দেশের এক পঞ্চমাংশ ধান এ হাওরাঞ্চলে উত্পাদিত হয়। প্রায় সব ধান চলে যায় হাওরাঞ্চলের বাইরে, বড় বড় নৌকা করে আশুগঞ্জ, ভৈরব, সিলেট, মদনগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম প্রভৃতি এলাকা হয়ে সারা দেশে। হাওরাঞ্চলে বলতে গেলে কোন ধান গুদামে সংগৃহীত হয় না। সরকারি তেমন কোন বড় গুদাম ঘর নেই, কোন অবকাঠামোও গড়ে উঠেনি। বড় কোন রাইস মিল, চাতালও নেই। বৈশাখ, জৈষ্ঠ্য মাসে হাওরবাসী বিভিন্ন কারণে উত্পাদিত ধান কম দামে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়। আবার ফাল্গুন-চৈত্র মাসে বেশি দামে চাল কিনে খায়। এ চাল আসে হাওরের বাইরে থেকে। বাংলার সোনালী আঁশ পাট- ডান্ডি হতে প্রসেসিং হয়ে এ বাংলায় ফিরে আসতো। তেমনিভাবে হাওরাঞ্চলের ধান অন্যত্র ভাঙ্গিয়ে চাল হয়ে আবার হাওরাঞ্চলে ফিরে আসে। তবে ভর্তুকি মূল্যে নয়, ভেলু এড্ হয়ে-অধিক দামে। কৃষক ধান বিক্রি করে কম দামে, চাল কিনে বেশি দামে। ধান, চালের দু’মুখী ক্ষতির দুর্ভোগ তাদের পোহাতে হয়। আশ্চর্য হলেও সত্যি যে, ফাল্গুন-চৈত্র মাসে হাওরাঞ্চলে ধান, চালের দাম দেশের অন্য যেকোন এলাকা হতে বেশি দামে বিক্রি হয়। কিন্তু বৈশাখ মাসে নতুন ধান কাটার পর ধানের দর সর্বনিম্ন দরে বিক্রি করতে বাধ্য হয়। বর্তমানে হাওরাঞ্চলে হাট-বাজারে যে চাল বিক্রি হচ্ছে, তার সবটুকুই ভৈরব, আশুগঞ্জ বা সিলেট হতে আমদানিকৃত। এতে চালের দাম অনেক বেশি পড়ে। হাওর এলাকায় গোডাউনে এক ছটাক চালও মজুদ নেই। হাওরের উত্পাদিত ভাল মানের ধানের চাল কিন্তু হাওরে আসে না, অপেক্ষাকৃত কম দামের চাল বেশি দামে তাদের কিনে খেতে হয়। হাওর এলাকায় সরকার পরিচালিত কাবিখা, ভিজিপিসহ বিভিন্ন প্রোগ্রামের চালও বাইরের এলাকা হতে আসে। এতে খরচ বেশি হয়, ক্ষতিও বেশি হয়। ধানে স্বয়ংসম্পূর্ণ হাওরবাসী, চালের জন্য অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হয়। খাদ্য নিরাপত্তার যোগানদাতা হাওরবাসী চরম খাদ্য অনিরাপত্তার মধ্যে বসবাস করছে। কোন কারণে যদি উজান হতে হাওরে চাল আসা বন্ধ হয়ে পরে, তবে পরিস্থিতি কি হবে, ভেবে শিহরিত হয়। হাওরে যে ক’টি গোডাউন আছে, তার অধিকাংশই খালি, বড় কোন রাইস মিল বা চাতাল নেই। হাওরে ক’টি ইপিজেড গড়ে উঠতে পারতো। অথচ, নৌ যোগাযোগের কারণে সহজেই তা গড়ে উঠতে পারতো। এতে কর্মসংস্থান হতো, শহরমুখী জনস্রোত ঠেকানো সম্ভব হতো। ভাটি বাংলার হাওরবাসী মাছ, ভাত সরবরাহ করে বাঙালিত্ব বজায় রেখেছে। বিনিময়ে শুধু পেয়েছে, অবজ্ঞা ও বঞ্চনা। কোন জাতি বা সমপ্রদায়কে বেশি দিন ঠকানো যায় না। সুষম উন্নয়ন এবং সম্পদের সমবণ্টন, শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন। লেভেল প্লেইন না হলে উন্নয়নের গাড়ি হোঁচট খাবেই। শক্তির পরিমাপ হয় ধ্বংসের ক্ষমতা দিয়ে। সুতরাং সাধু সাবধান।
লেখক : প্রকৌশলী, সার্ক এগ্রিকালচার সেন্টার, ঢাকা।
[email protected]
