কবিগুরু বলেছেন, “সমাজের সর্বত্র ব্যাপ্ত করিয়া এমন একটা অনুশীলনের হাওয়া বহা চাই যাহাতে জ্ঞান এবং ভাবের রশ্মি চতুর্দিকে প্রতিফলিত, বিকীর্ণ হইতে পারে।” এই “অনুশীলনের হাওয়া” বইয়ে দেওয়ার প্রয়োজন যে কতখানি তা আজ আমরা প্রায় সবাই স্বীকার করি। শিশুর সামগ্রিক বিকাশের জন্য গ্রন্থগত শিক্ষার পাশাপাশি সহশিক্ষার বিষয়টিকেও মূল্যায়ন করতে হবে। পৃথিবীতে এমন অনেক খ্যাতিমান মনীষী রয়েছেন যাঁরা তাঁদের আগ্রহের বিষয়টিতেই মনোযোগ দিয়ে কালজয়ী হয়ে আছেন। একথা সত্য যে, প্রত্যেকের মধ্যেই কোন না কোন প্রতিভা সহজাত ভাবেই থাকে, কেবল প্রয়োজন বিকাশের জন্য পরিচর্যা। আজ এমন একজনের কথা বলবো, যিনি ছেলেবেলা থেকেই লেখাপড়ার পাশাপাশি নাচ, গান, ছবি আঁকা এবং গল্প-কবিতা লেখার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। শেষ অবধি তিনি ‘নৃত্যশিল্পী’ হিসেবেই খ্যাতি লাভ করেন। তাঁর এই নৃত্য চর্চার জন্য লেখাপড়ার বিঘ্ন ঘটেনি কখনোই। পাঁচ বছর বয়সেই গৃহশিক্ষকের কাছে আরবি-ফারসি শেখার মধ্য দিয়ে শিক্ষাজীবন শুরু। তারপর ১৯৩৪-এ মানিকগঞ্জ হাইস্কুল থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক, কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে আই.এ, স্কটিশচার্চ কলেজ থেকে বি.এ এবং ১৯৪৩ এ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ পাস করেন। তাঁর নাম “বুলবুল চৌধুরী”। এটি তাঁর ছদ্মনাম। প্রকৃত নাম রশীদ আহমদ চৌধুরী। ১৯১৯ সালের ১ জানুয়ারি চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় ‘চুনতি’ গ্রামে তাঁর জন্ম। পিতা ছিলেন মোহাম্মদ আজমউল্লাহ বেঙ্গল পুলিশ সার্ভিসের ইন্সপেক্টর।
পাঁচ/ছয় বছর বয়সেই মানিকগঞ্জ হাইস্কুলে পড়ার সময় এক চিত্র প্রদর্শনীতে তাঁর আঁঁকা ছবির জন্য প্রথম পুরস্কার লাভ করেন। এই স্কুলেই কিশোর বুলবুলের ‘চাতক-নৃত্য’ পরিবেশনের মাধ্যমে তাঁর নৃত্যশিল্পী জীবনের সূচনা। সারাজীবন ‘নৃত্যকলা’ অনুশীলনের মধ্য দিয়েই মহত্ এই নৃত্যশিল্পী ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশসহ আয়ারল্যান্ড, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, হল্যান্ড ও বেলজিয়ামে নৃত্যনাট্য প্রদর্শন করে খ্যাতি অর্জন করেছেন। কিশোর বয়সেই রবীন্দ্রনাথের ‘কচ ও দেবযানী’- নৃত্য রূপায়নের মধ্য দিয়ে সাফল্য অর্জন এবং শিল্পাঙ্গনের খ্যাতনামা ব্যক্তিবর্গের প্রসন্ন দৃষ্টি লাভ করেন।
১৯৩৭ এ তিনি তাঁর সহযোগীদের নিয়ে “ওরিয়েন্টাল ফাইন আর্টস এসোসিয়েশন” গঠন করেন। নাচ এবং অভিনয় এ দু’য়ের সমন্বয়ে তিনি এক মৌলিক নৃত্যকলার সৃষ্টি করেন। তাঁর নৃত্যনাট্যের বিষয়বস্তু বিচিত্র এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনা সম্পন্ন। তাঁর স্ত্রী আফরোজা বুলবুলও একজন প্রতিষ্ঠিত নৃত্যশিল্পী ছিলেন।
১৯৪৩ থেকে ১৯৪৮ পর্যন্ত তত্কালীন সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার দায়িত্বে ছিলেন। কিন্তু চাকরী তাঁর ভালো লাগলো না। তাই চাকরী ছেড়ে দিয়ে চলে এলেন একেবারে ঢাকায়। মনোযোগ দিলেন নৃত্যকলায়। সে সময়ের প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী উদয় শঙ্কর, সুরশিল্পী তিমির বরণ ভট্টাচার্য, নৃত্যশিল্পী সাধনা বসু প্রমুখ তাঁর প্রতিভা বিকাশে প্রেরণা যুগিয়েছেন।
তিনি প্রায় সত্তরটি নৃত্যনাট্য রচনা এবং পরিবেশনা করেছেন। এসবের মূলকথা ছিলো লোককাহিনী, পুরাণ কাহিনী, সামাজিক সমস্যা, সমকালীন ঘটনা, যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ ইত্যাদি। যেমন বিষের বাঁশী, জীবন ও মৃত্যু, ব্রজ-বিলাস, ভারত-ছাড়, সোহরাব-রুস্তম, আনারকলি, হাফিজের স্বপ্ন, মন্বন্তর, ইন্দ্রসভা, ক্ষুধিত পাষাণ প্রভৃতি। এসব নৃত্যনাট্য দেশে-বিদেশে ভূয়সী প্রশংসা এবং সাফল্য এনে দিয়েছে।
বুলবুল চৌধুরী যেমন যশস্বী নৃত্যশিল্পী তেমনি গল্পকার ও ঔপন্যাসিক হিসেবেও খ্যাত।
১৯৫৪ সালের ১৭ মে কলকাতায় ক্যানসার রোগে তাঁর জীবনাবসান ঘটে। তাঁর মৃত্যুর পর নৃত্যশিল্পে অসাধারণ অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ তাঁর নামে প্রতিষ্ঠিত হয় “বুলবুল ললিতকলা একাডেমী” (১৯৫৫, ১৭ মে), প্রতিষ্ঠাতা মাহমুদ নূরুল হুদা ছিলেন তাঁর অত্যন্ত কাছের মানুষ।
উপমহাদেশের বিশিষ্ট নৃত্যশিল্পী বুলবুল চৌধুরীর স্মৃতি-স্মারক এই একাডেমীতে কণ্ঠসঙ্গীত, যন্ত্রসঙ্গীত, নৃত্যকলা, নাট্যকলা, চারু ও কারু শিল্প সহ শিল্প-সাহিত্য-সঙ্গীতে গবেষণা কর্ম পরিচালিত হয়।
