স্মরণ

নির্ভীক এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব শওকত আলী

আপডেট : ০১ মার্চ ২০১৩, ২০:৫১
ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলন অধ্যায়ে শওকত আলী একটি সুপরিচিত নাম। ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য শওকত ছাত্রজীবনেই রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন। ১৯১৮ সালের ২০ এপ্রিল পুরাতন ঢাকার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে শওকত আলী জন্মগ্রহণ করেন। পিতা শমশের আলী ও মাতা মেহেরুন্নেছা খানম। পুরোনো ঢাকাবাসীর গর্বের ধন এই ভাষা সংগ্রামী ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতা আন্দোলনসহ প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে যে বীরত্বের পরিচয় দিয়েছেন জাতি তা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ রাখবে। ভাষা আন্দোলনের সবকয়টি অধ্যায়ে শওকত আলী ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন এবং নেতৃত্ব দিয়েছেন। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে যে তিনটি সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়েছিল সেই তিনটি সংগ্রাম পরিষদের সদস্য হওয়ার গৌরব রয়েছে এই ভাষা সৈনিকের। ১৯৪৭ সালে ভাষা আন্দোলনের সূচনালগ্ন থেকেই তিনি সক্রিয়ভাবে এ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। পুরান ঢাকার উর্দুভাষী জনগণ (ঢাকাইয়াবাসী) প্রথম দিকে ভাষা আন্দোলনের বিপক্ষে অবস্থান নেন। পরবর্তীতে ঢাকাইয়াদের আন্দোলনে সম্পৃক্ত করতে শওকত আলীর ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ দেশব্যাপী রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের ডাকা প্রথম হরতালে যেসব নেতা ঢাকার রাজপথে অত্যন্ত বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন শওকত আলী তাদের মধ্যে অন্যতম। তিনি ১১ মার্চের হরতাল চলাকালীন পিকেটিং-এর এক পর্যায়ে পুলিশের আইজি জাকির হোসেনের গাড়ির গতিরোধ করেন। পরবর্তীতে পুলিশের বেধড়ক লাঠিচার্জে তিনি গুরুতর আহত হন। তত্ক্ষণাত্ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাকে রিকশাযোগে হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিত্সা নেয়ার পর পুনরায় তিনি আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং গ্রেফতার হন। ভাষা আন্দোলন চলাকালীন তিনি সবচেয়ে বেশি পুলিশী নির্যাতনের শিকার হন। আন্দোলনে নেতৃত্বদানের অপরাধে শওকত আলী ২ মার্চ ১৯৫২ তারিখে গ্রেফতার হন এবং বহুদিন জেলে আটক ছিলেন (সূত্র: সাপ্তাহিক সৈনিক, ২২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫৩)। শওকত আলীর ১৫০ নং চকমোগলটুলীর বাসভবনটিও (লীগ অফিস নামে পরিচিত) ঐতিহাসিক দিক থেকে অধিক গুরুত্ব বহন করে। এ বাড়িটি ছিল ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলনের কর্মী বাহিনীর মিলনক্ষেত্র। বিভাগ পূর্বকালে ১৫০ মোগলটুলীতে স্থাপিত হয়েছিল ‘ওয়ার্কাস ক্যাম্প ও মুসলিম লীগ পার্টি হাউজ’। তখন এখানেই সে সময়ের প্রগতিশীল ছাত্র- যুবক ও রাজনৈতিক কর্মীরা মিলিত হতেন। (সূত্র:‘যারা অমর ভাষা সংগ্রামে’- এম আর মাহবুব)। রাজনীতি চর্চার সূতিকাগার হিসাবে পরিচিতি ছিল এই বাড়িটি। ভাষা আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক কার্যক্রম এখান থেকেই পরিচালিত হতো। ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের গোপন ঘাঁটি ছিল এই বাড়িটি। এখানে মুক্তিযোদ্ধাদের গোপন বৈঠকসহ তাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা হতো। এসবই খুব সতর্কতার সাথে এবং গোপনীয়তা রক্ষা করে করা হতো শওকত আলীর নিজস্ব তত্ত্বাবধানে। মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করতে শওকত আলী অক্লান্ত পরিশ্রম করতেন। তার নিজস্ব তহবিল থেকে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের আর্থিক সহযোগিতা ও চিকিত্সা ব্যয় বহন করতেন। কয়েকবার এই বাড়িটি পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের দোসর রাজাকার, আলবদর বাহিনী দ্বারা আক্রান্ত হয়। তারা একাধিকবার শওকত আলীকে হত্যার অপচেষ্টা চালায়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাজনৈতিক সহোদর ও বন্ধু জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার দুঃসংবাদে শওকত আলী মারাত্মক ব্রেইন স্ট্রোকে আক্রান্ত হন এবং হসপিটালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় ১৯৭৫ সালের ১৮ আগস্ট তিনি পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নেন। তাকে জুরাইন কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। ভাষা আন্দোলনে তার কৃতিত্বপূর্ণ ও গৌরবময় অবদানের জন্য গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার মরহুম শওকত আলীকে ২০১১ সালের মরণোত্তর “একুশে পদকে” ভূষিত করেন এবং ঢাকা সিটি করপোরেশন মহান ভাষা আন্দোলনে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১০ সালে শওকত আলীর নামে ধানমণ্ডিস্থ ৪/এ সড়কটির নামকরণ করে। তিনি জাতির গর্বিত সন্তানদের একজন। লেখক: গবেষক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন