২০১৮ সাল নাগাদ প্রেসিডেন্ট পদ হইতে সরিয়া দাঁড়াইবার ঘোষণা দিয়াছেন কিউবার প্রেসিডেন্ট রাউল ক্যাস্ত্রো (৮১)। চলতি সপ্তাহে ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি কর্তৃক দ্বিতীয়বারের মত প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হইবার পরে প্রদত্ত ভাষণে এই ঘোষণা দিয়াছেন ১৯৫৯ সালের কিউবা বিপ্লবের নেতা ফিদেল ক্যাস্ত্রোর অন্যতম সহযোদ্ধা ও কনিষ্ঠ ভ্রাতা রাউল ক্যাস্ত্রো। কনিষ্ঠ ক্যাস্ত্রোর এই ঘোষণা নানাদিক হইতেই গুরুত্বপূর্ণ।
রাউল ক্যাস্ত্রোর ঘোষণার মধ্যে প্রথম যেই ঘটনাটি ঘটিবে তাহা হইতেছে কিউবার ক্ষমতা হইতে ক্যাস্ত্রোদের বিদায়। ইহাছাড়াও রাউল ক্যাস্ত্রো যাহাকে উত্তরসূরী মনোনীত করিয়াছেন তিনি হইতেছেন মিগুয়েল ডিয়াজ-ক্যানেল। তিনি ক্যাস্ত্রোদের সহযোদ্ধা র্যামন মাচাদো ভেনচুরার (৮১) স্থলাভিষিক্ত হইলেন। মাত্র ৫২ বত্সর বয়সী এই নেতা হইতেছেন বিপ্লবীদের বাইরে প্রথম একজন, যিনি এতটা উচ্চপদে আরোহণ করিলেন। সবকিছু ঠিকঠাক থাকিলে রাউল ক্যাস্ত্রোর পরে তিনিই প্রেসিডেন্ট হইবেন। ক্ষমতার শীর্ষস্থানে ক্যানেলের আগমন সমাজতান্ত্রিক কিউবাতে নতুন প্রজন্মের আগমনীবার্তা শুনাইতেছে বৈকি। নিজের বিদায় লইবার সময়সীমা ঘোষণা কিংবা উত্তরসূরীর নাম ঘোষণার বাইরে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘোষণা দিয়াছেন ক্যাস্ত্রো। নূতন ঘোষণা অনুসারে এখন হইতে কিউবাতে কোন ব্যক্তি দুই মেয়াদের অধিককাল প্রেসিডেন্ট পদে আসীন থাকিতে পারিবেন না। ইহাছাড়া প্রেসিডেন্ট পদের জন্য একটি বয়ঃসীমা বাঁধিয়া দিবার কথাও বলিয়াছেন তিনি।
রাউল ক্ষমতায় আসিবার পর হইতে পূর্বসূরী ফিদেল ক্যাস্ত্রোর আমলের কিছু কিছু অবস্থান হইতে সরিয়া আসিয়াছেন। ব্যক্তিমালিকানা খাতের প্রসার, রিয়াল এস্টেট মার্কেট বৈধকরণ, বিদেশ ভ্রমণ কড়াকড়ি কমাইয়া আনা ইহাদের মধ্যে অন্যতম। তবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদের জন্য মেয়াদ বাঁধিয়া দেওয়া ও বয়ঃসীমা নির্ধারণ করিবার ব্যাপারে তিনি একেবারে শুরুর দিক হইতেই কথাবার্তা বলিতে শুরু করিয়াছিলেন। এক্ষণে এই দুই ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়ার মধ্য দিয়া তিনি কিউবার সমাজতন্ত্র সম্পর্কে সারা বিশ্বের জন্য নূতন এক বার্তা পাঠাইতে সক্ষম হইলেন। কিউবা বা উত্তর কোরিয়ার মত সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলিতে এক ধরনের পরিবারতন্ত্র লক্ষ্য করা যায়। ইচ্ছা, অনিচ্ছা কিংবা প্রয়োজন যাহাই হউক না কেন, এই ঘটনা ঘটিয়াছে যাহা লইয়া অ-সমাজতান্ত্রিক বিশ্বে দীর্ঘদিন ধরিয়া ব্যাপক সমালোচনা বিষয়বস্তুতে পরিণত চলিয়া আসিতেছে। ক্যাস্ত্রোর ঘোষণার মধ্য দিয়া এই সমালোচনার অবসান ঘটে কিনা তাহা দেখিবার বিষয়।
রাউল ক্যাস্ত্রোর নূতন ঘোষণা দেশের মধ্যে বেশ ভালোভাবে গৃহীত হইয়াছে। কিন্তু অতীতের মত এইবারও যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের আশীর্বাদধন্য যুক্তরাষ্ট্র নিবাসী কিউবানদের মধ্যে এই ঘোষণা তেমন কোন সাড়া জাগাইতে ব্যর্থ হইয়াছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও ওয়েবসাইটগুলিতে দেখা যাইতেছে যে, তাহারা কিউবাতে তাহাদের ইচ্ছামাফিক যেই পরিবর্তন দেখিতে চাহেন তাহা রাউল ক্যাস্ত্রোর ঘোষণা দ্বারা পূরণ হওয়া সম্ভব নহে বলিয়া মনে করিতেছেন। তাহারা অতীতের ন্যায় এইবারও কিউবাতে তাহাদের পছন্দমাফিক পরিবর্তন আনয়নের জন্য ফিদেল ক্যাস্ত্রোর মৃত্যু কামনা করিয়া চলিয়াছেন। লক্ষণীয় বিষয় এই যে, সারা দুনিয়াব্যাপী মানবতার ঝাণ্ডা লইয়া ব্যাপক দৌড়ঝাঁপকারী কোন রাষ্ট্রকেই কখনোই এহেন অমানবিক আচরণের জন্য নিন্দা-মন্দ করিতে দেখা গেল না। ঘটনা এইখানেই শেষ নহে—ফিদেল ক্যাস্ত্রোর যেকোন অসুস্থতার খবরকেই ফুলাইয়া-ফাঁপাইয়া তাঁহার অন্তিম পর্যায় বানাইয়া ফেলাতেও দশকের পর দশক ধরিয়া পারঙ্গমতার পরিচয় দিতেছে পশ্চিমের মূলধারার সংবাদমাধ্যম। একটি স্বাধীন দেশের বিরুদ্ধে এইহেন কর্মকাণ্ড কতদিন ধরিয়া চলিতে থাকিবে তাহাই হইতেছে প্রশ্ন।
