জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার বুধবার একমাত্র স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ফজলুল আজিমকে কথা কম বলিবার পরামর্শ দিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন, বেশি কথা বলিবার কারণে বেশি ভুল করেন। কথা কম বলিলে ভুল কম হয়। বেশি কথায় ভুল বেশি হয়। যাহাকে এই পরামর্শ দেওয়া হইয়াছে, তিনি সংসদে উত্থাপিত পরিসংখ্যান বিল ২০১৩-এর উপরে দেওয়া সংশোধনী প্রস্তাব নিয়া আলোচনায় রত ছিলেন। স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ফজলুল আজিম বিরোধীদলবিহীন সংসদকে ‘সো কলড’ সংসদ বলিয়া আখ্যা দেন। এই সংসদে মন্ত্রীরাও ঠিকমত হাজির থাকেন না বলিয়া আলোকপাত করেন। ইহার পর তাহাকে উক্ত পরামর্শটি দেওয়া হয়।
কথা হইল, বিরোধীদলের অনুপস্থিতিতে সংসদ বাস্তবিকই গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে। বিরোধীদলের লাগাতার অনুপস্থিতিতে ইহা প্রায় অকার্যকর এক সংসদে পরিণত হইয়া থাকে। এই প্রেক্ষাপটে কথা বলিবার এবং না-বলিবার — উভয়েরই বিপদ রহিয়াছে। এক দল বা জোটের উপস্থিতিতে সংসদে যেমন কথাবার্তা বা তর্ক-বিতর্ক জমে না, অনেকক্ষেত্রে তাহার মানেও থাকে না। ফলে কথা বলিতে গেলে নিজের জোট বা দলেরই সমালোচনা চলিয়া আসিতে পারে আলোচনায়, তাহাতে ফ্লোর ক্রসিংয়ের খড়গ নামিয়া আসিতে পারে। আবার একেবারে কথা না বলিলেও দল বা সরকারকে সাহায্য করা হয় না, আত্মতোষণের তোড়ে সরকার জনবিচ্ছিন্ন হইয়া যাইতে পারে। যাহা হউক, এক্ষেত্রে কথা বলিয়াছেন সরকারি দলের কেহ নহে, একজন স্বতন্ত্র সদস্য। তাই ডেপুটি স্পিকার এবং অন্যান্য সংসদ সদস্যের নিকট হইতে তিনি বিরোধীদলীয় সাংসদের মূল্যায়ন পাইয়াছেন।
কিন্তু কথা বলা গণতান্ত্রিক অধিকার। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সংঘাতের পরিবর্তে আলাপ-সংলাপের উপর জোরারোপ করা হইয়াছে। এমনকি গণতন্ত্র বাজে কথাকে, কথা একেবারে না বলিবার তুলনায় শ্রেয়তর মনে করে। অর্থাত্ মানুষকে কথা বলিতে দিতে হইবে। যিনি জ্ঞানী-বিচক্ষণ-কর্মী, তিনি অবশ্য অল্পবাক্যেই সারবস্তু হাজির করিতে পারেন বক্তব্যে, তেমনটিই কাম্য। বাচালতা এবং অনির্দিষ্ট বাক্যালাপ, স্বল্পজ্ঞান ও সঠিক জ্ঞানের অভাবের লক্ষণই বটে। রাজনীতিবিদদের ক্ষেত্রে ইহা অধিক লাগসই, যাহারা অধিক বাগাড়ম্বর দিয়াই তাহাদের স্বল্পকর্মকে আড়াল করিতে চান। কিন্তু গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আর উপায় কী! তাহাদের কথা বলিতে দিতেই হইবে, কথা কম বলিতে বাধ্য করা যাইবে না। বরং তাহাদের চাপ দেওয়া যায় কাজের কথা বলিবার জন্য। ফলে ডেপুটি স্পিকারের পরামর্শ হইতে পারিতো সঠিক বা প্রাসঙ্গিক কথা বলিবার জন্য, কম কথা বলিবার জন্য নহে।
