[ রা জ নী তি ]

সরকারের সামনে কঠিন সময়

আপডেট : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২১:১২
মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে বৃহস্পতিবার ফাঁসির আদেশ দিয়েছে তিন সদস্যবিশিষ্ট আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল-১। এই ট্রাইব্যুনালের এটি প্রথম রায়। এর আগে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল-২ মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধে জামায়াত নেতা আবুল কালাম আজাদ ওরফে বাচ্চুকে ফাঁসির এবং অপর জামাত নেতা আবদুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেছেন। বিচার কার্যক্রম শুরুর সময় থেকে দেশের বাইরে পলাতক রয়েছেন মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত আবুল কালাম আজাদ। ইতিমধ্যে তার আপিল করার সময়ও শেষ হয়ে গেছে। দাবি উঠেছে তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে তার ফাঁসির আদেশ কার্যকর করার। এদিকে আবদুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় বাতিল করে ফাঁসির দাবি জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, সংস্কৃতি কর্মী, ব্লগারসহ বিভিন্ন সংগঠনের তরুণরা ৫ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর শাহবাগ চত্বরে আন্দোলন শুরু করেন। ক্রমশ সে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। রাজধানী পার হয়ে বিভাগীয়, জেলা, উপজেলাসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্থাপিত হয় গণজাগরণ মঞ্চ। বিভিন্ন পেশা এবং বিভিন্ন বয়সের নারী ও পুরুষের মহামিলনের স্থানে পরিণত হয় এসব গণজাগরণ মঞ্চ। সরকারি দল আওয়ামী লীগ ও প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ অনেক রাজনৈতিক দল একাত্মতা প্রকাশ করে এ আন্দোলনের সাথে। তবে সরকারে আওয়ামী লীগের সহযোগীদের মধ্যে বাম দলগুলোর নেতৃবৃন্দকে কিছুটা বেশি তত্পর দেখা যায়। সময় অতিবাহিত হওয়া ও আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের ব্যাপকতা বৃদ্ধি পায়। গত ১০ ফেব্রুয়ারি শাহবাগের গণজাগরণের মঞ্চের আন্দোলনকারী পাঁচজন ব্লগার জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে এক স্মারকলিপি দেন। পত্রপত্রিকার রিপোর্ট হতে জানা যায়, স্মারকলিপিতে অন্তর্ভুক্ত দাবিগুলো ছিল -(১) কাদের মোল্লাসহ যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেয়া (২) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন করা (৩) জামায়াত-শিবিরসহ ধর্মভিত্তিক দলের রাজনীতি নিষিদ্ধ করা (৪) যেসব রাজনৈতিক দল, ব্যক্তি, শক্তি ও প্রতিষ্ঠান যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাবার চেষ্টা করছে, তাদের আইনের আওতায় এনে বিচার করা (৫) ১৯৭৫-এর পর সাজাপ্রাপ্ত ও বিচারাধীন যেসব যুদ্ধাপরাধী-রাজাকার-আলবদরকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে তাদের আবার গ্রেফতার করা এবং আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে বিচারের সম্মুখীন করা এবং (৬) জামায়াতের বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের অর্থের উত্স খুঁজে বের করে তা বন্ধ করা। এসব দাবির মধ্যে সরকার কেবলমাত্র আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধনের দাবিটি পূরণ করতে পেরেছে। ১৭ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (সংশোধন) বিলটি সংসদে পাস হওয়ার পরদিন রাষ্ট্রপতি কর্তৃক স্বাক্ষরিত হলে তা আইনে পরিণত হয়। এ বিলে আনা সংশোধনীগুলো হলো--এক. সরকার অথবা বাদী বা বিবাদী পক্ষ ট্রাইব্যুনালের রায়ের খালাস কিংবা যে কোনো দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করতে পারবে। দুই. রায় ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে উভয় পক্ষকে আপিল করতে হবে। তিন. আপিল দায়েরের ৬০ দিনের মধ্যে তা নিষ্পত্তি করতে হবে। চার.মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ব্যক্তি ছাড়াও যেকোনো সংগঠনের বিচার করা যাবে। ১০ ফেব্রুয়ারি স্পিকারের নিকট স্মারকলিপি প্রদান ও ১৭ ফেব্রুয়ারি সংসদে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের সংশোধনী পাস হওয়ার মধ্যবর্তী সময়কালে অর্থাত্ ১৫ ফেব্রুয়ারি রাতে শাহবাগ প্রজন্মের গণজাগরণের অন্যতম ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দার শোভন মিরপুরে তার বাড়ির সামনে নিহত হন। এ হত্যার জন্য গণজাগরণ মঞ্চ জামায়াত-শিবিরকে দায়ী করে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত গণজাগরণ মঞ্চ ছেড়ে না যাওয়ার ঘোষণা দেয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৬ ফেব্রুয়ারি নিহত ব্লগার রাজীব হায়দারের মিরপুরের বাসায় তার পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানাতে গিয়ে বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামী কোন গণতান্ত্রিক দল নয়। জামায়াত যে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন তা প্রমাণিত হয়েছে। এ কারণে জামায়াত-শিবিরের এদেশে রাজনীতি করার কোনো অধিকার নেই।’ ২১ ফেব্রুয়ারি ঘটনা কিছুটা নতুন মোড় নেয়। ওই দিন সন্ধ্যায় শাহবাগে মহাসমাবেশে আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক এবং ব্লগার এন্ড অনলাইন এক্টিভিস্ট নেটওয়ার্কের আহবায়ক ডা. এমরান এইচ সরকার ৬ দফা দাবি ও ১১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। মিডিয়ায় খবর অনুযায়ী ছয় দফা দাবিগুলো হলো--(১) ব্লগার রাজীব হায়দার, জাফর মুন্সী, বাহাদুর মিয়া, কিশোর রাসেল মাসউদ হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের সাতদিনের মধ্যে গ্রেফতার করা (২) ২৬ মার্চের আগে স্বাধীনতা বিরোধী জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার লক্ষ্যে যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যায় নেতৃত্বদানকারী এই দলটির বিরুদ্ধে সংশোধিত আইনের অধীনে অভিযোগ গঠন এবং নিষিদ্ধ করার আইনি প্রক্রিয়া শুরু করা (৩) অবিলম্বে যুদ্ধাপরাধী সংগঠনগুলোর আর্থিক উত্স চিহ্নিত করে সেগুলোকে আইনের আওতায় নিয়ে আসার জ্ন্য একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করা (৪) যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া গতিশীল ও অব্যাহত রাখতে অবিলম্বে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে স্থায়ী রূপ দেয়া (৫) গণমানুষের নিরাপত্তার স্বার্থে জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাস ও তাণ্ডব বন্ধে অবিলম্বে আইন-শৃংখলা বাহিনীকে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে সকল সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও গোপন আস্তানাসমূহ উত্খাত করা (৬) জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এদের ভয়ংকর রূপ প্রকাশ করা, যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষক এবং হত্যা ও সামপ্রদায়িকতার উস্কানিদাতা গণমাধ্যমগুলোর বিরুদ্ধে অবিলম্বে ব্যবস্থা নেয়া। এসব দাবির সাথে পরে যুক্ত হয়েছে ‘আমার দেশ’ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে গ্রেপ্তার করার। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি অপপ্রচারের মাধ্যমে শাহবাগ আন্দোলনের বিরুদ্ধে সহিংসতা ছড়াতে উস্কানি দিচ্ছেন। উপর্যুক্ত দাবিগুলো আদায়ে ঘোষণা করা হয়েছে বিভিন্ন কর্মসূচি। এসব কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে ছয় দফা দাবির প্রতি একাত্মতা জানাতে গণস্বাক্ষর অভিযান এবং স্পিকারের কাছে স্বাক্ষরগুলো পৌঁছানো; রায়েরবাজার বধ্যভূমি, মিরপুর গোলচত্বর, মতিঝিল শাপলা চত্বর, বাহাদুর শাহ পার্ক ও যাত্রাবাড়ি চৌরাস্তায় সমাবেশ এবং ৭ মার্চ সোরাওয়ার্দী উদ্যানের শিখা চিরন্তনে শ্রদ্ধা নিবেদন, সমাবেশ ও প্রতিবাদী গান; আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রতিটি রায় ঘোষণার আগের দিন জামায়াত-শিবিরের তাণ্ডব প্রতিহত করতে বিকেল ৩টা থেকে প্রজন্ম চত্বরের গণজাগরণ মঞ্চে জমায়েত। মাহমুদুর রহমানকে গ্রেপ্তারের দাবিতে গণজাগরণ মঞ্চের সংগঠকরা ২৬ ফেব্রুয়ারি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে সরকারের পক্ষে এসব দাবি পূরণ করা সম্ভব হবে কি? অবশ্য প্রধানমন্ত্রীর সামপ্রতিক বক্তব্যে পুরোপুরি না হলেও এ প্রশ্নের আংশিক উত্তর পাওয়া গেছে। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিসভার বৈঠকে তিনি বলেছেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে তার দল ও সরকার বদ্ধপরিকর। তবে আবেগে নয়, এ বিচার সম্পন্ন হবে আইনি কাঠামোর মাধ্যমে। বিচার বিভাগের প্রতি সবারই শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে। বিচার বিভাগ প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে, এমন কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি করা কারোই উচিত হবে না। রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার দাবি প সঙ্গে তিনি বলেছেন, রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার ব্যাপারে দেশে আইন-কানুন রয়েছে। এসব মাথায় রেখে সরকারকে এগোতে হবে, আবেগে কথা বলে পরিস্থিতি আরো জটিল করা ঠিক নয়। তিনি তার মন্ত্রিসভার সদস্যদের সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, তরুণরা আবেগের ভাষায় কথা বলতে পারে, তবে মন্ত্রীরা পারেন না। তারা যা বলবেন তা জেনে-বুঝে এবং দেশের সংবিধান ও আইনের আলোকে বলবেন (দৈনিক ইত্তেফাক, ২৬ ফেব্রুয়ারি)। প্রধানমন্ত্রী অন্যসব দাবির ব্যাপারে কথা বলেননি। কারণ এসব দাবির কয়েকটির রয়েছে আইনগত জটিলতা। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এসব দাবিকে কীভাবে দেখা হচ্ছে সরকারকে তা গভীরভাবে পর্যালোচনা করে দেখতে হবে। দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির আদেশে প্রজন্ম চত্বরের আন্দোলনকারীরাসহ আনন্দ প্রকাশ করেছেন দেশের অধিকাংশ মানুষ। তবে এতে দেশের পরিস্থিতি যে শান্ত হবে তা বলা যাচ্ছে না। সাঈদীর মামলার রায়ের দিনে জামায়াত সারা দেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতালের ডাক দেয়। দুপুর পর্যন্ত হরতাল মোটামুটি শান্তভাবে পালিত হলেও বাদ দুপুর রায় ঘোষণার পর রংপুর, দিনাজপুর, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে জামাতকর্মীদের সাথে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। এসব সংঘর্ষে এই নিবন্ধ লেখার সময় পর্যন্ত ৩৪ জন নিহত হয়েছেন বলে গণমাধ্যমে জানানো হয়েছে। পুলিশসহ আহতের সংখ্যা অনেক। ইতিমধ্যেই কথা ঊঠেছে মানবতাবিরোধী অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড ও ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধকরণের দাবিকে সরকার রাজনৈতিক পুঁজি হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করছে। কোনো কোনো বিশ্লেষকের মতে, এতে বহুল আলোচিত পদ্মাসেতুসহ সরকারবিরোধী অনেক অভিযোগ জনগণের দৃষ্টির আড়ালে চলে যাবে; তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ইস্যুতে বিরোধী দলের আন্দোলন বহুলাংশে স্তিমিত হয়ে পড়বে; জামায়াত-শিবির বিরোধী জনসচেতনতাকে জিইয়ে রাখতে পারলে জামায়াত কোণঠাসা হয়ে পড়বে; যুদ্ধাপরাধী ইস্যুতে জামায়াতকে বিএনপি হতে বিচ্ছিন্ন করা গেলে আগামী নির্বাচনে ভোটে এগিয়ে থাকবে আওয়ামী লীগ। তাই অনেকে বলছেন, সাধারণ মানুষ যখন বুঝতে পারবে যে, প্রজন্ম চত্বরের আন্দোলনকে সরকার আগামী নির্বাচনে জয়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে, তখন তারা আন্দোলন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে। অন্যদিকে গণজাগরণ মঞ্চের দাবি পূরণ না করলে আন্দোলনকারীরা যে সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবেন না তার নিশ্চয়তা কোথায়? এক কথায়, সরকারের সামনে এখন কঠিন সময়। তাই ভাবাবেগ পরিহার করে সরকারকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এগোতে হবে।  লেখক : সাবেক সচিব E-mail: latifm43¦gmail.com

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন