অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত অতিথির স্মৃতি গল্পটি বুঝানোর জন্য শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে যেভাবে বক্তব্য দিতে পারেন এবং ছাত্রছাত্রীরা গল্পের মূলভাব অনুধাবন করতে পারে সেভাবেই তোমাদের জন্য শ্রেণিশিক্ষা পর্বে প্রবন্ধটির মর্মকথা তুলে ধরেছেন বাংলা বিষয়ের রোমানা আফরোজ।
লেখক পরিচিতি: বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও অপরাজেয় কথাশিল্পী শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তিনি ১৫ সেপ্টেম্বর, ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার দেবানন্দপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা: মতিলাল চট্টোপাধ্যায়, মাতা: ভুবনমোহিনী। শরত্চন্দ্রের ছেলেবেলা কাটে দারিদ্র্যের মধ্যে। তাই উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের বেশি পড়তে পারেন নি। চব্বিশ বছর বয়সে মনের ঝোঁকে সন্ন্যাসী হয়ে গৃহত্যাগ করেছিলেন। জীবিকার তাগিদে দেশ ছেড়ে গিয়েছিলেন বার্মায়। ১৯০৩ সালে রেঙ্গুনে (মায়ানমার) কেরানি পদে চাকরি পান। পরবর্তীতে সাহিত্য রচনাকেই পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। শরত্চন্দ্রের প্রথম মুদ্রিত রচনা কুন্তলীন পুরস্কারপ্রাপ্ত ‘মন্দির’ নামের একটি গল্প। ১৯০৭ সালে ‘ভারতী’ পত্রিকায় ‘বড়দিদি’ উপন্যাস প্রকাশিত হলে তাঁর সাহিত্যিক খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। একের পর এক গল্প-উপন্যাস লিখে তিনি পাঠক হূদয় জয় করেন। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাসগুলোর মধ্যে রয়েছে -দেবদাস, পল্লীসমাজ, চরিত্রহীন, শ্রীকান্ত, গৃহদাহ, দেনাপাওনা, পথের দাবী, বিরাজবৌ, শেষপ্রশ্ন ইত্যাদি। এসব উপন্যাসে বাঙালি নারীর প্রতিকৃতি অঙ্কনে তিনি অসামান্য দক্ষতা দেখিয়েছেন। তাঁর জীবনের নানা অভিজ্ঞতা ও বিচিত্র সব মানুষের চরিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন উপন্যাসে। তাঁর কয়েকটি উপন্যাস বিদেশি ভাষায়ও অনূদিত হয়েছে। তিনি সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতি হিসাবে ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ‘জগত্তারিণী’ পদক ও ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ‘ডি-লিট’ উপাধি লাভ করেন। এ কালজয়ী কথাশিল্পীর জীবনাবসান ঘটে ১৬ জানুয়ারি, ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে, কলকাতায়।
শ্রেণি শিক্ষা: ‘অতিথির স্মৃতি’ গল্পটি লেখকের একটি অনবদ্য ছোটগল্প। ‘দেওঘরের স্মৃৃতি’ গল্পটির নাম পাল্টে ঈষত্ পরিমার্জিত করে এর নাম রাখেন ‘অতিথির স্মৃতি’। আলোচ্য গল্পের কথক লেখক নিজেই। লেখক চিকিত্সকের পরামর্শে বায়ু পরিবর্তনের জন্য একবার দেওঘরে গিয়েছিলেন। এ গল্পে তিনি দেওঘরের পরিবেশ পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরেছেন। দেওঘরের প্রকৃতি লেখককে আকৃষ্ট করেছিল। তাই তাঁর বর্ণনায় প্রকৃতি ও পাখি প্রেমের পরিচয় ফুটে ওঠেছে। দেওঘরে লেখক একদিন এক কুকুরকে তাঁর অতিথি করে নিয়ে আসেন। চাকর-বাকরকে বলেন খাবার দেওয়ার জন্য। কিন্তু এতে তাদের গুরুতর আপত্তি ছিল। তাই লেখকের অতিথিকে উপোস করতে হতো। অতিথি গোপনে যেন কি নালিশ করতে চাইতো লেখকের কাছে। কিন্তু তা সে পারতো না কারণ ওর চেয়ে তুচ্ছ জীব শহরে হয়তো আর নেই। অবশেষে লেখকের বাড়ি ফেরার সময় হলো। লেখক চলে গেলেন কিন্তু যাওয়ার সময় মনে কোন আনন্দই পাননি। বার বার অতিথির কথা মনে পড়ছিল। লেখক অতিথি কুকুরটিকে অত্যধিক ভালবেসেছিলেন। তিনি ভাবছিলেন আজ থেকে কুকুরটি ফিরে গিয়ে আর লেখককে দেখতে পাবে না। কয়েকদিন গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থেকে লেখককে খুঁজবে। হয়তো নিস্তব্ধ মধ্যাহ্নের কোন ফাঁকে লুকিয়ে উপরে ওঠে খুঁজে দেখবে তাঁর ঘরটা। এই গল্পে তিনি পশুর প্রতি মানুষের যে ভালবাসা এবং মানুষের প্রতি পশুর যে ভালবাসা রয়েছে তার স্বরূপ নির্ণয় করেছেন। মানবেতর একটি প্রাণীর সাথে একটি অসুস্থ মানুষের কয়েকদিনের পরিচয়ের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা একটি মমত্বের সম্পর্কই এ গল্পের বিষয়। লেখক দেখিয়েছেন মানুষে মানুষে যেমন স্নেহ-প্রীতির সম্পর্ক গড়ে ওঠে, তেমনি অন্য জীবের সাথেও মানুষের সম্পর্ক গড়ে ওঠতে পারে। কারণ মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব, অন্যান্য প্রাণীর প্রতি তার দরদ ও ভালোবাসা থাকা স্বাভাবিক। মানুষ তার মমতা দিয়ে জীবজন্তুকে কাছে টানতে পারে, তাদেরকে আপন করে নিতে পারে। কিন্তু সেই সম্পর্ক স্থায়ীরূপ পেতে বাধাগ্রস্থ হয় নানা প্রতিকূলতায়। একটি মানুষ যখন কোন জীবের প্রতি মমতায় সিক্ত হয় তখন অন্য কোন মানুষের আচরণ হয়ে ওঠতে পারে নির্মম। সম্পর্কের এই বিচিত্র রূপ তুলে ধরা হয়েছে এ গল্পে।
