[ প্র জ ন্ম ]

শাহবাগ :এক মহাকাব্যিক গণঅভ্যুত্থান

আপডেট : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২১:০৯
দীর্ঘ চার দশকের অমোচিত কালিমা মুছে একটি পরিশুদ্ধ বাংলাদেশ দেখার প্রত্যয়ে এই আন্দোলন যেখানে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ কেবল একটি দাবিতে সোচ্চার। স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকাররা কেন সর্বোচ্চ শাস্তির মুখোমুখি হবে না, এই প্রশ্ন সবাইকে এক কাতারে এনেছে। আদালত রায় দিয়েছে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড কিন্তু জনগণের চাওয়া ছিল মৃত্যুদণ্ড। এ দুয়ের ব্যবধান যে কত বেশি তা আমরা দেখতে পাচ্ছি শাহবাগের গণজাগরণে। এমন স্বতঃস্ফূর্ত গণজাগরণ একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর এই প্রথম। এই আন্দোলন আহবান, সংগঠিত ও পরিচালনায় যারা রয়েছেন, দেশের এক বৃহত্ তরুণ সমাজ তারা ইতোপূর্বে এমন কোনো অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হননি। কেবল প্রচণ্ড দেশপ্রেম আর সুদৃঢ় ভ্রাতৃত্ববোধই এমন আন্দোলনকে সফল করেছে। শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরে চলমান রাজাকার ও দেশদ্রোহী বিরোধী গণসমাবেশ একটি অভূতপূর্ব ও বিস্ময়কর আন্দোলন। কেবল বিষয়গত চেতনার ভিত্তিতে চলমান এমন স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন সম্ভবত বিশ্বেও বিরল। এটি এমন এক মহিমান্বিত আন্দোলন, যার একক কোনো নেতা নেই কিন্তু নেতৃত্ব আছে। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বিবেকের তাড়না আর চেতনার স্ফূরণ ঘটিয়ে আন্দোলনের মাত্রাগত পরিবর্তন ঘটানো হয়েছে। ইতিহাসে এমন সৃষ্টিশীল কোনো আন্দোলন কেউ কখনো প্রত্যক্ষ কারেনি যার সূচনা ঘটেছে অনলাইন আর সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে। অনলাইনে ব্লগ, ফেসবুক, টুইটার, ম্যাসেঞ্জার প্রভৃতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোয় প্রকাশিত তরুণ মনের সুপ্ত চেতনা ক্রমে এমন ব্যাপকতা লাভ করেছে যে তা আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়েছে যার বিস্তরণ ঘটেছে সমগ্র বাংলাদেশে। ইন্টারনেটের ভার্চুয়াল জগতের সাথে বাস্তবের দুনিয়ার বাস্তবসম্মত মিলন এই ঘটনার ফল। আর এর শক্তি যে কত তীব্র হতে পারে তা শাহবাগের গণআন্দোলনই দেখিয়েছে। সবাই একটি সুতোয় গাঁথা। এটি শুধু ভার্চুয়াল নয়। সে শুধু অনলাইনেই সীমাবদ্ধ থাকছে না এখন। অনলাইনের মধ্যদিয়ে তারা একটি চেতনা তৈরি করছে। এটি আমরা দেখছি শাহবাগে সংঘটিত আন্দোলনে। বহু বছর ধরে এ অবস্থান তৈরি হয়েছে। একদিনে ডাক দিলে মানুষ শাহবাগে জড়ো হতো না। আরও একটি উল্লেখ করার মতো বিষয় হলো-শাহবাগের আন্দোলনের একজন অন্যতম সংগঠক ব্লগারকে প্রাণ দিতে হয়েছে। তাকে এই আন্দোলনের প্রথম শহীদ বলা হচ্ছে। সুতরাং ব্লগ বা অনলাইন যেটাই বলি না কেন ভার্চুয়াল দুনিয়া আর কেবল ভার্চুয়াল বিষয়েই সীমাবদ্ধ নয়। বরং তা আজ বাস্তবেরই পরিপূরক। অনলাইন কিন্তু জামায়াত-শিবিররাও ব্যবহার করে। তারা কেন এমন আন্দোলন সংগঠন করতে পারল না? প্রশ্ন সেটিও। প্রযুক্তির শক্তি আছে। কিন্তু এটি ব্যবহার করে যদি মানুষের চেতনায় পরিবর্তন না আনা যায়, তাহলে সে পরিবর্তন সতিকারের পরিবর্তন হয়ে ওঠে না। প্রযুক্তি হচ্ছে বস্তুগত বিষয়। সাবজেকটিভ বিষয় হলো, চেতনাগত পরিবর্তন। ৫-৭ বছর ধরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অনলাইনের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের ভেতরে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে চেতনাগত পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। এ কারণে তাদের মধ্যে ক্ষোভটা প্রসারিত হয়েছে বলে দ্রুতই শাহবাগে এসে অবস্থান নিতে পেরেছে তরুণরা। তারা কেবল অনলাইনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সত্যিকার স্থান রাজপথেও তারা চলে এসেছে। কম্পিউটার থেকে তরুণ প্রজন্ম শাহবাগে স্থানান্তর করেছে। এসবের সম্মিলন ঘটেছে এখানে। শাহবাগে সংঘটিত আন্দোলনের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর একক কোনো নেতা নেই। এটি সম্পূর্ণ বিকেন্দ্রীভূত সামাজিক আন্দোলন। যে আন্দোলন একটি উদ্দেশ্য নিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে সমগ্র দেশে। সবার এক সুর, এক দাবি। এই আন্দোলন বিষয়গত চেতনার ভিত্তিতে পরিচালিত যে আন্দোলনের কোন নেতা নেই। এটাকে আমরা বলছি উত্তর-আধুনিক আন্দোলন। এখানে একক কোনো নেতৃত্ব থাকে না। উত্তর-আধুনিক আন্দোলনের বড় বৈশিষ্ট্য হলো এখানে নেতার প্রয়োজন নেই। এটাকে একভাবে নেতাহীন আন্দোলন বলা যেতে পারে। নেতৃত্ব থাকবে কিন্তু নেতা হয়ে উঠবে না কেউ। আগেরকার দিনে সংঘটিত আন্দোলনে দেখা গেছে, রাজনৈতিক দল সেখানে নেতৃত্ব দেয়। সেখানে নেতা থাকে। সাম্প্রতিককালে সৃষ্ট আন্দোলনে সবাই নেতা। এতে সমস্যার কিছু নেই। আগেকার আন্দোলনে প্রভু-ভৃত্যের সম্পর্ক ছিল। রাজা-প্রজার সম্পর্ক ছিল। সেটি ভেঙে এখন তৈরি হয়েছে নতুন কাঠামো, নতুন সম্পর্ক। এমন আন্দোলনে প্রতেক্যেই ক্ষমতাশালী। কারও ওপরে মাতবরী ফলানো হয় না এখানে। সমাজবিজ্ঞানের ক্লাসিক্যাল মার্কসবাদী আন্দোলনের একটি কেন্দ্র থাকে। একজন নেতা থাকে। নেতার নেতৃত্ব আর আদর্শে পরিচালিত হয় আন্দোলন। নতুন গণমাধ্যম এ জায়গাটি নির্মাণ করে। আমিই আমার ভাগ্য নির্ধারক। আমরা যারা পাঠক ছিলাম, তারা ছিলাম দুর্বল। লেখক যা-ই বলতো, তা-ই গ্রহণ করতাম। সেখানে লেখক শক্তিশালী থাকে। এখন পাঠকও শক্তিশালী হয়ে উঠছে। তারা ক্ষমতাবান কারণ তারা নিজেরাই লেখক হয়ে উঠছেন। এই ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ আমরা শাহবাগের আন্দোলনে দেখছি, দেখেছি আরব বসন্তেও। কিন্তু শাহবাগের এই আন্দোলনের অক্ষ আছে আর সেটি হলো- প্রজন্ম চত্বর। তবে কোন সুনির্দিষ্ট কোন নেতা নেই। এখানে সবাই নেতা। সবার নেতৃত্বে পরিচালিত এ আন্দোলন। এক অভূতপূর্ব গণতান্ত্রিক গণজাগরণ। শাহবাগের গণআন্দোলনের বড় সুফল হলো এটি সরকারের অবস্থানকে নাড়া দিয়েছে। বিদ্যমান ক্ষমতা কাঠামোর ভিত্তিমূলে আঘাত হেনেছে। আর সরকারও তাই এর প্রচণ্ডতা বুঝতে পেরে নড়েচড়ে বসেছে। মানবতাবিরোধীদের ব্যাপারে আরও সজাগ হবার প্রয়াস পেয়েছে। জামায়াতের রাজনীতি নিয়ে নতুন করে ভাববার প্রয়াস পেয়েছে। যে কোনো কিছু করে পার পেয়ে যাবার সময় ফুরিয়ে গেছে এটা যেন টের পেয়েছে। গণতান্ত্রিক দেশে জনগণের গণজোয়ার কতটা শক্তিশালী হতে পারে তার ধারণা হয়ে গেছে। সামাজিক অবিচার, দুর্নীতি, অনাচারের প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপনের একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম তৈরি হয়ে গেছে। এছাড়া শাহবাগের আন্দোলনের আরও অনেক ইতিবাচক দিক রয়েছে। একটা পর্যায়ে গিয়ে হয়তো এটি শেষ হয়ে যাবে। এ আন্দোলনের অর্জন হচ্ছে যে কোনো অন্যায় অবিচার-দুর্নীতি-অনিয়মের বিরুদ্ধে অনলাইন ব্লগার ও সাধারণ মানুষ পরবর্তীতে আবারো জেগে উঠবে। সে সম্ভাবনা থেকে যাচ্ছে। সবাই কিন্তু লিংকড থাকছে। রাজপথে কেউ কাউকে চিনতো না। এখন চিনছে। অনেকের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছে। সেলফোন নম্বর বিনিময় হয়েছে, ফেসবুক ও ব্লগের আইডিও আদান-প্রদান হয়েছে। অন্যায়-অবিচার দেখামাত্র তারা ডাকবে এবং সিরিজ অব আন্দোলন এখানে হবে। সিরিজ অব শাহবাগ আন্দোলন এখানে সৃষ্টি হতে বাধ্য। এটি দানা বাঁধার জন্য যে সামাজিক পুঁজি দরকার শাহবাগের আন্দোলন সেটিকে বাড়িয়ে দিয়েছে। এ পুঁজিটাকে আমরা বার বার ব্যবহার করতে পারব। অনলাইন গণমাধ্যমে যারা কাজ করছেন তাদের দায়বদ্ধতা নিজের কাছে। যে লেখক বই লেখেন তার দায়বদ্ধতাও নিজের কাছে। এ কারণেই দেখা যাবে, এত বড় আন্দোলনে ইভটিজিং হয়নি। একটা মেয়ের ওড়না টানা হয়নি। কোনো মেয়েকে হেনস্থা করা হয়নি। এ কারণেই হয়নি, যারা এ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত তারা প্রত্যেকে নিজের দায়িত্ব নিয়েছে। আমি আসছি, এটা আমার আন্দোলন বিধায় সাবধান থাকতে হবে। অনলাইনের একটি বিশেষ ধরন, যেখানে নিজেকেই তার দায়িত্ব নিতে হচ্ছে। সেই দায়িত্বটা তাকে পালন করতে হবে। এখানে স্বাধীনতার চর্চা করতে হবে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে। নইলে কিন্তু খুব বাজে ঘটনা ঘটবে। আমরা দেখেছি অনলাইনকে অনেকে বাজে ভাবে ব্যবহার করছে। প্রযুক্তি ঠিক আছে কিন্তু একে কীভাবে ব্যবহার করা হবে সেটিকে ব্যক্তির দায়িত্বশীলতার ওপর ছেড়ে দিতে হবে। রাজনীতিকরা এ আন্দোলনের কারণে তাদের প্রাথমিক পরাজয় স্বীকার করে নিয়েছে এরই মধ্যে। শাহবাগের আন্দোলনের সময় অনেক রাজনীতিক কথা বলতে এসেছে; কিন্তু আমাদের তরুণরা তাদের কথা বলতে দেয়নি। রাজনীতিক ফায়দা তুলতে দেয়নি তরুণরা। রাজনীতিকদের প্রতি এক প্রকার অনাস্থার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে শাহবাগে। এ বার্তাটা কিন্তু আওয়ামী লীগ-বিএনপি যেই ক্ষমতায় থাকুক না কেন তারা পেয়ে গেছে। আগামীতে যে ক্ষমতায় আসুক না কেন, শাহবাগ তাদের চিন্তা-ভাবনায় আঘাত করবে। কিছু করে পার পাওয়া নাও যেতে পারে। কারণ তরুণরা আবার ফুঁসে উঠতে পারে। এই ভয়টাই এ আন্দোলনের বড় অর্জন। চাপ তৈরির শক্তি যে তাদের আছে, এর আগে কেউ ভাবতো না। এটাই হচ্ছে তৃতীয় শক্তি। আওয়ামী লীগ-বিএনপির বাইরে এটি হচ্ছে প্রথম শক্তি। গতানুগতিক রাজনৈতিক দল আসলে দ্বিতীয়-তৃতীয় শক্তি। শাহবাগ আন্দোলন প্রথম শক্তি হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে। যা দ্বিতীয়-তৃতীয় শক্তির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। এ শক্তি যখন ক্ষমতায় যাবে বিষয়টি তাদের মাথার মধ্যে থাকবে। কোনো অন্যায়-অবিচার করলে আবারো শাহবাগ ফুঁসে উঠতে পারে। আমাকে জবাবদিহিতার কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারে। এটিই হচ্ছে এ আন্দোলনের সবচেয়ে বড় সফলতা। বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলো এরই মধ্যে চ্যালেঞ্জ হয়ে গেছে। সরকার কিন্তু বাধ্য হয়ে এ আন্দোলনকে সার্পোট করেছে। জনরায়ের বিরুদ্ধে সরকার যেতে পারে না। সরকার কিন্তু এখানে নমনীয় হয়েছে। মূলত তারা পরাজয় বরণ করেছে। এটি কিন্তু দেখবার বিষয়। এমনকি বিএনপির মতো দল যারা জামায়াতের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ, তাদের স্বরও পরিবর্তিত হয়েছে। তাদের আন্দোলনে পরিবর্তন আনতে বাধ্য হয়েছে। সম্প্রতি বিএনপি একা সমাবেশ করেছে। জামায়াতকে সঙ্গে নিতে পারছে না। এটা কি এক মাস আগে সম্ভব ছিল? শাহবাগের আন্দোলনের আগে এটি সম্ভব ছিল না। এটিই শাহবাগ আন্দোলনের অর্জন। তারা রাজনীতিকদের ওপর চাপ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। সামনে অনেক আন্দোলন হবে। সরকার যখন হার্ড লাইনে যাবে, পুলিশ দিয়ে পেটাবে বা হত্যা করবে— সে আন্দোলন আরো বেগবান হবে। এভাবে জনগণকে রোখা যাবে না। শাহবাগ আন্দোলনের বিপরীত অবস্থান নিলে সরকারের ক্ষমতায় থাকা কঠিন হয়ে যেত। সামনের আন্দোলনগুলো এমনই হবে। আত্মম্ভর আশায় তাই বলতে পারি, শেষ বিচারে বাংলাদেশের সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিহাসে শাহবাগের গণআন্দোলন একটি মহাকাব্যিক গণঅভ্যুত্থান হিসাবে চিহ্নিত হবে। লেখক :সহযোগী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন