আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে

আপডেট : ০২ মার্চ ২০১৩, ২১:৩৯
জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর দেলওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলার রায়ের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংস ঘটনায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যসহ অন্তত অর্ধশত জনের প্রাণহানি ঘটেছে। এসব ঘটনায় আমরা সাধারণ জনগণ গভীরভাবে উদ্বিগ্ন ও বিচলিত। এ অবস্থায় সরকারকে বিচক্ষণতার সঙ্গে এবং শক্ত হাতে পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে। কারণ জনগণের জানমালের নিরাপত্তার দায়িত্ব তাদেরই। বিশৃঙ্খলা দমনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে যেমন কঠোর হতে হবে, তেমনি মানবাধিকারকেও অগ্রাহ্য করা যাবে না। আবার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের নামে সাধারণ জনগণকে হয়রানি করা যাবে না। তাদের বাড়াবাড়ির কারণে যাতে পরিস্থিতির অবনতি না হয়, সে ব্যাপারে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত প্রত্যেক সদস্যকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। গণতান্ত্রিক সমাজে একটি মৌলিক উপাদান আইনের শাসন। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে আছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। তাদের পক্ষপাতহীনভাবে কোনোরূপ অনুরাগ-বিরাগ ব্যতিরেকেই এ দায়িত্ব সম্পন্ন করতে হয়। এতে শৈথিল্য কিংবা পক্ষপাতমূলক আচরণ তাদের ভূমিকাকে করে প্রশ্নবিদ্ধ। শিথিল হয় তাদের প্রতি জনগণের আস্থা। এটি গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার প্রতি হুমকিস্বরূপ। নিকট অতীতে আমরা দেখেছি, আইনের শাসন যখন গুরুতরভাবে ব্যাহত হয়, তখন এক পর্যায়ে গণতন্ত্রই মুখ থুবড়ে পড়ে। সেই গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে বারবার অনেক খেসারত দিতে হয়েছে দেশবাসীকে। অতি সম্প্রতি ওই প্রবণতাই আরও জোরদার হতে দেখে আমরা শঙ্কিত। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মানবতাবিরোধী কার্যকলাপের অপরাধে কিছু ব্যক্তির বিচার চলছে। কয়েকটি রাজনৈতিক দল ও তাদের ছাত্র সংগঠনের দাবি, সে বিচার করা যাবে না। এ দাবি তারা নিয়মতান্ত্রিকভাবে না করে সহিংস হরতালসহ আইনবিরোধী অনেক পন্থাই গ্রহণ করছে। একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ গত বৃহস্পতিবার সাঈদীর মামলার রায় ঘোষণার পর বাদীপক্ষের আইনজীবীরা ন্যায়বিচার পেয়েছেন বলে জানান। অন্যদিকে বিবাদীপক্ষের আইনজীবীরা বলেছেন, তারা এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবেন। সংশ্লিষ্ট সবার মনে রাখা উচিত, অপরাধের বিচার একটি আইনি প্রক্রিয়া। ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের অধীনেই যুদ্ধাপরাধের বিচার হচ্ছে, যে আইনটি অতীতে কোনো সরকারই বাতিল করেনি। এখানে বিবাদীপক্ষ আত্মপক্ষ সমর্থনের সম্পূর্ণ সুযোগ পাচ্ছে, আইনটি সংশোধনের পর বাদী ও বিবাদী উভয়পক্ষ আপিল করতে পারছে। অতএব, আদালতের মাধ্যমেই এ আইনে দায়ের করা সব মামলার যৌক্তিক পরিণতি হবে। কোনো মামলার রায়ই দু’পক্ষকে খুশি করে না। একপক্ষ খুশি হলে অন্যপক্ষ সংক্ষুব্ধ হবে। সেক্ষেত্রে উচ্চ আদালতে আপিল করাই হচ্ছে বিধান। সাঈদীর ছেলে মাসুদ সাঈদী এবং তার আইনজীবী আব্দুর রাজ্জাক উচ্চতর আদালতে আপিল করার কথা বলেছেন। সুতরাং তারা যে উপায় বাতলেছেন, সেটাই সঠিক এবং তাদের এই সুচিন্তিত সিদ্ধান্তের প্রতি সব পর্যায়ের দলীয় নেতাকর্মীদের আস্থাশীল থাকাটাই সমীচীন। সেদিক থেকে হরতাল, ভাঙচুর, হত্যা,অগ্নিসংযোগসহ যে কোনো ধরনের সহিংস কর্মসূচি গ্রহণযোগ্য নয়। সরকার বিরোধীদলসহ সব পক্ষকেই বুঝতে হবে আইনকে আপন গতিতে চলতে দিলে এর সমাধানও হয়ে যাবে। আর সবকিছুই কারো পছন্দমতো হতে হবে, এটা ভেবে চলতে থাকলে মস্ত ভুল করা হবে। আর্থ-সামাজিক অগ্রগতি, গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা আর রাজনৈতিক কাঠামো টিকিয়ে রাখতে আইনের শাসনের বিকল্প কিছুই নেই। আর সে বিচারের সঙ্গে দেশের কোটি কোটি মানুষের আবেগ জড়িত, তাকে দেখতে হবে দলীয় ও সংকীর্ণ স্বার্থের ঊর্ধ্বে। পরিস্থিতি সামাল দিতে এখনই উপযুক্ত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিন।  লেখক : ডিপার্টমেন্ট অব টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন