[ স মা জ ]

মুখোমুখি অবস্থান কারো জন্যই সুখকর হবে না

আপডেট : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২১:৩০
শাহবাগ চত্বরের প্রজন্মের জাগরণ গোটা দেশকে বিস্ময়কর আলিঙ্গন ক্ষমতায় কাছে টানতে পেরেছে। একটানা ১৭ দিন বিরতিহীন কর্মসূচি পালন করে জাগরণ মঞ্চ থেকে উদ্যোক্তাগণ তাদের আন্দালনের প্রাথমিক পর্বের ইতিহাসটি গত ২১ ফেব্রুয়ারি প্রায় মাসব্যাপী কিছু ভিন্নধর্মী কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু ২২ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে জুম্মার নামাজের পর এমন কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে গেছে যা দেখার জন্য দেশের সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষ বোধহয় মোটেও প্রস্তুত ছিল না। বায়তুল মোকাররম কেন্দ্রীয় মসজিদ থেকে নানা নামের ব্যানার নিয়ে মিছিলসহ বের হয়ে সংবাদকর্মীদের ওপর হামলা করা, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়া, মসজিদের ভেতর জায়নামাজে আগুন ধরিয়ে দেওয়া, দেওয়াল ভাঙ্গা দৃশ্যমান ছিল। ঢাকায় শাহাবাগমুখী পরিকল্পনা থেকে বেশকিছু জঙ্গী মিছিল বের করার চেষ্টা ছিল। ঢাকার বাইরে বিভিন্ন শহরে শহীদ মিনার ও প্রজন্ম চত্বর ভাঙচুর করা, জাতীয় পতাকা ছিঁড়ে ফেলা, চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে হামলা চালানো ইত্যাদি কর্মকান্ড মানুষের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। ফলে ঐ দিন সন্ধ্যা থেকে আবার প্রজন্মের নবজাগরণের অবস্থান কর্মসূচি শুরু হয়। নাম-পরিচয় স্পস্টভাবে উল্লেখ না করে হঠাত্ ১২টি ইসলামী সংগঠনের উদ্যোগে একটি কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। তাতে অভিযোগ করা হয় যে, শাহবাগ চত্বরে আন্দোলন সূচনাকারী কেউ কেউ নাকি ব্লগে নবী (স.) এর নামে আপত্তিকর কিছু মন্তব্য লিখেছে। অবশ্য শাহবাগ আন্দোলনকারীরা এমন অভিযোগকে অস্বীকার করেছে। বিষয়টি যেহেতু ফেসবুক ও ব্লগে ঘটেছে তাই এ নিয়ে সত্যাসত্য প্রমাণ খুবই জরুরি কাজ। কেননা, ফেসবুকে হ্যাকিং করা, অপপ্রচার চালানোর অভিযোগ দুনিয়া জোড়া উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক্ষেত্রে আসলে কী ঘটেছে, সত্যিসত্যি কোনো তরুণ সে ধরনের কোনো লেখা লিখেছে কিনা, মৃত রাজীবের হত্যাকান্ডের আগে তার সে ধরনের কোনো লেখা ছিল কিনা, নাকি তার মৃত্যুর পর কেউ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তা করেছে তা জানার আগেই কিছু কিছু মহল থেকে মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস ও আবেদনকে ব্যবহার করে গোটা প্রজন্মের আন্দোলনকে ধর্মবিরোধী নাস্তিক্যবাদী ইত্যাদি রূপে চিত্রায়িত করা হয়েছে। আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত তরুণ নেতৃত্ব এ ধরনের প্রচারণার পরিণতি সম্পর্কে যতোটা সতর্ক থাকা প্রয়োজন ছিল ততোটা বোধহয় ছিল না। ফলে শুক্রবার জুম্মার নামাজের পর বিভিন্ন নামে ব্যানার হাতে মূলত শহরগুলোর নির্দিষ্ট কিছু মসজিদ থেকে আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে একটি মহল মিছিলসহকারে নেমে পড়ে। লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, কিছু কিছু মসজিদ থেকে ঐ মিছিলগুলো বের হয়। সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষ নয়, সাংগঠনিক পরিচয়ে পরিচিত নেতা-কর্মী ও সমর্থকগণই এসব মিছিলে অংশগ্রহণ করেছিল। তাতে একদিকে যেমন বিভিন্ন ধরনের সংগঠন ছিল, তাদের অবস্থান, আচরণ ও কর্মকাণ্ডও কিন্তু এক রকম ছিল না। কেউ কেউ ইসলাম ও নবী (স.) এর অবমাননা হয়েছে এমন সরল ধর্মবিশ্বাস থেকে প্রতিবাদ জানাতে জুম্মার নামাজের পর মাঠে নেমেছিল। তাদের কারো কারো কথায় বোঝা গেছে যে, তারা নির্দিষ্ট জায়গায় অবস্থান নিয়ে প্রতিবাদ জানাতে চেয়েছিল। কিন্তু তারা বুঝে ওঠার আগেই তাদের মিছিলে ঢুকে পড়া কোনো কোনো শক্তি সাংবাদিকদের আক্রমণ, পুলিশের ওপর হামলা ও মিছিল নিয়ে শহীদ মিনার, প্রজন্মচত্বরসহ বিভিন্ন দিকে অগ্রসর করতে থাকে, যা শেষপর্যন্ত তাদের কারোই নিয়ন্ত্রণে থাকেনি। বিষয়টি নিয়ে ভাববার অনেক কিছুই আছে। যে ১২টি সংগঠনের আহবানে ঐ দিন প্রতিবাদ জানাতে কর্মসূচি দেওয়া হয়েছিল তাদের মত ও পথ ভিন্ন নিশ্চয়ই স্বীকার করতে হবে। তবে তারা জুম্মার নামাজের পর মসজিদের মতো পবিত্র জায়গাকে এসব প্রতিবাদ কর্মসূচি শুরু করার জন্য কেন নির্ধারণ করতে গেলেন তা কিন্তু বোধগম্য নয়। যে বিষয়টি নিয়ে তারা প্রতিবাদ করতে চেয়েছিলেন তার জন্যে শুক্রবার জুম্মার নামাজ বা মসজিদকে বাছাই করতে হবে কেন? তাদের কাছে অকাট্য প্রমাণাদি থাকলে যে কোনো দিনই যে কোনো উপযুক্ত স্থানেই প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হতে পারে। সরকারের নিকট এর প্রতিকার চাওয়া যেতে পারে। বাংলাদেশের সংবিধানে কারো ধর্ম বিশ্বাসে আঘাত লাগতে পারে এমন কিছু বলা, লেখা ও করার কোনো সুযোগ কোনো নাগরিকের নেই, সরকার তেমন অভিযোগ পেলে অতি অবশ্যই ব্যবস্থা নিতে বাধ্য। সুতরাং ধর্মের অবমাননাকর কিছু ঘটলে তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে শুক্রবার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে এমন আচরণ যারা দেখান তারা আসলে বিষয়টি নিয়ে রাজনীতি বা অন্যকিছু করতে চান। নাকি ধর্মবিশ্বাসী হিসেবে তাত্ক্ষণিকভাবেই প্রতিকার চাওয়ার মানসিকতা পোষণ করেন সেটিই বিবেচ্য বিষয়। তাছাড়া ধর্মের পবিত্রতা রক্ষার নামে মসজিদে জড়ো হয়ে সেদিন যেসব কর্মকাণ্ড করতে দেখা গেছে তাতে এ কথা কোনোভাবেই বলা যায় না যে, সেদিন ১২টি সংগঠনের নেতৃবৃন্দের মসজিদের পবিত্রতার প্রতি তাদের কারো কারো সজাগ দৃষ্টি বা মনোযোগ ছিল, বরং বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে জায়নামাজে আগুন ধরিয়ে দেওয়া, দেয়াল ভাঙ্গা, মসজিদকে জিম্মি করা ইত্যাদি কর্মকান্ডগুলোয় তাদের কারো কারো আক্রোশ, ক্রোধ, প্রতিহিংসার স্বাক্ষর পাওয়া যাচ্ছে, যা তারা নিয়ন্ত্রণ করার কোনো চেষ্টাই করেননি। এর ফলে মসজিদের পবিত্রতা রক্ষায় তারাই দায়িত্বহীনতার যে নজির স্থাপন করেছেন তা দেশের সাধারণ ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মধ্যে গভীর ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। ইসলাম রক্ষার জন্য সংগঠন করতে গিয়ে কোনো কোনো সংগঠনের নেতাকর্মীদের এমন বাড়াবাড়ি, আক্রমণাত্মক কর্মকান্ড ও আচরণ কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। এছাড়া বেশকিছু শহরে শহীদ মিনারে চড়াও হওয়া, একুশে ফেব্রুয়ারির ফুলের তোড়া ছুঁড়ে ফেলা, বর্ণমালা ভাঙচুর করা, জাতীয় পতাকা ছিঁড়ে ফেলা, প্রজন্ম চত্বরসমূহে হামলা ও ভাঙচুর করা ইত্যাদি কর্মকাণ্ডে অনেকটাই আক্রমণাত্মক রূপ লাভ করেছিল, মিডিয়া কর্মীদের প্রতি তার আক্রোশও প্রকাশ্য ছিল। ফলে ২২ ফেব্রুয়ারিতে দেশে যে সংঘাতের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল তা সচেতন যে কোন ধর্মীয় মানবতাবাদী রাষ্ট্র, সমাজ ও রাজনীতি-সচেতন মানুষকে বেশ উদ্বেগে ফেলে দিয়েছে। প্রজন্ম চত্বরের নবজাগরণের অহিংস কর্মসূচি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি, মুক্তিযোদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের আন্দোলন দেশব্যাপী যেভাবে আবেদন সৃষ্টি করেছে, নতুন যে ধরনের বৈশিষ্ট্যে তা আবিভূর্ত হয়েছে তাতে সাংগঠনিক কোনো উপস্থিতি ছাড়াই দেশের অনগণিত তরুণের ওপর বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব ফেলার ক্ষেত্রে তৈরি করেছে, দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির ওপর এবং অদূর ভবিষ্যতে দেশের বৃহত্তর রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা-অনাস্থার বিষয়গুলো নতুনভাবে নির্মিত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সে ধরনের একটি আন্দোলনকে নিয়ে ধর্মবিরোধী প্রচার-অপপ্রচার, তা থেকে দেশে দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টির মতো সংঘাত-সংঘর্ষ সৃষ্টির পাঁয়তারা বেশ আশঙ্কার বিষয়। এই আন্দোলনের সূচনা একেবারেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে, তাতে কয়েকজন ব্লগার যুক্ত থাকলেও দ্রুতই এর সঙ্গে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশা ও বয়সের লক্ষ মানুষ যুক্ত হয়ে পড়ে। ফলে তা শুধু আর ব্লগারদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সব ব্লগারও এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এমনটিও নয়। তবে যদি কোনো ব্লগার কোনো ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকে তার দায় গোটা শাহবাগ চত্বরের হতে পারে না। অথচ বিষয়টিকে কোনো কোনো মহল নিজেদের সংকীর্ণ দলীয় বা রাজনৈতিক স্বার্থে দেখার চেষ্টা করছে। এর বিরুদ্ধে দেশে ধর্মপ্রাণ মানুষকে ক্ষেপিয়ে তোলার চেষ্টাই করছে। রাজনৈতিকভাবে এ ধরনের আন্দোলন কেউ সমর্থন করতে পারে, কোনো ব্যক্তি বা কোনো দল নাও করতে পারে। এই আন্দোলনকে নিয়ে বিপ্লবের পক্ষে বা বিপক্ষে অভিযানও থাকতে পারে, করতেও পারে। তাতে দেশের বা রাজনীতির বড় ধরনের কোনো ক্ষতির আশঙ্কা থাকে না। কিন্তু যখন ধর্মকে এর মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়-এই মারাত্মক রাষ্ট্রীয় সংকটের আশংকা থেকে যায়, সংঘাত-সংঘর্ষের উপাদান সৃষ্টি হতে পারে। বাংলাদেশে তেমন একটি অনাকাঙ্ক্ষিত অবস্থা এখন মনে হয় তৈরি হয়েছে, যেখানে ধর্মকে মুখোমুখি দাঁড় করানোর চেষ্টা হয়েছে কোনো কোনো মহল থেকে। তাতে ধর্মপ্রাণ মানুষ যেমন, একইভাবে দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ ব্যবস্থাও দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ ধরনের পাল্টাপাল্টি বা মুখোমুখি অবস্থান কারো জন্যই সুখকর হবে না। তবে যে বিষয়টি লক্ষণীয় তা হচ্ছে শুক্রবারের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পর ১২ সংগঠনের মধ্য থেকে কোনো কোনোটি ঐ দিনের তান্ডবের সঙ্গে তাদের অসম্পৃক্ততার কথা স্পষ্ট করে উল্লেখ করেছেন। বলেছেন এটি একটি বড় ইতিবাচক দিক। বোঝা যাচ্ছে ঐ সব সংগঠনের নেতা-কর্মীরা এক ধরনের বিশ্বাস ও ধারণা থেকে কর্মসূচিতে অংশ নিলেও তাণ্ডব ও কর্মকাণ্ডের ধরন-ধারণ তাদেরকেও ব্যথিত বা হতাশ করেছে। তা থেকেই মনে হয়েছে, তাদের আহূত ২৪ তারিখের হরতালে তাদের অংশগ্রহণ সেভাবে সক্রিয় ছিল না। তারা অনেকটাই নিষ্ক্রিয় ছিল। সুতরাং বিষয়টিকে সরকার এবং রাজনৈতিক মহল বিবেচনায় নিয়ে এ ধরনের সংঘাত-সংঘর্ষ ও মুখোমুখি হওয়ার অবস্থান থেকে নিবৃত্ত করার উদ্যোগ নেওয়া খুবই জরুরি। যেসব দল তাদের উত্থাপিত অভিযোগ সম্পর্কে যথাযথ উত্তর খুঁজে পাবে, সন্তুষ্ট হওয়ার মতো ব্যাখ্যা ও তথ্যপ্রমাণ খুঁজে পাবে তারা অবশ্যই তাদের অবস্থানে ফিরে যাবে। তবে কোনো কোনো দল হয়তো তাতেও সন্তুষ্ট হবে না, যুদ্ধাপরাধীদের ইস্যু নিয়ে নিজেদের দলীয় অবস্থান নিয়ে অনড় থাকতে পারে। তাদের বিষয়টি একেবারেই আলাদা। তাদের ব্যাপারে সরকারের অবস্থান ভিন্নতর হতে পারে। তবে অবশ্যই ১২ দলের ব্যাপারে এক রকম হওয়ার কোনো কারণ নেই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শনিবার রাঙামাটিতে অনুষ্ঠিত জনসভায় ধর্মীয় অবস্থান সম্পর্কে তার সরকারের যে দৃষ্টিভঙ্গির কথা উল্লেখ করেছেন তা বেশ তাত্পর্য বহন করে। তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুও সাংবাদিক সম্মেলনে সরকারের যে অবস্থান উল্লেখ করেছেন তার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে কোনো বিরোধ নেই। সুতরাং সরকার দ্রুত এমন অবস্থান থেকে কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে দেশকে এ ধরনের সম্ভাব্য সংঘাত ও মুখোমুখি অবস্থান থেকে ফিরিয়ে আনবে-সেটিই বহুলভাবে প্রত্যাশিত। লেখক : অধ্যাপক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক