যুদ্ধাপরাধ বিচারের দায় এতোদিনে পূরণ হচ্ছে। তরুণ প্রজন্মের হাত ধরে সূচিত নবজাগরণ বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রটির সঠিক পথনির্দেশ করে এই দায় মেটাতে বাধ্য করছে শাসককুলকে। আমাদের পিতারা চার দশক আগে পাকিস্তানের অঙ্গীভূত বাংলার মুসলমানপ্রধান পূর্বাঞ্চলকে পাঞ্জাবি ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠীর দখলমুক্ত করে বাংলাদেশ নামের একটি আধুনিক রাষ্ট্র উপহার দিয়েছিলেন। বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে এ রাষ্ট্র কায়েমের মাধ্যমে তারা ‘হিন্দুস্থান’ ও ‘পাকিস্তান’ নামের ‘ধর্মীয়’ রাষ্ট্ররূপে ভারত ভাগের অযৌক্তিকতা ও অস্বাভাবিকতা প্রমাণ করে ছেড়েছিলেন। তথাপি প্রত্যক্ষ বৈষম্য, নিপীড়ন, অপরায়নের শিকার বৃহত্তর স্বজাতীয় বাঙালি জনগোষ্ঠীর দাবি-দাওয়ার প্রশ্ন উপেক্ষা করে নিজেদের কায়েমি ও ইহজাগতিক স্বার্থ অক্ষুণ্ন রাখতে একদল বাঙালি মুসলমান ধর্মের দোহাই পেড়েই ভাতৃঘাতী হয়ে উঠেছিল। পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠীর তাঁবেদার হয়ে আপন জনগোষ্ঠীর ওপর ‘গণহত্যা’ চালাতে এবং রাজাকার-আলবদর-আলশামস নামের আধাসামরিক বাহিনী গঠন করে ‘শান্তি ও শৃঙ্ক্ষলা’ রক্ষার নামে নিজেরাও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিল।
স্বদেশ-স্বজাতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতাকারী রাজাকার-আলবদর বাহিনীর নেতৃত্বদানকারী যুদ্ধাপরাধীরাই জামায়াত-ই-ইসলামীর বর্তমান নেতৃত্ব। ক্ষমতা ও স্বার্থের বাস্তব লড়াইয়ে সর্বদা সামিল থেকেও রাজনৈতিক এই দলটি কোনো এক ‘চিরন্তন’ ইসলামকে জগত্-জীবন-রাষ্ট্রের ভিত্তিকাঠামো হিসেবে প্রতিষ্ঠায় তত্পর রয়েছে বলে আজগুবি প্রস্তাব হাজির করে। তাদের দাবি, অন্যান্য দল ইহজাগতিক নীতি-আদর্শ-স্বার্থ-অধিকার ইত্যাদি সংরক্ষণের জন্য রাজনীতি করলেও তাদের রাজনীতি ক্ষমতা-নীতি-আদর্শ-স্বার্থ-অধিকার-আত্মপরিচয় সংরক্ষণের ইহজাগতিকতা পেরিয়ে ‘ধর্মীয়’ কর্তব্য পালনের সামিল।
স্বাধীন বাংলাদেশের শুরু থেকেই পুনর্বাসিত হয়ে তারা একসময় রাষ্ট্রযন্ত্রেরই হাতল চেপে বসেছে, রাষ্ট্রক্ষমতার অংশীদার হয়েছে। ফলত চারদশকেও পিতৃঋণ শুধতে পারিনি আমরা, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়নি ক্ষমতালোভী ভোট রাজনীতির হিসেব-নিকেশে। নতুন প্রজন্ম হাজারে হাজারে কাতারে কাতারে শাহবাগে হাজির হয়ে দলীয় পকেট থেকে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ ছিনিয়ে নিয়ে জনমানুষের হাতে ফিরিয়ে দিয়েছে। এতোদিনের নানা-বর্ণের সামরিক-বেসামরিক-বণিক-স্বৈরশাসকগোষ্ঠীর সমঝোতার রাজনীতি প্রত্যাখ্যান করে তারা মাঠে নেমেছে আজ পিতৃঋণ শোধ করতে। যুদ্ধাপরাধী সাঈদীর মৃত্যুদণ্ডাদেশ সেই দায় মেটানোর পথে মাত্র প্রথম পদক্ষেপ। প্রতিবাদের চূড়ান্ত সীমায় দাঁড়িয়ে আজ নবপ্রজন্ম নিজেদের সংঘবদ্ধার শক্তিমত্তা চিনতে পেরেছে, সন্ধান পেয়েছে কীভাবে রাজনৈতিকভাবে সজাগ থেকে অহিংস উপায়ে রাস্তা ও জনচৈতন্য নিজেদের ভাবনায় প্লাবিত করা যায়, বুনিয়াদী ক্ষমতাকাঠামোর ভিত নড়বড়ে করে দেয়া যায়। তাই আশা করবো প্রজন্ম চত্বরের প্রতীক রাষ্ট্রের চরিত্র ও জনসমাজের বিন্যাস আমূল পরিবর্তনের সম্ভাবনা জারি রাখবে: প্রশ্নহীন বিজয়োল্লাসের চোরাবালিতে আটকা পড়ে রাষ্ট্রকাঠামোর নিপীড়নমূলক শক্তি বৃদ্ধি করবে না; ধর্মীয় অন্ধত্ব ও প্রতিক্রিয়াশীতার সমতুল্য উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদে ইন্ধন যোগাবে না; ভিন্নমত-মতাদর্শ-বিশ্বাস প্রকাশের পথ খোলা রাখবে।
কিন্তু এমনই এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি এতোকাল চর্চিত হয়েছে এদেশে যে একজন যুদ্ধাপরাধীকে বাঁচাতে আগ্রহীর সংখ্যাও বেশুমার, এমনই অন্ধত্ব তাদের। একবারও তারা ভাবছে না যে একজন গণহত্যাকারীকে বাঁচাতেই তারা সংঘাতে লিপ্ত হচ্ছে। কিন্তু তবু তাদের যেন আমরা বলিদানের উপযুক্ত পশু না ভাবি, তাদের কেবলই ‘সন্ত্রাসী’, ‘ধর্মোন্মাদ’ ’অপর’ হিসেবে চিহ্নিত না করি। মৃত্যুর সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, আরও বাড়বে, সাথে ধ্বংসযজ্ঞের পরিমাণও। মার্কিনী ছাঁচের ‘সন্ত্রাস বিরোধী অনন্ত যুদ্ধের’ পরিস্থিতি যেন সৃষ্টি না হয় সে বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে। তবেই পিতৃঋণমুক্ত হয়ে মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নজাড়িত স্বাধীনতা, ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা, সহনশীলতা, সহমর্মিতা ও ভাতৃত্বের সমাজ গড়তে পারবো আমরা।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ,
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
