টিআইবির রিপোর্ট প্রসঙ্গে

আপডেট : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২১:১২
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয় যে, ওয়ান ইলেভেনের জরুরি অবস্থার মধ্যে সেনাবাহিনীর একাংশ ক্ষমতার অপব্যবহার করিয়াছে। গত বুধবার আনুষ্ঠানিকভাবে এই গবেষণা রিপোর্টটি প্রকাশ করা হয়। উল্লিখিত রিপোর্ট অনুযায়ী সেনাবাহিনীর একাংশের অনিয়ম ও দুর্নীতির মধ্যে রহিয়াছে বিধি বহির্ভূতভাবে জোরপূর্বক অর্থগ্রহণ ও আদায়, বিধি বহির্ভূতভাবে চট্টগ্রাম বন্দরে বার্থ অপারেটর নিয়োগ ও কইন্টেইনার রাখার চার্জ বৃদ্ধি, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নির্যাতন, রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, শিল্পপতি ও ঠিকাদারদের নির্যাতন ও হয়রানি। তাহাদের আইনী সহায়তা লাভের পথেও বাধা দেওয়া হইয়াছে, প্রদর্শন করা হইয়াছে ভয়ভীতি। টিআইবির এই রিপোর্টটি তৈয়ার করা হয় দুই শতাধিক লোকের সাক্ষাত্কারের উপর ভিত্তি করিয়া। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালকের ভাষায় ‘কোনো সংখ্যাতত্ত্বের মাধ্যমে এখানে সরলীকরণ করা হয়নি।’ আলোচ্য রিপোর্টে দুর্যোগ মোকাবিলা হইতে শুরু করিয়া আন্তর্জাতিক শান্তি মিশনে বাংলাদেশের সেনা সদস্যদের অবদানের প্রশংসা করা হয়। টিআইবির এই রিপোর্টটি নানা কারণে সর্বমহলে আলোচিত হইতেছে। রিপোর্টটি যথার্থ কী যথার্থ নয়, সে বিষয়ে এক্ষণে আমরা কোনো মন্তব্য করিতে চাহি না। তবে, দেশে যখন নাগরিক সাধারণের মৌলিক মানবাধিকার থাকে না, তখন এমন অনেক কিছুই ঘটিয়া থাকে, যাহা স্বাভাবিক অবস্থায় চলিতে পারে না। মার্শাল ল কিংবা জরুরি অবস্থার সময়ে সর্বাগ্রে মৌলিক মানবিক অধিকার হরণ করা হইয়া থাকে। আমাদের ইতিহাসে একাধিকবার দেশে সামরিক শাসন আসিয়াছে। স্বাধীনতা পূর্বকালে এই দেশের মানুষ প্রত্যক্ষ করিয়াছেন আয়ুব খানের দীর্ঘ সামরিক শাসন। স্বাধীনতার পরেও আমরা একাধিকবার সামরিক শাসন দেখিয়াছি। ওয়ান ইলেভেনে দেশে কায়েম হইয়াছিল সেনা সমর্থিত জরুরি অবস্থা। জরুরি অবস্থায় নাগরিকদের মৌলিক অধিকার হরণ করা হইয়াছিল। মানুষের যখন বলিবার, প্রতিবাদ করিবার এবং বিচারালয়ের শরণ লইবার স্বাভাবিক পন্থা রুদ্ধ হইয়া যায় তখন যাহারা ক্ষমতায় থাকেন তাহারা অনেক কিছুই করিতে পারেন। বিধিবিধান মানিয়া কোনোকিছু করিবার দায় তাহাদের থাকে না। সেই অবস্থায় সেনা সদস্যদের কেহ কেহ কিংবা ক্ষমতাবানদের মধ্যে অনেকে বিধি বহির্ভূতভাবে কী কী করিয়াছেন তাহার তালিকা দিয়া কোনো লাভ নাই। সেই সময়ে আইন মানিয়া কার্যসম্পাদন করা হইবে, এমনটি আশা করা যায় না। দুনিয়ার যেখানেই, যখনই মার্শাল ল কিংবা জরুরি অবস্থা আসিয়াছে সেখানেই মানুষ লাঞ্ছিত হইয়াছে। অতএব সামরিক শাসনামলে যখন সংবিধান স্থগিত করিয়া দেওয়া হয় কিংবা জরুরি অবস্থায় যখন মানুষের মৌলিক অধিকার কাড়িয়া নেওয়া হয় তখন কোথায় কোন অনিয়ম হইয়াছে সেই ফিরিস্তি অবান্তর। যেখানে লোকের কোনো অধিকারই নাই, সেখানে মানুষের কোন কোন অধিকার হরণ করা হইয়াছে, তাহা আলোচনায় আসিতে পারে না। দুর্নীতি, অনিয়ম, মানুষের অধিকারহীনতা, নির্যাতন, হয়রানি ইত্যাদির আলোচনা-সমালোচনা তখনই প্রাসঙ্গিক যখন দেশে সাংবিধানিক শাসন ব্যবস্থা জারি থাকে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিধি বহির্ভূতভাবে কোনো কিছু করা হইলে কিংবা কাহারও মৌলিক অধিকার লংঘিত হইলে প্রশ্ন উঠিবে। প্রয়োজন বোধ করিলে যেকোনো নাগরিক নিজের অধিকারের জন্য আদালতের আশ্রয় গ্রহণ করিতে পারেন। কাজেই সেনা সমর্থিত জরুরি সরকারের আমলে একশ্রেণীর সেনা সদস্যের কার্যকলাপ সংক্রান্ত রিপোর্ট বর্তমান প্রেক্ষাপটে অপ্রাসঙ্গিক বলিয়াই আমরা মনে করি।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন