যৌতুক ও চরম দারিদ্র্য

আপডেট : ০২ মার্চ ২০১৩, ২১:০২
যৌতুকের প্রভাবকে সাইক্লোন, বন্যা এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে তুলনা করা উন্নয়ন কর্মীদের কাছে বিরল নয়। যদিও যৌতুক প্রাকৃতিক ও পূর্বানুমান অযোগ্য কোন বিষয় নয়। এটি এমন কিছু যা বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে অপেক্ষাকৃত অল্প সময়ের মধ্যে অনুপ্রবেশ করেছে। এর ধারাবাহিক অনুশীলনের ফলে দারিদ্র্যের চক্র আরও দৃঢ়ভাবে স্থাপিত হয়েছে যা চলমান দারিদ্র্য বিমোচনে প্রকল্পগুলোর কার্যকারিতাকে একের পর এক বাধাগ্রস্ত করছে। যৌতুক প্রথাকে নিয়ন্ত্রণে অনেকগুলো এনজিওর চলমান প্রচেষ্টা সত্ত্বেও ২০০৮ সালে আন্তর্জাতিক খাদ্য নীতি গবেষণা ইন্সটিটিউট একে বাংলাদেশের দারিদ্র্যের প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। যৌতুককে সাধারণভাবে বিস্তৃত দারিদ্র্য এজেন্ডার অধীনে নারীর সম্প্রসারিত নিজস্ব অধিকারের অংশ হিসেবে বিচার করা হয়। যাহোক, অতিদারিদ্র্য জনগোষ্ঠীর সাথে যৌতুকের যোগসূত্র বুঝতে আরও বেশি গবেষণা করা দরকার। এ বিষয়ে আরো জানাশোনার প্রয়োজনীয়তা বেড়ে গিয়েছে যেহেতু গত কয়েক বছরে দাতাদের সহায়তায় বাংলাদেশ সরকার অতিদরিদ্র কমিয়ে আনতে বেশ কিছু কর্মকৌশল গ্রহণ করেছে। এসব কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে সিঁড়ি, দি চর লাইভলিহুডস প্রোগ্রাম, আরবান পার্টনারশিপস ফর পভার্টি রিডাকসন, ব্র্যাকের টার্গেটিং দি আল্ট্রা পুওর প্রোগ্রাম। এসকল কর্মসূচিকে সাধারণভাবে দু’ভাগে ভাগ করা যায়, পরিবারগুলোতে স্থায়ী সম্পদ সরবরাহ করা অথবা ব্যক্তি অধিকার ও মর্যাদা সম্পর্কে সচেতন করে তোলা। উভয় মডেলের উদ্দেশ্যই হল পরিবারগুলোর আয় উন্নয়ন, কর্মদক্ষতা সৃষ্টি এবং সর্বোপরি পরিবার-পরিজনকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনা। এসব কর্মসূচি স্বল্প মেয়াদে ফলপ্রসূ প্রমাণিত হয়েছে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে যৌতুকের প্রভাবকে দুর্বল করতে এ প্রক্রিয়া ব্যর্থ। গ্রামাঞ্চলে বিয়ের ক্ষেত্রে প্রায়শই যৌতুক একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। যুবক-যুবতীদের অভিভাবকগণ বিয়ের পূর্বে যৌতুকের সঠিক পরিমাণ ঠিক করতে একটা উল্লেখযোগ্য সময় ব্যয় করে। এমন প্রায় বড় অংকের অর্থ যোগাড় করতে পরিবারগুলোকে সংগ্রাম করতে হয়। যেহেতু অনেক মানুষ বিশ্বাস করে যে যৌতুক ছাড়া বিয়ে দেয়া অসম্ভব। গবেষণা থেকে দেখা যায়, সহনীয় মাত্রার দরিদ্র পরিবারগুলো যৌতুকের টাকা যোগাড় করতে কিছু ভিন্ন ভিন্ন কৌশল গ্রহণ করে, যেমন তারা ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান থেকে একাধিক ঋণ গ্রহণ করে অথবা তারা তাদের জমিজমা এবং বিভিন্ন সম্পত্তিও বিক্রয় করে। অন্যদিকে অতিদরিদ্রদের যেহেতু জমি নেই, সম্পদ সীমিত, আয় কম এবং ক্ষুদ্রঋণ নেওয়ার সুযোগ নেই, তাই তাদের টিকে থাকার বিভিন্ন কৌশল গ্রহণ করতে হয়। অতিদরিদ্ররা স্থানীয় লোকজনের দয়া ও দানের উপর নির্ভরশীল, যেখানে চাঁদা, হাট হতে সংগ্রহ, উচ্চ সুদে ঋণ এবং শিশুশ্রমে জড়িত হওয়া ইত্যাদি নানাবিধ কৌশলে যৌতুকের টাকা সংগ্রহ করে। যাহোক, একটা দরিদ্র পরিবারের জন্য এ কঠিন পন্থা কিছুটা সহজ হয় যখন তাদেরকে উপরোক্ত দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচির সাথে যুক্ত করা হয়। যখন চরম দরিদ্র মানুষগুলো এসব কর্মসূচির সুবিধা ভোগ করে তখন তাদের আয় উপার্জনের সুবিধা বৃদ্ধি পায় এবং সম্পদের ভিত তৈরি হয়ে সমাজে তাদের অবস্থানের পরিবর্তন ঘটে। এসব মানুষদের আর চরম দারিদ্র্যে বাস করতে দেখা যায় না এবং ফলে তাদেরকে দয়া-দাক্ষিণ্যের অনুগ্রাহী হতে হয় না। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় তারা একটি প্রতিষ্ঠিত এনজিওর সাথে যুক্ত হয়ে ও সমর্থন পেয়ে সম্পত্তির মালিক হতে পারে। এ পরিবর্তনের ফলে একসময়ের অতি দরিদ্র মানুষগুলো সহনীয় দরিদ্র পরিবারগুলোর মত কৌশল অবলম্বন করে - যৌতুক প্রথা যার অন্তর্ভুক্ত। প্রকল্প কর্ম নির্বাহ করে দারিদ্র্য বিমোচনের ক্ষেত্রে যেসব অর্জন এসেছে, এ বাস্তবতা সেগুলোকে হ্রাস করে দিতে পারে। যেহেতু সুবিধাভোগকারীরা সহনীয় দারিদ্র্য অবস্থায় নবীন, তাই এ শ্রেণীতে তাদের পদচারণা দোদুল্যমান এবং তারা চরম দারিদ্র্যে ছিটকে পড়ার ঝুঁকিতে বসবাস করে। যৌতুক প্রথার ক্ষেত্রে প্রায়ই এমন পরিস্থিতি দৃশ্যমান হয়। মানুষগুলো তাদের নতুন অর্জিত সম্পত্তি বিক্রি করতে বাধ্য হয়। সঞ্চিত অর্থ খরচ করে এবং তারা অন্য প্রকল্প গ্রহণ করতে পারে যা পর্যায়ক্রমে তাদের আবার অতি দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দেয়। এমন বিচ্যুতি পরিবারগুলোতে ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে যেহেতু সুবিধাভোগীদের এখনও সমাজ এনজিওর সমর্থনপুষ্ট হিসেবে দেখে। পূর্বে তারা যে সাহায্য দিয়েছিল তা দিতে অনীহা হয়। তাছাড়া, যেসব লোক একটা কর্মসূচি থেকে সুবিধা লাভ করে, অন্য কর্মসূচিগুলো তাদের সুবিধা প্রদান করতে অনীহা প্রকাশ করে। অতঃপর সে পরিবারগুলো আরও খারাপ পরিস্থিতির মধ্যে পতিত হয়। এমন পরিস্থিতি অতিদারিদ্র্য নিরসনের কর্মসূচিগুলোর ফলাফল ও তাদের মূল উদ্দেশ্য সম্পর্কে তাত্পর্যপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে। যৌতুক প্রথা নিরসনে শক্তিশালী ব্যবস্থা ও পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে অতিদরিদ্রদের দারিদ্র্যমুক্ত করার লক্ষ্যে গৃহীত কার্যক্রমগুলো আসলে পরিবারগুলোর শোচনীয় অবস্থা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে, যেখানে তাদেরকে পূর্বের চেয়েও আরও বেশি চরম দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিতে পারে। যৌতুক কোন প্রাকৃতিক বিষয় নয় এবং আমাদের এটা এমন কিছু একটা বিবেচনা করা উচিত নয়।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন