর্শের লড়াইয়ে জনগণের মতামতের মুখোমুখি হওয়ার’ নীতি প্রয়োগ না করে কেন তাদেরকে নিষিদ্ধ করে রাখা হয়েছে? অপর যে আরেকটি খোঁড়া যুক্তি এক্ষেত্রে দেয়ার চেষ্টা করা হয় তা হলো, নিষিদ্ধ করা হলে জামায়াত আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যাবে ও তাতে তারা ভয়ঙ্কর বিপজ্জনক শক্তি হয়ে উঠবে। এই যুক্তি যদি সঠিক হতো তবে নািস পার্টি, কু ক্লাক্স ক্লান, আল-কায়দা ইত্যাদি সংগঠন তো এতোদিনে দুনিয়াকে দখল করে নিতে সক্ষম হওয়ার কথা!
জামায়াতকে নিষিদ্ধ করলেই কি সে শেষ হয়ে যাবে—অনেকে এ ধরনের প্রশ্ন তুলে জামায়াত-শিবিরের নিষেধাজ্ঞার দাবিটির বিরোধিতা করার চেষ্টা করে থাকে। কিন্তু, একথা তো কখনই কেউ বলেনি যে, জামায়াত-শিবিরকে আইন করে নিষিদ্ধ করার পর শুধু নাকে তেল দিয়ে ঘরে বসে থাকলেই হবে। জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার কাজটি প্রয়োজন, কিন্তু সেটিই যথেষ্ট নয়। নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি তার বিশাল আর্থিক সাম্রাজ্যকে ভেঙ্গে দিতে হবে, প্রশিক্ষিত ক্যাডার কাঠামো চুরমার করে দিতে হবে, রিক্রুটমেন্ট ও কমিউনিকেশন চ্যানেলগুলোকে ধ্বংস করে দিতে হবে ইত্যাদি। এক্ষেত্রে যেটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ তা হলো, জামায়াতের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক, মতাদর্শিক ও সামাজিক সংগ্রামকে বিস্তৃত, ব্যাপক, গভীর ও অপ্রতিরোধ্য রূপে গড়ে তুলতে হবে। মানুষের মন থেকে জামায়াতের ছায়া দূর করার এই কাজটি অনেকদিন ধরে চালিয়ে যেতে হবে। জামায়াতকে আইন করে নিষিদ্ধ করাটা এই কাজকে সহায়তা করবে। তাই নিষিদ্ধকরণ প্রয়োজন, যদিও সেটিই যথেষ্ট নয়।
একথা মনে রাখা প্রয়োজন যে, জামায়াত-শিবির আমাদের দেশে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকেই একটি নিষিদ্ধ দল। একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর বিকেল ৪টা ৩ মিনিটে তত্কালীন রেসকোর্স ময়দানে যে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ দলিল সই হয়েছিল, তাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অফিসার-জোয়ান ছাড়াও তাদের সব ধরনের অক্সিলারি বাহিনীর নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের কথা অন্তর্ভুক্ত ছিল। হানাদার বাহিনীর যেকোন রকম তত্পরতা চালানোর অধিকার বিলুপ্ত হওয়ার পাশাপাশি তার রাজনৈতিক অক্সিলারি বাহিনী হিসেবে জামায়াতও সেই আত্মসমর্পণ দলিল স্বাক্ষরের সাথে সাথে বাংলাদেশের মাটিতে কাজ করার অধিকার হারিয়েছিল। আইনগতভাবে বাংলাদেশে জামায়াতের অস্তিত্ব এভাবে সেদিন অবৈধ হয়ে গিয়েছিল।
দ্বিতীয়ত, একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বরের পর ১৯৭৫ ১৫ আগস্ট পর্যন্ত বাস্তব অবস্থাই ছিল এমন যে, জামায়াত যে কোথাও প্রকাশ্যে কাজ করবে, অফিস বানাবে, সভা-সমাবেশ করবে— সেসব ছিল সম্পূর্ণ অকল্পনীয় ব্যাপার। এ ধরনের চেষ্টা হলে তা চুরমার হয়ে যেত। জামায়াতের নেতারা হয় জেলে না হয় বিদেশে। কর্মীরা পরিচয় গোপন করে বাঁচার চেষ্টায় নিয়োজিত। আইনত নিষিদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি বাস্তবতার সব ধরনের বিবেচনাতে জামায়াত হয়ে গিয়েছিল একটি নিষিদ্ধ দল।
তৃতীয়ত, ১৯৭২ সালে রচিত দেশের সংবিধানের ৩৮ নং অনুচ্ছেদের মাধ্যমে জামায়াতের মতো দলকে নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়েছিল। এভাবে এদেশে জামায়াতের অস্তিত্বের বিষয়টি তখন সম্পূর্ণভাবে একটি নন এ্যাজেন্ডায় পরিণত হয়েছিল।
১৯৭৫-এর পর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উল্টিয়ে দেয়া হলো। জেনারেল জিয়া সংবিধানের ৫ম সংশোধনীর দ্বারা অন্যান্য অনুচ্ছেদের সাথে সাথে ৩৮ নং অনুচ্ছেদটিও সংশোধন করেন। এটিকে এমনভাবে পাল্টে দেয়া হয় যাতে করে জামায়াতের মতো দল করার ওপর সাংবিধানিক নিষেধাজ্ঞা উঠে যায়। সেই সূত্র ধরেই জামাত দেশে সক্রিয় হয়ে উঠলো। বিদেশি সহায়তায় বিশাল অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য গড়ে তুলে তার সাহায্যে দল বানানো শুরু করলো। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মাঝে বিরোধকে সুকৌশলে কাজে লাগিয়ে তারা নিজেদের অবস্থান ও শক্তি বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছে। এবারের জাতীয় নির্বাচনে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রসঙ্গটি একটি প্রধান ইস্যু হিসেবে চলে আসে। জনগণ, বিশেষত তরুণ প্রজন্ম, এর পক্ষে গণরায় প্রকাশ করে। এদিকে, দেশের সর্বোচ্চ আদালত সংবিধানের ৫ম সংশোধনীকে বেআইনী বলে ঘোষণা করে এবং অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে ৭২-এর সংবিধানে যেভাবে ৩৮ নং অনুচ্ছেদ আছে, সেভাবেই তা হুবহু পুনঃস্থাপনের নির্দেশ দেয়। ফলে জামায়াত আবার অবৈধ হয়ে যায়। আদালতের রায়ে বলা হয়েছে যে, অবৈধ জামায়াতকে যে বৈধতা দেয়া হয়েছিল তা অবৈধ। কিন্তু আদালতের সেই সিদ্ধান্ত বদলে দিয়ে পঞ্চদশ সংশোধনীতে সেই ৩৮ নং অনুচ্ছেদের বয়ান বদলে দিয়ে জামাতকে আবার বৈধতা দেয়া হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে ‘ধর্মনিরপেক্ষতার’ নীতি ফিরে আসার ৩৮নং অনুচ্ছেদের পরিবর্তনের কোন নৈতিক ভিত্তি থাকতে পারে না। সে হিসেবে বলা যায় যে, বাংলাদেশের জন্ম থেকেই জামায়াত আসলে আইনগত বিচারে অবৈধ হয়ে আছে।
এসব ছাড়াও, গত ৩/৪ মাস ধরে জামায়াত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনার মতো যে সহিংস তাণ্ডবের অভিযান ও অন্যান্য দেশদ্রোহী কার্যক্রম চালাচ্ছে, সেজন্যও জামায়াতকে রাষ্ট্রদ্রোহী দল হিসাবে নিষিদ্ধ করার উপযুক্ত কারণ সৃষ্টি হয়েছে।
বস্তুত, জামায়াত আসলে কোন রাজনৈতিক দল নয়। এটি একটি সন্ত্রাসী প্রতিষ্ঠান। ইসলামকে বিকৃত করে ও তার অপব্যবহার করে সমাজে অরাজকতা-নৈরাজ্য-সন্ত্রাস সৃষ্টিই তার কাজ। অতএব, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় রাজনৈতিক দলের যে অধিকার প্রাপ্য, জামায়াত তা ভোগ করার অধিকার রাখে না। জামায়াতের সাথে যে দ্বন্দ্ব তা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় চলা আদর্শের ও মতাবাদের দ্বন্দ্ব কেবল নয়, এই দ্বন্দ্ব হলো রাষ্ট্রদ্রোহী ফ্যাসিস্ট সন্ত্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে গোটা রাষ্ট্র ও জনগণের দ্বন্দ্ব। জামায়াতের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক, সামাজিক, আদর্শগত লড়াই খুবই গুরুত্বপূর্ণ ঠিকই, কিন্তু একই সাথে তাকে নিষিদ্ধও করতে হবে। ১৯৭১ সালে জামায়াত নিষিদ্ধ হয়ে যাওয়ার পর তাকে অবৈধভাবে যে বৈধতা দেয়া হয়েছে তা প্রত্যাহার করে নিতে হবে। এ কারণেই জামায়াতকে নিষিদ্ধকরণের কাজটিকে মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত কর্তব্য বলে বলা একান্তই যুক্তিযুক্ত।
ব্যারনেস ওয়ার্সি এসব যুক্তির ধার ধারেন না। কারণ তাকে সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থ দেখতে হবে। জামায়াতের সাথে সাম্রাজ্যবাদের ভাই-ভাই সম্পর্ক। তাই বৃটেন-আমেরিকা যে জামায়াতকে রক্ষা করতে এগিয়ে এসেছে সেটাই স্বাভাবিক।
হ লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি
E-mail : [email protected]
