শাহবাগের বর্তমান আন্দোলন, কর্মতত্পরতা ও গতিবিধি দেখে মনে হচ্ছে এটা ইতিহাসের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে থাকবে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যে সমস্ত আন্দোলন হয়েছে শাহবাগের অন্দোলন তা হতে পৃথক এবং ব্যতিক্রম নৈপুণ্যে ভরা। এত শান্তিপূর্ণ আন্দোলন বাংলাদেশতো অবশ্যই এমনকি পৃথিবীর ইতিহাসেরও কম দেখেছে। অথচ আন্দোলনকারীরা কত বেশি আন্তরিক এবং একনিষ্ঠ। ১৯৭১ সালের পরে যে সমস্ত আন্দোলন হয়েছে তা সবই কোন বিশেষ গোষ্ঠী সাথে নিয়ে অথবা বিশেষ গোষ্ঠীর নেতৃত্বে। আন্দোলনগুলোতে জনস্বার্থের কথা বলে জনমতকে পুঁজি করে রাজনৈতিক ফায়দা লোটা হয়েছে। অথচ শাহবাগ আন্দোলনে যে সমস্ত নেতৃত্ব ও সমর্থক তারা সবাই তরুণ এবং উদ্দীপ্ত। আমাদের প্রথক যে দুটি রাজনৈতিক দল বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে তা হতে বিচ্ছিন্ন এবং ব্যতিক্রম। তারা অপরিহার্যভাবে শান্তিপূর্ণ এবং দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ। অন্যান্য আন্দোলনে স্বার্থবাদী গোষ্ঠীকে আন্দোলনের বেদী ভারি করে স্বার্থ উদ্ধারের আশায়। অথচ এরা তেমন কাউকে আন্দোলনের পুরোভাগে ভিড়তে দিচ্ছে না খুব সচেতনভাবেই। যদি বিরোধী শক্তির সাথে তুলনা করা হয় তাহলে স্পষ্ট দৃশ্যমান এরা কত বেশি সহনশীল। আইন-কানুন সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি এবং তা রাজীব হত্যার পরও। অথচ কদিন আগেও ছাত্রশিবির যে নৃশংসতা, যে বর্বরতা এবং যে অমানবিক কর্মকান্ড করেছে একটা অযৌক্তিক দাবি নিয়ে তা সত্যিই সভ্যতার বাইরে। ছাত্রলীগ এবং ছাত্রদল উভয়ের বর্বরতা ও নিষ্ঠুরতার প্রমাণ আছে। কিন্তু ছাত্রশিবির সারা দেশ জুড়ে যে তান্ডবলীলা চলিয়েছে তা অগ্রহণযোগ্য, তীব্র ঘৃণার যোগ্য। তারা দেশকে অচল করে দিতে চায়, ধ্বংস করে দিতে চায়। তারা চলন্ত বাসে আগুন লাগিয়েছে তাতে মানুষ থাকা সত্ত্বেও। তাতে একজন আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা গেছে। শিবির স্বাধীন বাংলাদেশের নব্য রাজাকার, এরা রাজাকারদের সন্তান এবং স্বাধীন বাংলার জন্য হুমকি। এরা ঘরের শত্রু বিভীষণ। শাহবাগের আন্দোলন, আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের প্রথম রায়টি একজনকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছে। এবং আর একজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। তার ফলস্বরূপ যে তাণ্ডবলীলা বাংলাদেশ দেখেছে তাতে মনে হয়েছে বাংলাদেশ এখনও স্বাধীন হয়নি। যদি লক্ষ্য করা হয় তাহলে বোঝা যাচ্ছে বর্তমান জনসমর্থন ও জনমতের জন্য কিছুটা হলেও কম হবে বলে মনে হয়। যা শাহবাগ আন্দোলনের কীর্তি। এছাড়া আরো কিছু বিষয় উল্লেখ্য যে, আন্দোলনটি সাধারণ জনতার মধ্য হতে উঠে এসেছে। যারা নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখে। তারা প্রমাণ করেছে প্রথাগত এবং তথাকথিত রাজনীতির বাইরে নতুন এবং স্বতন্ত্র জনমত শক্তি আছে। তাছাড়া এই আন্দেলনের পুরোভাগে রয়েছে নারী-পুরুষের সমান বিচরণ। এখানে নতুন নেতৃত্ব এবং সমতার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তারপর পূর্বে সহিংস আন্দোলন দৃশ্যমান ছিল। বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল রাষ্ট্র হিসেবে চিনতো। বর্তমানে শাহবাগ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশের জনগণ কতটা শান্তিপূর্ণ এবং প্রতিবাদী। কিন্তু তাদের এই সহনশীলতার সুযোগ নিয়ে রাজনৈতিক নেতারা ও দলগুলো অস্থিতিশীল করে তোলে। এই আন্দোলন পুরো বাঙালি জাতিকে এক সাথে করে দেখেছে। পাহাড়ি, হিন্দু, মুসলমান এবং নারী-পুরুষ নির্বিশেষে। কোন দেশকে উন্নয়নের জন্য দরকার বিশেষ চেতনা ও দেশপ্রেম। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের সেই চেতনার মূল উত্স। এই আন্দোলনের মাধ্যমে সেই চেতনা আরো বেশি জাগ্রত করা হচ্ছে। তরুণ প্রজন্ম দেশকে নতুন করে জানতে পারছে। যা ১৯৭৫, ১৫ আগস্টের পর হতে অস্বীকার করা হত। ঐক্যবদ্ধতা ও সম্প্রীতি যে কোন জাতির বড় সম্পদ। এই আন্দোলন তার মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রথাগত রাজনৈতিক দল ও নেতৃত্বের স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে-সতর্ক হও, আমরা আপস না করতে বদ্ধপরিবার। মুক্তিযুদ্ধকে আওয়ামী লীগ নিজের করে নিয়েছিল এবং বিএনপিসহ
অন্যান্য দল অস্বীকার করত। অথচ পুরো ব্যাপারটি জনতার বিসর্জন ও আজকের ইতিহাস, তা নতুন করে প্রতিষ্ঠিত হল। তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক। ঐক্যবদ্ধতার ও সম্প্রীতির যেই শ্লোগানগুলো ফিরে আসছে তা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মূল শক্তি হিসেবে কাজ করেছিল। নতুন প্রজন্ম আরো কিছু নতুন শ্লোগানের জন্ম দিয়েছে, যা পুরো বাঙালিকে এক মঞ্চে দাঁড় করিয়েছে। যেমন ‘তুমি কে? আমি কে? বাঙালি বাঙালি’- শ্লোগানকে বলা হয় একাত্মতা প্রকাশের বাহন। এগুলো তার চেয়ে বেশি কিছু হয়ে উঠেছে। আর একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল আন্দোলনকারীদের অমানুষিক কষ্ট করার ক্ষমতা, ধৈর্য্য, সাহস এবং ক্লান্তিহীন পরিশ্রম। ২৪ রাত-দিন কোন আন্দোলন পরিচালিত অত্যন্ত দুরূহ ব্যাপার। এমনও দেখা গেছে কোন কোন ব্যক্তি টানা চার থেকে আট ঘন্টা বক্তব্য বা শ্লোগান দিয়েছেন ক্লান্তিহীনভাবে। একটা বিষয় আমার ভেতর প্রবলভাবে নাড়া দিয়েছে। তা হল রাজীব হত্যার সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার সময় শাহবাগে আমি উপস্থিত ছিলাম। ঐ সময় যারা শ্লোগান দিচ্ছিল তাদের কণ্ঠ ছিল তীব্র এবং ভারবাহী, আবেগে ফেটে পড়ছিল, বুকের হাহাকার ভেতর হতে বের হচ্ছিল প্রবলভাবে। অথচ তা ছিল প্রাণবন্ত। কোন প্রকার সহিংসতা ছাড়া। এর চেয়ে সুমহান আদর্শ হতে পারে না। শ্লোগানগুলো মর্মভেদী, তাতে আত্মভোলা না হয়ে পারা যায় না। এই আন্দোলনের তাত্পর্য অত্যন্ত বেশি, গুরুত্ব অর্থবহ। বাংলাদেশ নতুন করে জেগে উঠছে, নতুন আশার আলো দেখছে। জয় তারুণ্য, জয় শাহবাগ, জয় বাংলা হতে পারে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তনের মূল শক্তি। শাহবাগের আন্দোলন সফল হোক।
লেখক :সমাজ বিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
