ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে সাফল্য ও চ্যালেঞ্জ

আপডেট : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২১:১২
ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ প্রশংসনীয় সাফল্য অর্জন করিয়াছে। এই দাবি সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের। দাবির সমর্থনে যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণও তুলিয়া ধরিয়াছেন তাহারা। তাহাদের মতে, ২০০৫ সালে যেইখানে ৫ শতাধিক মানুষ প্রাণ হারাইয়াছিল ম্যালেরিয়ায়, ২০১২ সালে তাহা নামিয়া আসিয়াছে মাত্র ১১ জনে। সারা দেশে বর্তমানে ম্যালেরিয়া আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা মাত্র ৩০ হাজার। সর্বোপরি, রাজধানী ঢাকাসহ অধিকাংশ জেলাই ম্যালেরিয়ামুক্ত বলিয়াও জানাইয়াছেন তাহারা। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্ত ১৩টি জেলার মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগের ৩টি পার্বত্য জেলার অবস্থাই সবচাইতে ঝুঁকিপূর্ণ। গত মঙ্গলবার জাতীয় প্রেসক্লাবে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, দৈনিক ইত্তেফাক ও ব্র্যাক-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘জাতীয় ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি: বর্তমান প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় এই চিত্রটি তুলিয়া ধরা হয়। আমাদের সীমিত সামর্থ্যের নিরিখে চিত্রটি যে খুবই আশাব্যঞ্জক তাহাতে সন্দেহ নাই। বিশেষ করিয়া প্রায় ১৬ কোটি মানুষের এই দেশে—যেইখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষেরই স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপনের ন্যূনতম নিশ্চয়তাটুকুও নাই—সেইখানে ম্যালেরিয়াজনিত মৃত্যুকে ১১ জনে সীমিত রাখা মোটেও সামান্য বিষয় নহে। আমাদের স্বাস্থ্য খাতের এই সাফল্য আন্তর্জাতিকভাবেও স্বীকৃত। প্রসঙ্গত বলা প্রয়োজন যে, নির্ধারিত সময়সীমার তিন বত্সর আগেই ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে জাতিসংঘের সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) অর্জনে সক্ষম হইয়াছে বাংলাদেশ। ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে এই সাফল্য যতো আশাব্যঞ্জকই হউক, তাহাতে আত্মশ্লাঘায় ভুগিবার কোনো কারণ নাই। ইহা শুধু আমাদেরই বক্তব্য নহে, উক্ত আলোচনা সভায়ও নানাভাবে উচ্চারিত হইয়াছে এই সতর্কবার্তা। এখনও দৃশ্য-অদৃশ্য চ্যালেঞ্জ অনেক। সর্বাপেক্ষা বড়ো চ্যালেঞ্জটি হইল ম্যালেরিয়ার প্রত্যাবর্তন। প্রসঙ্গত বলা প্রয়োজন যে, বাংলাদেশে ম্যালেরিয়া উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু হইয়াছিল ১৯৬০-এর দশকে। ইহার ফলশ্রুতিতে মাত্র এক দশকের মধ্যে ম্যালেরিয়া রোগীর সংখ্যা ৭ হাজারের নিচে নামিয়া আসিয়াছিল। কিন্তু এই অর্জন যে ধরিয়া রাখা সম্ভব হয় নাই বর্তমান পরিসংখ্যানই তাহার অকাট্য প্রমাণ হিসাবে উত্থাপিত হইতে পারে। বিশ্বের ম্যালেরিয়াপ্রবণ অপরাপর দেশগুলির অভিজ্ঞতাও ভিন্ন নহে। গত শতাব্দীর সত্তরের দশকেই এইসব দেশ হইতেও ম্যালেরিয়া প্রায় উচ্ছেদ হইয়া গিয়াছিল। কিন্তু তাহা আবার ফিরিয়া আসিয়াছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সামপ্রতিক একটি হিসাব অনুযায়ী, শতাধিক দেশ এবং পৃথিবীর জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ এখনও ম্যালেরিয়ার ঝুঁকির মধ্যে আছে। প্রতিবত্সর ৩০ হইতে ৫০ কোটি মানুষ আক্রান্ত হইতেছে মশাবাহিত এই রোগে। তন্মধ্যে প্রাণ হারাইতেছে ১৫ হইতে ২৭ লক্ষ। সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার অভাবনীয় উন্নতির এই যুগে বিশ্বব্যাপী ম্যালেরিয়ার এই সদম্ভ পুনরাবির্ভাব ও অবস্থানই বলিয়া দিতেছে যে, ব্যাধিটি কতোটা ভয়াবহ। বিশেষজ্ঞ ও গবেষকরা জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে ইহার একটি সম্পর্কসূত্র আছে বলিয়া মনে করেন। আমাদের উপকূলীয় জেলাগুলিতে তাহার প্রমাণও পাওয়া গিয়াছে। জলবায়ু পরিবর্তনের সর্বাপেক্ষা বড়ো ভিকটিম বা ভুক্তভোগী হিসাবে বাংলাদেশের জন্য ইহা যে গুরুতর একটি সতর্কবার্তা তাহা সহজেই অনুমেয়। প্রসঙ্গত ইহাও মনে রাখা আবশ্যক যে, আমাদের দেশে সচরাচর পরিসংখ্যান ও বাস্তবতার মধ্যে মিল খুব কমই খুঁজিয়া পাওয়া যায়। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, রাজধানী ঢাকাসহ যেই সকল জেলাকে ম্যালেরিয়ামুক্ত বলিয়া মনে করা হইতেছে তাহা যে সর্বাংশে সত্য নহে উক্ত আলোচনা সভাতেই তাহার আভাস পাওয়া গিয়াছে। তাই ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করিতে হইলে নির্মোহভাবে বাস্তবতার মুখোমুখি হইতে হইবে। গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করিতে হইবে সর্বপ্রকার সন্দেহ, সংশয় এবং ব্যর্থতাকে। শুধু সাফল্য কিংবা প্রকল্পনির্ভর হইলে চলিবে না। আশার কথা হইল, আমাদের স্বাস্থ্য খাতের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সেই প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতার কোনো অভাব নাই।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন