অমর একুশের বইমেলায় রবিবার মধ্যরাত্রে সংঘটিত অগ্নিকাণ্ডে প্রায় দুই কোটি টাকার ক্ষতি হইয়াছে বলিয়া প্রকাশকরা দাবি করিয়াছেন। সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, রাত্রি একটার দিকে বাংলা একাডেমী পুকুরপাড়সংলগ্ন ধীরেন্দ্রনাথ চত্বরে আগুনের সূত্রপাত ঘটে। অতি দ্রুত তাহা পার্শ্ববর্তী স্টলগুলিতে ছড়াইয়া পড়ে। ফায়ার সার্ভিসের ছয়টি ইউনিট প্রায় একঘন্টা চেষ্টা চালাইয়া আগুন নিভাইতে সক্ষম হয়। কিন্তু এই অল্প সময়ের মধ্যেই ২৭টি স্টল আগুনে সম্পূর্ণ পুড়িয়া যায়। ইহা হইতে আগুনের তীব্রতা যেমন আঁচ করা যায়, তেমনি অগ্নিনির্বাপক দলের সদস্যরা ত্বরিত্ ভূমিকা না নিলে পরিস্থিতি যে আরও ভয়াবহ রূপ পরিগ্রহ করিতে পারিত—তাহাও বুঝিতে অসুবিধা হয় না। বিষয়টি যে বিচলিত হইবার মতো তাহাতে সন্দেহ নাই। তাহা শুধু এই কারণে নয় যে, অমর একুশের বইমেলার গত কয়েক দশকের ইতিহাসে এতো ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ইতিপূর্বে আর কখনোই ঘটে নাই। বরং যেই প্রশ্নটি বড়ো হইয়া দেখা দিয়াছে তাহা হইল, যেইখানে প্রতিদিন হাজার হাজার নারী-পুরুষ ও শিশুর সমাগম ঘটে এবং বত্সরের পর বত্সর ধরিয়া যেই মেলাটি আয়োজিত হইয়া আসিতেছে, সেইখানে এতো বড়ো একটি দুর্ঘটনা ঘটিতে পারিল কিভাবে? বলা বাহুল্য যে, শত প্রস্তুতি সত্ত্বেও এই ধরনের দুর্ঘটনা ঘটিতেই পারে। কিন্তু এই ক্ষেত্রে সম্ভাব্য দুর্ঘটনা এড়াইবার জন্য কিংবা দুর্ঘটনা ঘটিলেও ক্ষয়ক্ষতি ন্যূনতম পর্যায়ে রাখার জন্য যথাযথ প্রস্তুতি নেওয়া হইয়াছিল কিনা—সেই প্রশ্ন এড়াইয়া যাওয়া কঠিন। ভুক্তভোগী প্রকাশকরাও সেইদিকেই অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়াছেন।
অগ্নিকাণ্ডের কারণ এখনও জানা যায় নাই। তবে মেলায় দায়িত্বরত দমকল বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলিয়াছেন যে, বৈদ্যুতিক সংযোগ হইতে আগুন লাগিতে পারে। কারণ রাত্রি নয়টার পর মেলায় বিদ্যুত্ সরবরাহ বন্ধ করিয়া দেওয়ার কথা থাকিলেও তাহা পুরোপুরি মানা হয় নাই। বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক অবশ্য সেই আশঙ্কা নাকচ করিয়া দিয়াছেন। অন্যদিকে তথ্যমন্ত্রী ঘটনাটিকে ‘রহস্যজনক’ বলিয়া মন্তব্য করিয়াছেন। নাশকতার আশঙ্কাও প্রকাশ করিয়াছেন কেহ কেহ। ইতোমধ্যে অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধান, ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ ও ক্ষতিপূরণের বিষয়ে পরামর্শ প্রদানের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পক্ষ হইতে তিনটি কমিটি গঠন করা হইয়াছে। সর্বোচ্চ ৪৮ ঘন্টার মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হইয়াছে কমিটিগুলিকে। এই ধরনের কমিটি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা খুব একটা ইতিবাচক নহে। তবু আমরা আশা করি যে, তদন্তে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটিত হইবে এবং যত দ্রুত সম্ভব প্রাপ্ত সুপারিশ অনুযায়ী গৃহীত হইবে কার্যকর ব্যবস্থা। তবে সর্বাগ্রে নজর দিতে হইবে ক্ষতিগ্রস্ত প্রকাশকদের দিকে। মনে রাখিতে হইবে যে, অগ্নিকাণ্ডে বহু প্রকাশক প্রায় নিঃস্ব হইয়া পড়িয়াছেন। সঙ্গত কারণেই ক্ষতিপূরণের দাবি উঠিয়াছে এবং ‘সরকারের পক্ষ হইতে যতটুকু সম্ভব’ সহায়তার আশ্বাসও প্রদান করিয়াছেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী। ক্ষতিপূরণের বিষয়টি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রকাশকদের মধ্যে যে ক্ষোভ ও হতাশার সঞ্চার হইয়াছে তাহা নিরসনের জন্য শুধু ক্ষতিপূরণই যে যথেষ্ট নহে—তাহাও বলার অপেক্ষা রাখে না। তাহাদের মতে, নাশকতা বা দুর্ঘটনা যাহাই হউক না কেন, ইহার দায় বাংলা একাডেমী কোনোভাবেই এড়াইতে পারে না। নিরাপত্তা বা সতর্কতামূলক ব্যবস্থার অভাবের কারণেই এই দুর্ঘটনা ঘটিয়াছে বলিয়া তাহারা মনে করেন। প্রকাশকদের এই অভিযোগকে হালকা করিয়া দেখিবার কোনো অবকাশ নাই। অতএব, ভয়াবহ এই অগ্নিকাণ্ডের কারণ বা কারণসমূহ যেমন জরুরিভিত্তিতে খুঁজিয়া বাহির করিতে হইবে, তেমনি এই ধরনের দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে গ্রহণ করিতে হইবে কার্যকর ব্যবস্থা।
