ঢাকা মহানগরীতে ক্রমবর্ধমান পানি সংকটের ঘটনা বর্তমানে গভীর উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বৃহত্তর মিরপুর, মোহাম্মদপুর ও অন্যান্য এলাকায় দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োজনীয় ন্যূনতম পানিটুকুও পরোপুরি পাওয়া যেতো না। এই সংকট নিরসনের জন্য ঢাকা ওয়াসা বিভিন্ন জায়গায় গভীর নলকূপ বসিয়ে যাচ্ছে এবং আরো বসানোর পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এতো করেও পানির সরবরাহ প্রয়োজনের তুলনায় বাড়ছে না। ঢাকা মহানগরীতে মানুষের সংখ্যা, বহুতল ভবনের সংখ্যা, পোশাক তৈরির কারখানা ও অন্যান্য পানি নির্ভরশীল কলকারখানা যে হারে বাড়ছে সেই অনুপাতে পানির সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ঢাকা ওয়াসার পুরাতন এক সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, ঢাকায় দৈনিক পানির প্রয়োজন ২০০ কোটি লিটার। এই হিসেব হয়তো ঢাকা ওয়াসার সরবরাহের ওপর জরিপ করে দেয়া হয়েছে। ঢাকা ওয়াসার বাইরেও যে সকল মেটে কূপ, নলকূপ ও সাবমার্সিবল (ংঁনসবত্ংরনষব) পাম্প রয়েছে তার হিসেব হয়তো এখানে নেই। নলকূপের সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও কমে যাচ্ছে। এমনকি ৬০০ থেকে ১০০০ ফুট গভীরেও নলকূপের পানি উত্তোলনের পরিমাণ শুষ্ক মৌসুমে কমে প্রায় পঞ্চাশ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। প্রচুর পানি ভূগর্ভ থেকে উত্তোলনের ফলে প্রথমত পানিতে আর্সেনিকের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে এবং দ্বিতীয়ত ভূমিকম্পের আশঙ্কাও বেড়ে চলেছে। আমাদের হাতে তৈরি সংকট আমাদের দ্রুত ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এই সংকট মোকাবেলায় আমাদের দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া দরকার।
এ সকল ব্যবস্থার মধ্যে প্রথম এবং কার্যকরী ব্যবস্থা হল বৃষ্টির বা বর্ষা মৌসুমের অতিরিক্ত পানি আটকিয়ে রেখে সেই পানি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেয়া। এই মুহূর্তে আমাদের মাথা থেকে আকাশ রেল, পাতাল রেল ধারণা দূর করে যা বাস্তব, স্বনির্ভর বাংলাদেশ গঠনে সহায়ক সেই ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত। ঢাকার চারিদিকের নদীগুলো মানুষের যাতায়াতের জন্য এবং মালপত্র আনা-নেয়ার জন্য কিভাবে ব্যবহার করা যায় তা নিয়ে চিন্তা বা কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া দরকার। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ পাক বৃষ্টির পানি ও নদীর পানির বহুমুখী ব্যবহারের ওপর সুস্পষ্ট ইঙ্গিত প্রদান করেছেন:‘আল্লাহপাকই স্বর্গ মর্ত সৃষ্টি করেছেন। অনন্তর তিনি বৃষ্টির পানি দ্বারা উত্পন্ন ফল-ফলাদি আমাদের আহারের জন্য নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। তিনি আমাদের অধীনে জলযান করে দিয়েছেন যা তার নির্দেশে আমরা সমুদ্র বা নদীপথে চালনা করে থাকি। তিনি আমাদের সেবা ও সুবিধার জন্য নদীগুলো সৃষ্টি করেছেন।’ (সূরা ইব্রাহিম:আয়াত-৩২)
বর্তমান বিশ্বে বহু উন্নত দেশ মৌসুমে বৃষ্টির পানি ধারণ করে এবং নদীতে বাঁধ দিয়ে সেচসহ বহুবিধ কাজে পানি ব্যবহার হয়ে থাকে। আমাদের দেশেও বৃষ্টি ও নদীর পানি মৌসুমে ধরে রেখে বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা যায়। এজন্য দরকার আমাদের উদ্যোগ এবং বাস্তবধর্মী পরিকল্পনা। ঢাকার চারিদিকে নদীগুলো থেকে আমরা কি কি সেবা পেতে পারি, কি কি সুবিধা ভোগ করতে পারি তার ওপর চিন্তা-ভাবনা করতে হবে। উন্নত প্রযুক্তি ও নীতিমালাসহ দ্রুত একটি সুস্থ ও কার্যকরী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
এজন্য শীতলক্ষ্যা, বুড়িগঙ্গা, বালি ও তুরাগ নদীসহ সকল নদীকে সংস্কার করে প্রয়োজনে কেটে গভীর করে ঢাকার চারিদিকে একটি ‘রিং রিভার’ তৈরির দিকে মনোযোগ দেয়া উচিত। এসব নদীর ধারে যেসব নীচু জায়গা আছে সেগুলো ভরাট করে বহুতল ভবন নির্মাণ বন্ধ করা উচিত। এসব নীচু জায়গা সংস্কার করে অথবা গভীর করে কেটে বর্ষা মৌসুমের পানি ধরে রাখা যায় এবং এগুলো বড় বড় জলাধার বা কৃত্রিম হ্রদরূপে ব্যবহার করা যায়।
এ সকল জলাধারেরও ‘রিং রিভারের’ পানি নিয়ে পরিশোধিত করে সমস্ত ঢাকা মহানগরীতে সরবরাহ করা যেতে পারে। ‘রিং রিভার’ দিয়ে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে যাতায়াতসহ মালপত্র আনা-নেয়া করা যেতে পারে। সব জলাধার বা রিং নদীর ধারে স্থানে স্থানে সুন্দর পার্ক তৈরি করা যেতে পারে এবং এসব পার্কে পর্যটক আকর্ষণ করার জন্য জলকেলির উপযুক্ত বিভিন্ন ধরনের যান্ত্রিক জলযান সরবরাহ করা যেতে পারে। শিশুদের জন্য করা যেতে পারে মনোরম শিশু পার্ক। এগুলোর আশেপাশে থাকতে পারে বড় বড় বাজার বা ডিপার্টমেন্টাল স্টোর। জলাধারের পাশে গাছ লাগিয়ে তৈরি করা যেতে পারে পাখিদের জন্য প্রাকৃতিক আবাস। মাছ চাষ ও হাঁসের খামারের জন্য এসব জলাধার অনুকূল। সব পানিনির্ভর কলকারখানা লোকালয় থেকে সরিয়ে এসব জলাধারের ধারে স্থানান্তর করা যেতে পারে যাতে করে ওয়াসার পানি বা পরিশোধিত পানি এসব কলকারখানায় ব্যবহার করতে না হয়। লোকালয়ে যাতে কলকারখানা গড়ে উঠতে না পারে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।
শুধু ঢাকা কেন, সমস্ত বাংলাদেশের নদীগুলো ক্রমান্বয়ে শুকিয়ে বিরাট বিরাট বালুচরের সৃষ্টি হচ্ছে। হয়তো কিছুদিনের মধ্যে বাংলাদেশ মরুভূমিতে পরিণত হবে। এই মরুকরণের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করতে হলে সময়মত আমাদের কাজ করা দরকার। বড় বড় চর কেটে কৃত্রিম হ্রদ বা পানির বড় রিজার্ভার তৈরি করা দরকার। বর্ষার সময় যখন নদীর পানির প্রবাহ বাড়ে তখন নদী ও বৃষ্টির পানি এ সকল জলাধারে আটকিয়ে রেখে শুষ্ক মৌসুমে এই পানি কৃষিকাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। বাংলাদেশে লোকসংখ্যা ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে, গ্রামে বিশুদ্ধ খাবার পানির বড় অভাব, অধিকাংশ নলকূপের পানি আর্সেনিকযুক্ত। সেজন্য প্রতিঘরে নলকূপ সরবরাহ যেমন ব্যয়বহুল তেমনই অপ্রয়োজনীয়। এসব রিজার্ভার থেকে পানি পরিশুদ্ধ করে গ্রামেও খাবার পানি সরবরাহ করা যেতে পারে। এসব জলাশয়েও মাছ চাষ, হাঁসের খামার, পাখিদের অভয়ারণ্য, পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র প্রভৃতি করা যেতে পারে।
পানি সংকট নিরসনকল্পে ও দেশকে মরুকরণের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য অতি শিগগিরই এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করার জন্য চেষ্টা করা যেতে পারে। প্রথমত ছোট ছোট প্রকল্পের জন্য সাবেক রাষ্ট্রপতি মরহুম জিয়াউর রহমানের খাল কাটা প্রকল্প গ্রহণ করা যেতে পারে। ব্যক্তিমালিকানাধীন কোম্পানিগুলো এগিয়ে আসতে পারে, কারণ হাউজিং প্রকল্পের চেয়ে এসব প্রকল্প লাভজনক নয়। দেশীয় প্রযুক্তি ও সম্পদ ব্যবহার করে ক্রমান্বয়ে একটি করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত বড় বড় প্রকল্পের জন্য আমরা দাতা ও পরিবেশ দূষণকারী দেশগুলোর কাছে সাহায্য চেতে পারি।
এ সকল প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে শহরের যানজট কমবে, ঢাকাসহ সমগ্র দেশের নৈসর্গিক দৃশ্য বাড়বে, চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থা হবে, প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা হবে, বন্যা নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে, আমাদের খাদ্যে আমিষের অভাব পূরণ হবে, কিছু লোকের কর্মসংস্থান হবে এবং সর্বোপরি পানির সমস্যা সমাধান হবে।
এ পর্যন্ত এ বিষয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছে কিন্তু কর্তৃপক্ষ বিশেষভাবে মনোযোগ দিচ্ছে বলে মনে হয় না। যাহোক ইতোমধ্যে হাতিরঝিল প্রকল্প শেষ হয়েছে এবং এর সুফল এখন আমরা ভোগ করছি। বেশ কিছুদিন আগে ১৯ মার্চ ২০০৪ সালে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) এবং বুড়িগঙ্গা বাঁচাও আন্দোলনের নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন সংগঠনের বুদ্ধিজীবী ও পরিবেশবাদীরা পরিবেশ রক্ষার জন্য এক বিরাট পদযাত্রা সহকারে বিভিন্ন দাবি-দাওয়া পেশ করেছিল। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এগুলো মূল্যায়ন করা উচিত। আমি এ দেশের একজন নাগরিক হিসেবে করি বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গঠনের স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে এখন আমাদের হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করে যাওয়া দরকার। পরস্পর পরস্পরকে দোষারোপ করা, রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি করা এবং হিংসা-বিদ্বেষ আমাদের কোন মঙ্গল বয়ে আনবে না বরং আমাদের সৃষ্ট সংকট দেশ, জাতি ও আমাদের অনাগত বংশধরদের দ্রুত ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে। তাই আমাদের প্রত্যাশা হবে সকলে মিলে, সকল ভেদাভেদ ভুলে এবং আল্লাহর ওপর বিশ্বাস রেখে দেশ, জাতি ও ভবিষ্যত্ প্রজন্মকে রক্ষার্থে কাজ করে যাওয়া, দ্রুত সম্মুখে এগিয়ে যাওয়া, পেছনে তাকাবার সময় কোথায়? আল্লাহ আমাদের সাহায্য করুণ—আমিন।
লেখক :সাবেক ল্যাবরেটরি ম্যানেজার ও বিজ্ঞানী
আইসিডিডিআর,বি
