সরকার গত বত্সরের জুন মাসে অবাধে লবণ আমদানির অনুমতি দেয়। অনুমতি দেয়ার কারণ গত ২০১১-১২ মৌসুমে দেশে চাহিদার তুলনায় কম লবণ উত্পাদিত হয়। উত্পাদন কম হওয়ায় ঘাটতির কারণে বাজারে লবণের দাম অত্যধিক বাড়িয়া যায়। সেই বাড়তির পরিমাণ কেজিপ্রতি ১০ টাকায় দাঁড়ায়। সেই বাস্তবতার প্রেক্ষিতে লবণ আমদানির অনুমতি মেলে। কিন্তু সেই সুযোগে নিম্নমানের লবণ আমদানিপূর্বক তাহা প্যাকেটজাত করিয়া চড়া দামে বিক্রির অভিযোগ আসিয়াছে খোদ সরকারি সংস্থা ট্যারিফ কমিশনের বক্তব্যে। অভিযোগে প্রকাশ, কিছুসংখ্যক অসাধু ব্যবসায়ী, যাহারা লবণ ব্যবসার সাথে জড়িত নয় এবং যাহাদের কোন কারখানা নাই, তাহারা বিভিন্ন দেশ হইতে নিম্নমানের লবণ আমদানি করেন এবং সরকারের অনুমোদনের তোয়াক্কা না করিয়া তাহারা তাহা বাজারজাত করিতেছেন। এই ক্ষেত্রে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মোড়ক নকলেরও অভিযোগ ওঠে। তবে বিষয়টি খতাইয়া দেখা দরকার এবং অতিশয় গুরুত্বের সাথে ত্বরিত ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।
প্রশ্ন হইল, অনুমোদনের তোয়াক্কা না করিয়া নিম্নমানের লবণ বাজারজাত করার মানসে যাহারা এই ব্যবসার সাথে আদৌ জড়িত নয় তাহারা কি করিয়া উচ্চমূল্যের সুবিধা নেওয়ার জন্য লবণ আমদানি করিতে সক্ষম হয়? অবাধে লবণ আমদানির অনুমতি মানে এই হওয়া উচিত নয় যে, যে কেউ লবণ আমদানি করিতে পারিবে। বাজার অর্থনীতি কখনো বলে না যে, পণ্যের গুণগত মানের নিশ্চয়তা বাজারে অংশগ্রহণকারী ক্রেতা-বিক্রেতাদের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া দ্বারা আসিবে। বরং গুণগত মানের নিশ্চয়তার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গকে একটা নির্দিষ্ট মানদণ্ডের দ্বারা বাজারে কাহারা অংশগ্রহণ করিতে পারিবে তাহা নিয়ন্ত্রণ করিতে হইবে। হঠাত্ করিয়া কোন একটা মৌসুমে উচ্চমূল্যের সুবিধা নিতে যাহারা কোন পণ্যের ব্যবসায় ঢুকিবে তাহারা কখনোই গুণগত মানের নিশ্চয়তা দিবে না। সেজন্য সরকারের আমদানি নীতির ক্ষেত্রে মৌসুমী আমদানিকারকদের ব্যাপারে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করিতে হইবে। এই ধরনের নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বাজারে বিদ্যমান বিক্রেতারা সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করিতেই পারে। সেক্ষেত্রে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে কৌশলি হইতে হইবে তাহা বন্ধের জন্য। তবে দেশের ভিতরে নিম্নমানের পণ্য বাজারজাত করিতে পারিলে এবং ইহার জন্য পর্যাপ্ত শাস্তির ব্যবস্থা না থাকিলে বিদ্যমান ব্যবসায়ীদের কেহ কেহ নিম্নমানের পণ্য আমদানিতে উত্সাহিত হইতে পারে। ফলে পণ্যের গুণগত মান নিয়ন্ত্রণে অভ্যন্তরীণভাবে কঠোর হইতে না পারিলে নিম্নমানের পণ্য উত্পাদন ও আমদানি দুইটিই চলিতে থাকিবে। আর চলিতেছে বলিয়াই আমরা আমাদের বাজারের সর্বত্র ভেজালের ছড়াছড়ি দেখিতেছি। এই ধরনের অবাধ বাণিজ্য চলিতে থাকায় সত্ ব্যবসায়ীরা মার খাইয়া যাইতেছে অথবা কেহ কেহ বাজারে টিকিয়া থাকার জন্য অসত্ হইয়া যাইতেছে। যাহার প্রভাব পড়িতেছে ষোল কোটি মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর। শুধুমাত্র কম দামি জিনিস বেশি দাম দিয়া কিনিয়া খাওয়ার বিষয় কিন্তু ইহা নহে। একটা পুরো জাতির নূতন প্রজন্ম স্বাস্থ্যহীন হইয়া পড়িতেছে এই ভেজালের ছড়াছড়ির কারণে। অতএব, বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে ভবিষ্যত্ প্রজন্মকে দক্ষ জনশক্তি হিসাবে গড়িয়া তুলিতে এই ভেজালের চক্র হইতে বাহির হইয়া আসিতে হইবে।
