উদার গণতন্ত্র বনাম প্রতিহিংসার রাজনীতি

আপডেট : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২১:১৩
ইত্তেফাকে বাংলাদেশের উদার গণতান্ত্রিক রাজনীতির ভবিষ্যত্ নিয়ে খোলামেলা আলোচনা চলছে। এর জের ধরেই কিছু বলতে হয়। আমার একজন শিক্ষক বলেছিলেন, যদি সত্য কথা কারো স্বার্থের বিপক্ষে যায়, তবে সে ঐ সত্য কথাটাকে মিথ্যা বলবে। আর যদি কোন মিথ্যা কথা কারো স্বার্থের পক্ষে যায়, তবে সে ঐ মিথ্যা কথাটাকে সত্য বলে। তাই বলতে হয়, আমাদের দেশের সকল রাজনৈতিক ভবিষ্যত্ এই কথার ওপরই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরা যদি দেখেন কেউ তাদের স্বার্থের পক্ষে কাজ করে, তাহলে তারা ঐ সুরে বাঁশি বাজান। কিন্তু এতে যে দেশের বাকি ১৫/১৬ কোটি মানুষের দুর্ভোগ হচ্ছে তার কোন তোয়াক্কা করেন না। বর্তমানে বাংলাদেশে যে রাজনীতি চলছে সেটা যে উদার গণতান্ত্রিক রাজনীতি নয়, তা বলার জন্য বিস্তারিত লেখা নিষ্প্রয়োজন বলে মনে হয়। স্বাধীন দেশে এখন অনেকটা প্রতিহিংসার রাজনীতি চলছে। এই যে প্রতিহিংসামূলক রাজনীতি বর্তমানে বিরাজ করছে, এটার শেষ হবে কবে? আমরা কি একটা সুস্থ রাজনীতিতে ফিরতে পারবো না কখনোই? নির্বাচনের প্রাক্বালে বা তারও এক-দুই বছর আগে থেকে কেন এত অস্থিরতা? স্বাধীনতার ৪১বছর পরে এসে আমরা কতটা পরিবর্তন হতে পেরেছি? বর্তমানে বাংলাদেশে যে রাজনীতি চলছে এটা এক কথায় একটা অসুস্থ রাজনীতি, একটা সাংঘর্ষিক রাজনীতি। আর এই সাংঘর্ষিক রাজনীতির জন্য চরম মূল্য দিচ্ছে দেশের সর্বস্তরের সাধারণ জনগণ। যতদূর জানি, রাজনীতি হচ্ছে একটি জনসেবামূলক কাজ। উদার বলে যে একটা কথা আছে এটা বর্তমান বাংলাদেশের রাজনীতির ডিকশনারিতে বা অভিধানে নেই বললেই চলে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, বাংলাদেশের অনেক রাজনীতিবিদ আছেন যাদের উদার একটা মনই নেই, সবার আগে উদার একটা মনের জন্ম দিতে হবে। যে মনটা দেশ ও দেশের মানুষের জন্য সর্বদাই কাজ করার মানসিকতা তৈরি করবে। প্রতিবারই জনতার রায় নিয়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রতিশ্রুতি যখন আমাদের আবহাওয়ার পূর্বাভাসের মত একের পর এক মিথ্যে প্রমাণিত হতে থাকে, ক্ষমতার মসনদে বসে যখন রাজনৈতিক নেতারা ভুলে যান তাদের অতীত, ভাবতে চান না তারাও ঐ সাধারণ মানুষদেরই একজন; তখনই জনমনে প্রশ্ন জাগে এই কি গণতন্ত্র? তাইতো স্বাধীনতার ৪১ বছর পরও উন্নত বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলোর মত পূর্ণ সমর্থন নিয়ে ধারাবাহিকভাবে দ্বিতীয়বার সরকার গঠনে সক্ষম হতে দেখা যায়নি বাংলাদেশের কোন রাজনৈতিক দলকেই। এতে কদাচিত গৃহীত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডগুলোও মুখ থুবড়ে পড়ছে বার বার! এই প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে যেখানে থাইল্যান্ডসহ আমাদের আশেপাশের অন্য উন্নয়নশীল দেশগুলো ছুটছে রকেট গতিতে, সেখানে আমরা লোকাল ট্রেনে উন্নয়নের যাত্রী! দুর্নীতি যার গতিরোধ করছে প্রতিনিয়ত। বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক দেশ। গণতন্ত্রই জনগণের আরাধনা ও কামনা। কিন্তু দেশের রাজনৈতিক অবস্থা দেখে মোটেই মনে হয় না যে, এটি একটি গণতান্ত্রিক দেশ। বাংলাদেশ যেহেতু একটি গণতান্ত্রিক দেশ, তাই এখানে জনগণের মতামতকে প্রাধান্য দেয়া আবশ্যক। বাংলাদেশে দেখা যায় সরকারি দল বা বিরোধীদল যে কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তা জনগণের ওপর চাপিয়ে দেন। আর তা সাধারণ জনগণ মেনে নিতে বাধ্য হয়। তাই সরকারি দল বা বিরোধীদল দেশের যেকোন কর্মকাণ্ডে যে সিদ্ধান্তই গ্রহণ করেন না কেন তা যদি জনসাধারণের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে করেন তবেই বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে। কথায় আছে, ‘দশে মিলে করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ।’ তাই সরকারি দল ও বিরোধীদল সাধারণ জনগণের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করলেই রাজনৈতিক ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক রাজনীতির পরিচয় পাওয়া যাবে বলেই আমার ধারণা। পারস্পরিক সহনশীলতা, সমঝোতা ও সংলাপই উদার গণতান্ত্রিক রাজনীতির উজ্জ্বল ভবিষ্যত্ নির্ধারণ করতে পারে। কিন্তু দুঃখভরা হূদয়ে বলতে হয় যে, গণতন্ত্র আজ অন্ধকার কারাগারে বন্দিত্বের অপেক্ষায় প্রহর গুণছে। আর প্রহর গুণবেই না কেন? যে দেশে সুশীল সমাজ কোন গঠনমূলক সমালোচনা করলে অপমানিত হয়, গণমাধ্যমের বাকরুদ্ধ করে দেয়ার পাঁয়তারা করে প্রভাবশালী নেতারা, যে দেশে প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা ও আস্থা প্রদর্শনে সর্বোচ্চ কার্পণ্যতা দেখায়, সে দেশের গণতন্ত্র অশুভ শক্তির পাদপিষ্ট হয়ে যে কোন সময় প্রাণ হারানোর আশঙ্কাই থেকে যায়। তাই এখনই সময় আছে জেগে ওঠার। উদার গণতান্ত্রিক রাজনীতির চর্চা অব্যাহত রাখতে নেতাদের অবশ্যই হীন মানসিকতা পরিহার করতে হবে। সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যমের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। জনগণের স্বপ্নের বাস্তবায়ন করতে হবে। জনগণ এখন আর সরকারের প্রতি আস্থাশীল হয়ে থাকতে চায় না। তাই তো অনেকে বলেই ফেলেন, যে সরকারই আসুক আমাদের কোন লাভ নেই। তারা হারিয়ে ফেলেছে রাজনীতির প্রতি বিশ্বাস ও আস্থা। তাই জনগণ আর নীতির রাজার কাছে থাকতে চায় না। তারা জানতে পেরেছে নীতির রাজা তাদের কাছে নীতির প্রজা হিসেবেই ধরা দিবে। আর রাজা হবে তাদের কাছে যারা প্রত্যক্ষভাবে রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত। তাই দেশের রাজনীতিবিদদের কাছে আমাদের উদাত্ত আহ্বান, দেশের মানুষের মূল্যায়ন করুন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করুন। আর তাই আসন্ন নির্বাচনের জন্য জনমত যাচাই করুন, দেখুন জনগণ কোন মাধ্যমের নির্বাচন চায়। তত্ত্বাবধায়ক না অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। জনমতের সংখ্যাগরিষ্ঠের ভিত্তিতেই আসন্ন নির্বাচন দিন। দেশকে সংঘাতের দিকে ঠেলে দিবেন না। রাজনৈতিক নেতাদের নিকট উদাত্ত আহ্বান, আমাদের স্বাধীন দেশের মধ্যে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করুন, করবেন আশা করছি। লেখক :শিক্ষার্থী,ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগ(এমবিএ), কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন